ঘরে ঢুকে কান্তি এক হাড়-কাঁপানো ডাক দিলেন, যোগলো। এই ব্যাটা যুগলকিশোর!
কি সাহেব, যুগলকিশোর এসে দাঁড়িয়েছে।
আবার সাহেব! না রে সুরম্য আমি ওকে মোটেই সাহেব-টাহেব ডাকতে শেখাইনি। নিজে-নিজেই পিক-আপ করেছে। হ্যাঁ রে গো-খোর, এত কিছু পিক আপ করতে পারিস আর এই বিছানা থেকে জামাকাপড়গুলো পিক-আপ করতে পারিস না। অ্যাাঁ! এ যে একেবারে কাপড়ের এগজিবিশন সাজিয়ে রেখেছিস? বলি, মানুষ বসবেই বা কোথায় আর শোবেটাই বা কোথায়? তোমার মাথায়?
চেয়ারের দিকে এগোলেন কান্তি। সেখানে আর এক পাঁজা বই। যুগলকিশোর তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে বইগুলো দুহাতে ধরল, সুরম্যর দিকে তাকিয়ে বলল, জানেন না সাহেব, আমার এ সাহেব মহা ধুর্ত আছেন। নিজেই আমাকে বলবেন, খবর্দার, আমার জিনিসে হাত দিবি না, একটা কাগজ এধার থেকে ওধার করলে ব্যাটা তোমার আমি পিঠের ছাল তুলে নেব। এই তো? তারপর বাড়িতে লোক এলেই আমার ওপর ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই। অতিথ চলে গেলে আমারই লাভ। সাহেবই দু-দশ টাকার নোট হাতে ধরিয়ে দেবেন—রসগোল্লা খাস যুগল। আমারই ভালো।
মারমুখী হয়ে যুগলের দিকে দু-পা তেড়ে গেলেন কান্তি।
আমায় তুমি ধূর্ত বল, তুমি নিজে কী? তুমি ব্যাটা বদমাশ। তোমার সঙ্গে আমি বুদ্ধিতে আঁটব? সুরম্য খুব সাবধান, টাকাপয়সা না হোক মারে রে, লাল হয়ে গেল ব্যাটাচ্ছেলে আমার টাকা মেরে মেরে। আমার মেরে আবার আমাকেই কথা শোনাবে। টাকাপয়সা ঠিক করে রাখতে পারেন না তো রোজগার করা কেন?
সুরম্য কান্তির হাতের মোটা বইখানা ধরে ফেললেন। বইটা তিনি যুগলের মাথা টিপ করে ছুঁড়তে যাচ্ছিলেন।
আরে আরে করিস কী কান্তি? যুগল, তুমি এখন যাও তো বাবা, ভালো করে রান্নাটা করো, আমার খুব খিদে পেয়ে গেছে।
যুগল চলে গেল, গজগজ করতে করতে গেল, আপনি ধরলেন কেন বইটা? যুগলও লুফতে জানে। সরতে জানে। মেঝেয় পড়লে অমন বইগুলো চৌচির হয়ে যাবে বলেই না লোফা। সুরম্য অবাক হয়ে লক্ষ করলেন তিনি কাজের লোকের সঙ্গে অনায়াসে কেমন কথা বলে ফেললেন। এটা তাঁর অভ্যাসের মধ্যেই নেই। প্রথমত তাঁর বাড়ির কাজ করে সব মেয়েলোক। তেলেঙ্গি মেয়ে সব। তাদের কল্যাণীই সামলান। গাড়ি ধোয়াপোঁছার যে ক্লিনারটি সে এক বিহারি যুবক। তাকে সম্বোধন করে সামান্য কতকগুলো শব্দ, তার বেশির ভাগ অব্যয়, তাঁকে উচ্চারণ করতেই হয়। এ বাদে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলতে তিনি আদৌ অভ্যস্ত নন। তিনি আরও অবাক হয়ে দেখলেন যে কখন কান্তির সঙ্গে হাত লাগিয়ে বিছানার ওপরটা, চেয়ার, সব খালি করে ফেলেছেন। বইতে বইতে টেবিলটা ছোটোখাটো একটা পাহাড়ের আকৃতি নিয়েছে। দু-হাত ঝেড়ে পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে কান্তিময় বললেন—বাঁচা গেল বাবা, সাত সকালে বিছানা ঝাড়ো, চেয়ার ঝাড়ো, বই ঝাড়ো, কাজ কি কম? এই সুরম্য, বিছানার চাদরটা টান মেরে ফেলে দে তো! চিটচিটে ময়লা রে, শুতে ঘেন্না করে, বালিশের ওয়াড়টাও দিয়ে দিবি ওই সঙ্গে। ন্যাড়া বোঁচা বিছানা থাকলে যদি ব্যাটাচ্ছেলের চৈতন্য হয়, যদি ফ্রেশ চাদর ওয়াড় পাই। সবই তো দয়াময়ের দয়া কি না!
কনভোকেশন হরে গেছে। হিজলির রাস্তা দিয়ে দলে দলে ডিগ্রিপ্রাপ্ত প্রযুক্তিবিদরা চলে গেছে। হাতে ছাড়পত্র। ভারতবর্ষের যে-কোনও এক নম্বর প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি মর্যাদার পদলাভের ছাড়পত্র। এদের মধ্যে চার ভাগের এক ভাগ শেষপর্যন্ত চলে যাবে বিদেশে। আমেরিকা, জার্মানি, ফ্রান্স, মধ্যপ্রাচ্য। দুদিন ধরে সন্ধ্যেবেলায় ঘুরে ঘুরে সুরম্য দেখেছেন বন কেটে সেই বসত যা তাঁরা সদ্য এসে দেখেছিলেন, তা এখন কেমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কলেজি শহরই হয়ে গেছে। কলেজ বিল্ডিং-এর শাখাপ্রশাখা, ছাত্রদের হোস্টেল, ছাত্রীদের হোস্টেল, রাস্তাঘাট, বিভিন্ন টাইপের কোয়াটার্স, হ্যালোজেন-জ্বলা রাতে আলোর গায়ে লেপটে-থাকা রাতপোকা। নটা নাগাদ যুগলকিশোর খাবার দিয়ে দিল। খেয়েদেয়ে কান্তিময় বললেন, চল পাগলা, বেড়িয়ে আসি। কালই তো চলে যাবি।
যুগল বলল, সেই ভালো সাহেব, আপনারা একটু বাইরে গেলে বিছানাটিছানা একটু গুচ্ছেগাচ্ছে রাখতেও আমার সুবিধে হয়।
কান্তি বললেন, নোটিশ দিল রে। ঘরের বউও এমনটা দ্যায় না। এমন মাল আর দেখেছিস?
সুরম্য বললেন, চল, আজ আমাদের পুরনো ফেভারিট জায়গাগুলো ঘুরব, বসে থাকব। যদিও সেসব জায়গা এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা বলা শক্ত।
কান্তি বললেন, যেত না, তুই চিনতে পারতিস না। আমি মাঝের পাঁচ বছর পশ্চিম জার্মানিতে বাদে টানা রয়ে গেছি এখানে, আমি জানি। আমি বলে দিতে পারি। চল।
গায়ে সোয়েটার। তার ওপর শাল জড়িয়ে দুজনে বেরিয়ে পড়লেন।
চিনতে পারছিস জায়গাটা?
একেবারেই নয়। কোনও ল্যান্ডমার্ক আছে?
আছে, তবে সেটা এখনই বলছি না। এটা হল সেই ধূধূ তেপান্তরের মাঠ যার ওদিকে সে সময়ে উদ্বাস্তু কলোনি বসেছিল।
সেই মাঠের এই চেহারা হয়েছে? বলিস কী? মাঠ বলে যে আর চেনাই যায় না!
সেই মাঠের এই চেহারাই হয়েছে। ল্যান্ডমার্ক হল ওই বট-অশ্বখ, দুটো গাছ একসঙ্গে একই স্পট থেকে বেরিয়েছে। মনে পড়ছে? দ্যাখ!
সুরম্য ভালো করে দেখলেন গাছ দুটো। অন্ধকারেও ভিন্ন ভিন্ন পাতার গড়ন বোঝা যাচ্ছে। বট একদম জমাট অন্ধকার। কিন্তু অশখের পাতা দুলছে। ফাঁক দিয়ে দিয়ে আকাশের আলো গলে পড়ছে। বললেন, ঠিকই। সেই গাছ। এখন মনে হচ্ছে এর অন্ধিসন্ধি চিনি আমি। ঠিক এর ধারে ছিল ফিজিক্সের ডেমনস্ট্রেটর উধম সিংজির কোয়ার্টার্স। পাজি ছেলেরা ওঁর নাম দিয়েছিল উদোম সিং, তোর মনে আছে? কোয়ার্টার্সটা এইচ-টাইপ। ওঁর স্ত্রী সব সময়ে একটা সেমিজ পরে থাকতেন। আঁটসাট মোটা, যখনই দেখা হত এ কিষন বলতে বলতে বাগান পেরিয়ে রাস্তায় জঞ্জাল ফেলতে চলে যেতেন। আমরা চোখ তুলে তাকাতে পারতুম না।
