গিদওয়ানিদা ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, শালা, বাঞ্চোৎ, হুজ্জোৎ, ইজ্জৎ, কেলো, ব্যাটাছেলে, শুয়ার কী বাচ্চা, খচ্চর, গিদধড় আউর কুছ বাংলা গালি আছে?
আছে বইকি রে। একখানা আস্ত গালাগালাই যে বাকি রেখে দিলি ব্রাদার, এলাটিং, বেলাটিং সই লো, কী খবর আইল, রাজা একটি বালক চাইল, বলতে বলতে সুরম্যকে নিয়ে মাঝরাতে সে কী হুজ্জোতি রে বাবা!
সুরম্য চিঠিখানাকে যথাযথ ভাঁজ করে লেফাফায় পুরলেন। তিরিশ বছর আগেকার উত্তেজনায়, উষ্ণতায়, বন্ধুত্বে হাত থরথর করে কাঁপছে। হরিহরাত্মা। তিনি হরি, কান্তি হয়। তিনি ক্ষীণকটি, গৌরাঙ্গ, শ্ৰীমান। কান্তি লম্বা, চওড়া, কালো। মুখে নিখাদ প্রশান্তি, বুদ্ধি, ভালোমানুষি। ভালোমানুষ। কান্তিময় উপাধ্যায়। না তিনি যাবেন। অবশ্যই যাবেন।
তখন ওঁরা বলতেন, হিজলি। হিজলি জেলে কয়েকজন রাজবন্দিকে গুলি করে মারা হয়েছিল। প্রতিবাদে আরও কিছু রাজবন্দি অনশন আরম্ভ করেন। রবীন্দ্রনাথ সেই প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে কবিতা লিখেছিলেন। সেই হিজলি জেলভবনই খড়গপুরের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিট অফ টেকনলজি। দূর থেকে টাওয়ারটা দেখা যেত। খড়গপুর রেল কলোনি পেছনে ফেলে হিজলি যেতে কখনও পথের ডাইনে, কখনও বাঁয়ে, কখনও দুদিকেই বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে খোয়াই। লাল লাল হাঁ করা খোঁদল। গাছপালা ছেড়ে তৃণ পর্যন্ত নেই একটুকরোও। জায়গাটার একটা ভীষণ সৌন্দর্য আছে। সূর্যাস্তের রঙের সঙ্গে খোয়াইয়ের রং মিলে গেছে। এমনিতে সূর্যাস্তের রঙে যে রাঙা, গোলাপি, কমলা আভা থেকে তাকে নম্র, পেলব রকমের সুন্দর করে এই খোয়াইয়ের সংস্পর্শে এসে সে রং কেমন পালটে গেছে। যেন যুদ্ধক্ষেত্র, শোণিতস্রোত। কলিঙ্গযুদ্ধ হয়ে গেছে। শবদেহগুলি এইসব খোঁদলের আশ্রয়ে লুকিয়েছে। ধৌলিঙ্গ থেকে অশোক দেখছেন রক্ত রক্ত রক্ত। সব রক্ত এখন শুকিয়ে কালচে হয়ে আসছে। সাইকেল রিকশায় করে বাবার সঙ্গে সেই পথ দিয়ে স্বপ্নে দেখা উচ্চাশামহল খড়গপুর আই আই টি-তে আসা হয়েছিল। সেই স্মৃতির হাত ধরে যাবেন বলে কান্তিকে টেলিগ্রাম করেননি। একা যাবেন। একা একা।
বাবা বলছেন, কি রে খোকা, এখনও ভেবে দ্যাখ, থাকতে পারবি তো? না হলে এখনও বল ফিরে যাই। ন্যাশনাল মেডিকেলে অ্যাডমিশন নিয়ে নিবি। বাড়ি থেকে কলেজ যাবি আসবি। তোর মাও নিশ্চিন্ত। তুইও।
আমি যাব বাবা। আই আই টি-তে পড়ব। মেডিক্যাল পড়ব না। ডেডবডিতে সেকশন কষতে হবে ভাবলে আমার ভীষণ গা গুলোয় বাবা।
সে তো জানি। ওসব সয়ে যায় রে। সয়ে যায়।
না আমি এঞ্জিনিয়ার হব।
সে তো অনেক দিন ধরে শুনছি। টিকতে পারবি তো? শুনেছি ভীষণ র্যাগিং করে। সইতে না পেরে ফিরে এলে খুব অসুবিধে হবে রে!
ভাবলে এখনও হাসি পায়। কেউ আদেশ করেনি। সুরম্য নিজে নিজেই বাবাকে চিঠি লিখেছিল:
শ্রীচরণেষু বাবা, তুমি মিথ্যে ভয় পেয়েছিলে। শীতের রাত্তিরে খালি গায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা ছাড়া আর কোনোরকম অত্যাচার ওরা করেনি। উপরন্তু আমার সিনিয়র ছেলেদের সবার সঙ্গে এত ভাব হয়ে গেছে যে মনে হচ্ছে পড়াশোনার জন্য সব ক্লাসে না গেলেও চলবে। অবশ্য তুমি ভেবো না আমি লেকচার ফাঁকি দেব। ওয়ার্কশপ খুব ভালো লাগছে। বাবা, এবার তুমি এলে কান্তিময়ের সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দেব। আমার বিশেষ বন্ধু।
কান্তিময়, কান্তিময়, কান্তি। মুখে সিগার, ঢিলে-ঢালা একটা পায়জামা আর ধবধবে পাঞ্জাবি পরা দশাসই চেহারার কান্তি এগিয়ে আসছে লনের মাঝখানে সিঁথির মতো পথটা দিয়ে। পথের পাশে মেহেদির বেড়া, দূরে ঝাউয়ের সারি। কান্তি আসছে। চুলে সামান্য সাদা ছোপ, চোখে সেই ভাবালু দৃষ্টি, সেই তিরের মতো হাঁটা।
রিকশা থেকে নামছেন সুরম্য। স্যুটকেশ ঠিক নয়, ওভারনাইট ব্যাগের মতো তাঁর লাগেজটা কান্তি রিকশাওয়ালার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নিচ্ছেন। অন্য হাতে ঠোঁট থেকে সিগার নামিয়ে কান্তি অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন। এক সেকেন্ড। পরক্ষণেই মুখ ফেটে যাচ্ছে, চৌচির হয়ে যাচ্ছে হাসিতে।
সুরম্য, সুরম্য পাগলাটা! এসে গেছিস! আমাকে তো জানালি না কিছু। ভাবছিলুম হয়তো আসবিই না। ভারি অবাক করে দিলি তো। ভারি দুষ্টু হয়ে গেছিস তো আজকাল!
জানাবার কী আছে? আছেটা কী? এক আধবুড়ো আর এক আধবুড়োর কাছে আসছে। এঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির ডিনের বাড়ি বললে কেউ চিনিয়ে দিতে পারবে না? ঠিকানা মিলিয়ে না হয় না-ই আসতে পারলুম।
আরে ঠিক আছে। ঠিক আছে। বেশ করেছিস। আয়, আয়। যুগল! এই যুগল, ইধর আও। মেরা দোস্ত। বুঝলি? জিগরি দোস্ত। দুজনের লাঞ্চ দিবি ব্যাটা। ঠেসে পুর ভরবি তোর টম্যাটোর দোরমায়। ঠেসে ঠেসে। হ্যাঁরে সুরম্য। সেই পাতলা পাগলা-পাগলা ভাবটা তো তোর একদম নেই। পাঁচ ছটা বছর টিকিয়ে রাখতে পারলি, আর…..
তুই কি এখনও ডন বৈঠক দিস নাকি? মুগুর-টুগুর ভাঁজিস? একটু হাঁপ ধরে আজকাল সুরম্যর। সাবধানে থেমে থেমে বললেন।
মুগুর না ভাঁজলে এইসব হাড়বিচ্ছু আই আই টি-র মালদের সামলানো যায়? তুই বল না, তোর তো এক্সপিরিয়েন্স আছে। কারিয়া পিরেত বা হয়ে যাচ্ছিলি তো আরেকটু হলে …
দুজনেই হাসতে থাকলেন।
কান্তিময় বিয়ে করেননি। এমন সুন্দর বাড়িখানাকে তছনছ করে রেখেছে। যুগলকিশোর আর তার মনিব। বড় হলঘর ভরতি কান্তিময়ের কম্পিউটারের কাণ্ডকারখানা, কম্পিউটার-বাগিং তিনি নাকি বন্ধ করবেনই। শোবার ঘরে বিরাট সেক্রেটারিয়েট টেবল। কাচে সূক্ষ্ম লাল ধুলোর আস্তর। তার ওপর ফাইলের পাহাড়। বইয়ের পাহাড়, খোলা পেন, ব্লটারে প্রচুর কালি শুকিয়ে রয়েছে। বিছানার চাদর পালটানো হয়নি কতদিন, তার ওপরও বই, ম্যাগাজিন, কান্তির কোট, প্যান্ট পাতলুন।
