আমার দুঃখু তুমি আর কী বুঝবে? ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলেন জয়া, অবসর তোমারই হয়েছে, আমার তো আর হয়নি। সমাজ-সংসার, আত্মীয়স্বজন, লোকজন। নিজের ছেলেমেয়ে পর্যন্ত স্বার্থপর। চোখ যতদিন না উলটোচ্ছি, কারও চোখ ফুটবে না। এক্ষুনি গিয়ে রামধনকে তুলতে হবে দুধ আনার জন্যে। কত করে বললুম বাড়িতে দিয়ে যাবে ব্যবস্থা করো। তা কটা পয়সার জন্যে… এখন ওই বুড়ো মানুষটা! কদিনই বা আছে? ওকে তুলে পাঠাও, মেয়ে তো নামেই আধুনিকা। আমি মা হয়ে অনুমতি দিচ্ছি তুই দুধ আনতে যা, মুদির দোকানে যা, কিছু হবে না। না তাঁর মান যায়! মুদির সঙ্গে সুখদুঃখের গল্প করতে করতে সময় জ্ঞান থাকে না। কী না জনসংযোগ করছি, তৃণমূল স্তরে, এ দিকে আড়াইশো চিনি। নিয়ে আয় তো রে বললেই শ্রেণিচৈতন্য বেরিয়ে পড়ে।–আচ্ছা, মা, তুমি একটা যুবতী মেয়েকে মুদির দোকানে পাঠাচ্ছ?—বলতে বলতেই জয়া ঘর পেরিয়ে, দালান পেরিয়ে ওদিকে। কলঘরের দরজা বন্ধ হবার আওয়াজ।
অতীশ আবার বালিশে মুখ গুঁজে জয়ার ফেলে-যাওয়া ভাষণের টুকরোটাকরা শব্দ চাখতে থাকেন। জয়ার আগে এত কথার বাঁধুনি ছিল না, এ বাঁধুনি ছিল জয়ার মায়ের কথাবার্তায়, তিনি চলে গেছেন, ভাষণগুলি মেয়ের কাছে ফেলে গেছেন। চোখ না উলটোলে চোখ ফুটবে না, ক-টা পয়সার জন্যে, মুদির সঙ্গে সুখদুঃখের গল্প, কেমন লাগসই ছবির মতো শব্দগুলো! দু-তিন বছর আগে হলে এমন ভোর পার-হওয়া দৌড়ন্ত সকালে বিছানা মুড়ি দিয়ে শব্দের ছবিটা উপভোগ করা যেত?
তবে অতীশের সবচেয়ে পছন্দের জিনিস হল পুরোনো বন্ধুদের আসা-যাওয়া এবং তাদের সঙ্গে অতীতচারণ।
শীতের বেলাটা ধরো মরে মরে আসছে।
আশপাশের বাড়ির আলসেতে, ন্যাড়াবোঁচা গাছগুলোর গায়ে মরাটে আলো। একেবারে বাসি মড়ার রং। এই সময়টা যতই চায়ের সঙ্গে মচমচে মুড়ি-কড়াইশুটি রেখে যাক জয়া, মনটা কেমন খারাপ-খারাপ করে। মরা আলোর সঙ্গে কেমন একটা তাদাত্ম এসে যায়। আয়না দেখতে ইচ্ছে যায়, মাথার ফাঁকা অংশটাতে আঙুল চলে যায়। নিজের হাত পা ধড় মুণ্ডু সব যেন বোপর বাড়ি যাওয়ার যোগ্য ময়লা পুরনো কাপড়ের মতো লাগতে থাকে। এই সময়ে, যেমন আজ, বেলটা যদি মধুর সুরে বাজে এবং দরজা খুলে বাসনমাজুনি ঝোল্লার মায়ের বদলে শোভন শোভনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এক মুখ হাসি নিয়ে, তবে তার চেয়ে খুশির জিনিস আর কী হতে পারে?
বুকটা চিতিয়ে অতীশ বলে ওঠেন, যাক রে শোভন এবারের মতো বাঁচিয়ে দিলি, আরেকটু হলেই আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলুম।
তা, সেইরকম চেহারাই করেছেন বটে। মুখ যেন খ্যাংরা ঝাঁটা। খোক্কসের মতো নখ, ও জয়া তোর কর্তার বোধ হয় নেল পালিশ পরবার শখ হয়েছে রে! -শোভনা চ্যাঁচাল।
জয়া সিঁড়ির মোড় থেকে রেলিং বুকে চেপে ঝুঁকে পড়েন, আরে আসুন আসুন…।
ঠিক বলছ তো? আসব? না চা দের ভয়ে লুকিয়ে পড়বে?
শোভন ঘন্টায় ঘন্টায় চা খান। কবে জয়া থিয়েটারের টিকিট কাটা থাকায় পাড়ার বান্ধবীর সঙ্গে চলে গিয়েছিল বহুবার ক্ষমা চেয়ে, এবং দারুণ নাটকটা বাদ দিতে না পারার জন্য লজ্জিত হয়ে, শোভন আজও সে কথা তুলে খোঁটা দিতে ছাড়েন না।
জয়া বললেন—দেখুন অর্ধেকটা প্রকাশিত হয়ে রয়েছি। পুরোটা হলে না হয় আপনার বস্তাপচা ঝগড়াটা শুরু করবেন। গ্যাসে অলরেডি জল বসিয়ে এসেছি।
সর্বনাশ! সেবার গৃহত্যাগ করেছিলে, এবার কি গৃহদাহ?
এরই মধ্যে নীচের কোনো একখানা ঘর থেকে বেরিয়ে ঝিলিক হাত নেড়ে বলল, ওঃ বাবা মা কাকু, তোমাদের ভম একটু কমাও, নইলে ওপরে যাও, আমরা একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি।
ভম তো বেশ কমিয়েছি রে, শোভন বললেন। সাড়ে পাঁচ কেজি কমেছে, ডাক্তার বলছে…।
আহা বুঝতে পারছ না যেন। দেহের নয়, গলার। নবটা একটু ঘোরাও… বলে ঝিলিক পরদা সরিয়ে আধো-অন্ধকার ঘরটার মধ্যে সেঁদিয়ে গেল।
দুই দম্পতি মেয়ের কাছ থেকে বকুনি খেয়ে কাঁচুমাচু মুখে ওপরে উঠে গেলেন। জয়া বললেন, চলুন আমরা বারান্দায় গিয়ে বসি। আপনারা বসুন গিয়ে, আমি চা-টা নিয়ে আসছি।
বারান্দায় ভালো করে গুছিয়ে বসে শোভন বললেন, ঝিলিকটা কী এমন রাজকার্য করছে রে? কোচিং ক্লাস খুলেছে নাকি? ঘরের আধা-অন্ধকারের মধ্যে জোড়া জোড়া চোখ জ্বলজ্বল করছে বলে মনে হল, যেন বনের মধ্যে বনবেড়ালদের সভা বসেছে।
যা বলেছিস।—অতীশ সায় দিলেন, ওয়াইল্ড একেবারে।
বলেন কী? চেয়ার-টেবিল ভাঙে নাকি?—শোভনা ঘাবড়ে গেছেন।
ভাঙেনি এখনও, তবে ভাঙলেই হল, যা জোরে চাপড়ায়।
জয়া একটা জাম্বো সাইজের ফ্লাসক নিয়ে ঢুকলেন। শোভনা গলা নামিয়ে বললেন, হ্যাঁ রে জয়া, ড্রাগ-ফ্রাগ খায় না তো! বিশ্রি একটা গন্ধ পেলুম যেন!
জয়া বললেন, অতটা বোধ হয় না। ড্রাগ-নিবারণী সমিতি না কী একটা করেছে যে!
কী জানি! শোভনা বলে উঠলেন, পুলিশেরও তো চুরি-ডাকাতি করার কথা, মানছে কি? আসলে গাঁজার গন্ধটা একজনের দৌলতে আমার চেনা কিনা!
বিয়ে থা দে, বিয়ে-থা দে,—শোভন দরাজ গলায় বলে উঠলেন। শোভনার গাঁজা প্রসঙ্গটা চাপা দেয়ার জন্যেই কি না কে জানে!
বিয়ে কি আজকালকার ছেলেপুলেদের কেউ দেয় রে। বিয়ে আজকাল করে। অতীশের নিঃশ্বাস পড়ল।
শোভনা বললেন, হ্যাঁ, আপনার মতো আগেকার ছেলেপুলেদের বিয়েই যেন কেউ ঘাড়ে ধরে দিয়েছিল। হেদুয়ার মোড়ে হা-পিত্যেশ, বসন্তকেবিনে আধখানা কবিরাজি কি কফি হাউজে সাড়ে তিন কাপ কফি নিয়ে টানা তিন চার ঘন্টা, এলিটে ফেয়ারওয়েল টু আর্মস, রূপবাণীতে জংলী… এ সব যেন আর আমরা জানি না।
