সুরম্য বললেন খুবই অভিনব ব্যাখ্যা। হতে পারে কান্তি। খুবই সম্ভব।
তবু, তা সত্ত্বেও—কান্তি বলে চললেন, আমরা কেউই এই মেয়েটির ব্যাপারে একটুও এগোইনি, তার কারণ ছিল, দুজনেই জানতুম আমরা উভয়েই তার প্রেমে পাগল, একজন তাকে উদ্ধার করলে সে অপরজনের কাছে মহাপাতক বলে গণ্য হবে। আমাদের মধ্যে এই অলিখিত সমঝোতা ছিল। সেও এক রকমের প্রতিশ্রুতিই।
সুরম্য চিন্তিত মুখে চুপ করে রইলেন। কান্তি বললেন আমি তোকে কোনো আদালতে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের দায়ে সোপর্দ করতে পারব না সুরম্য। কিন্তু তুই কলকাতায় ফিরে গিয়ে সাত তাড়াতাড়ি চাকরি জোগাড় করে প্রফেসার নায়ারের বোন সাবিত্রী কল্যাণী নায়ারকে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করলি, কলকাতা ছাড়লি আমাকে এড়াতে, এটা করে তুই প্রতিশ্রুতিভঙ্গের মহাপাপ করেছিস সুরম্য। কিন্তু কী করে এটা তুই সম্ভব করলি? তুই কি আগে থেকেই কল্যাণীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলি, আমার বিশ্বাস ভঙ্গ করে? এর তুই কী জবাব দিবি বল?
অনেকক্ষণ বসে আছেন, পা ধরে গেছে, সুরম্য আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন যোগাযোগ আমি করিনি রে কান্তি। কল্যাণীই করেছিল। সে তার নায়ার নিয়তির থেকেই শুধু মুক্তি চায়নি, তোর কাছ থেকেও মুক্তি চেয়েছিল। কল্যাণী আমাকে সমস্তই বলেছে। কীভাবে তুই তার ভোরবেলা জঙ্গলে বেড়াতে যাবার সুযোগ নিতিস। কীভাবে একদিন শেয়ালে আক্রমণ করলে তুই তাকে বাঁচিয়েছিলি কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে একা পেয়ে তুই তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে খুবই অসংযত ব্যবহার করেছিলি। কাউকে কিছু না বলবার প্রতিজ্ঞা করলেও কল্যাণী এসব কথা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখেনি কান্তি। তোর পাছে কষ্ট হয় তাই আমি এতকাল এ সবই তোর কাছ থেকে গোপন রাখতে চেয়েছিলাম। প্রতিশ্রুতিভঙ্গ তুই-ই আগে করলি। পরে আমি তার চক্রে জড়িয়ে গেলাম।
কান্তি দুহাতে মুখ ঢেকে বসেছিলেন। ভাঙা গলায় বললেন, সুরম্য, সুরম্য, কল্যাণী আমার অসংযত আচরণটাই দেখল, তার পেছনে আমার উন্মত্ত ভালোবাসাকে দেখল না? সুরম্য, তাই আমার কথা মনে করেও নিজেকে কল্যাণীর থেকে দূরে রাখতে পারলি না? তুই যে আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ, সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলি! যা পেয়েছিলাম দুজনে একসঙ্গে পেয়েছিলাম, যা পেতাম না দুজনেরই না পাওয়া থেকে যেত!
সুরম্য শান্ত, মৃদু, নম্র কণ্ঠে বললেন কান্তি, আমাদের সেই ছাত্রজীবনের অন্তিম রাত্রির ঘটনার যে ব্যাখ্যা তুই দিলি তা-ও যেমন সত্য, আমার দেওয়া ব্যাখ্যাটাও তেমনই সত্য। আসলে সাবিত্রী কল্যাণী নায়ার ছিল আমাদের কাছে সেই মোহানা, সেই বৃহত্তর জীবনের প্রতীক যা বিরাট, তীব্র, আকাঙক্ষাময়, করুণ, আর্ত। সেই জীবন, সেই পার্থী ধরিত্রীকে আমরা আমাদের রক্ত দিয়ে রক্ষা করতে চেয়েছি। আমি একভাবে করেছি। কল্যাণী আমার ঘরণি হয়েছে, তাকে আমি পেয়েছি। এবং পেয়েছি বলেই অনিবার্যভাবে আস্তে আস্তে খসে গেছে তার অবয়ব থেকে সেই মোহ, সেই সুদূর, সেই গভীর কারুণ্য যার নিবেদন মানুষকে চিরকাল প্রাণিত, স্পন্দিত করে রাখে। আমি প্রৌঢ় হয়েছি। মাংসপেশি শিথিল হয়েছে, হাইপ্রেশার, চোখে হাই পাওয়ারের চশমা, যান্ত্রিকভাবে মেপে মেপে জীবনযাপন করি। সম্পন্ন হয়েছি। কিন্তু সাধারণ। খুব সাধারণ। কান্তি, তুই জিইয়ে রেখেছিস সেই প্রাণ যা এখনও শক্তিতে টগবগ করে, সেই হৃদয় যা এখনও মননে অক্লান্ত, যা এখনও চাইতে পারে, এখনও জীবনের কাছ থেকে অনেক আশা করে, অনেক অনেক আশা, এখনও বেদনায় মুহ্যমান হয়, জীবনে গল্প সাজাতে পারে, ছুটে যায় একটার পর একটা শিখরে। কান্তি, আমার বিশ্বাস সেই ছায়াময়ী যার অন্য নাম জীবন তাকে যদি কেউ পেয়ে থাকে তবে তুই-ই পেয়েছিস।
রোমান্স
অবসরের জীবনে ধীরে-সুস্থে রয়ে বসে উপভোগ করার মতো জিনিসের অভাব আর যারই থাক, অতীশ ভট্টাচায্যির অন্তত নেই। শীতের ঘুম, তৃতীয় কাপ চা, হরেক রকমের বই, পত্র-পত্রিকা, মর্নিং ওয়াক… ইচ্ছে হলে থিয়েটার-সিনেমা, ইচ্ছে হলে বাড়ি বসে যৌবনকালের বাংলা গান কিংবা শুধু টিভির স্ক্রিনে আলগা করে চোখ ফেলে বসে থাকা, কিংবা পুরনো বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা জমানো।
পুরো যৌবনটা কেটেছে ছোটাছুটি করে। একটু বেশি করে বিছানায় গড়ানো সেটাও যেন একটা আলাদা উপভোগের স্বাদ বয়ে আনে। ধরো মাঘ মাসের ভোর ছ-টা। কথায় বলে মাঘের শীত বাঘের গায়ে। তা তেমন শীত হতভাগা কলকাতাতে আর পড়ে না। তবু ভোরের দিকটা ওরই মধ্যে একটু জমজমাট। জলযোগের পয়োধি মার্কা হয়ে থাকে। তা এতদিন তো সে পয়োধি চাখবার সুযোগ পাওয়া যায়নি। অফিসের আগের আবশ্যিক প্রাতঃকৃত্যগুলো তো ধর তক্তা মার পেরেক জাতীয় ছিল। এখন অতীশ ঘাপটি মেরে থাকেন। মাথার অর্ধেকটা অবধি বালাপোশ চাপা দিয়ে জয়া উঠে পড়েছে টের পান। কেমন একটা অবৈধ প্রেমের রোমাঞ্চ নিয়ে বালাপোশের মধ্যে আরও ঘন হয়ে যেতে থাকেন তিনি।
জয়ার উঠে-পড়ার মধ্যে আগেকার সেই তড়াক ভাবটা আর নেই। একবার দুবার এপাশ ওপাশ করল, হাউমাউ করে গোটা পাঁচেক হাই তুলল, পটপট করে কটা আঙুল মটকাল, তারপর এক পা লেপের ভেতরে, এক পা লেপের বাইরে, ভেতরে… বাইরে, ভেতরে… বাইরে, তুমি কি কুমির-ডাঙা খেলছ? পিটপিট করে চোখ খুলে সোঁদা সোঁদা গলায় অতীশ প্রশ্নটা ছোড়েন।
