কান্তি বললেন, ইয়া। এবং ওঁদের কিষন ছাড়াও একটি মেয়ে ছিল। প্রাণচঞ্চল, সুন্দর। তুই তাকে দেখলেই সে সময়ের একটা পপুলার গান গাইতিস—বনময়ূরের নাচ দেখতে যাব, মনে আছে? মেয়েটা বেড়া ধরে সামনে পেছনে দুলত আর হাসত।
খুব মনে আছে, সুরম্য হাসি হাসি মুখে বললেন।
শুনলে আশ্চর্য হোস না, সেই মেয়েটি সন্তোষ এখন এখানকারই এক লেকচারারের স্ত্রী। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টেরই। মোটা যা হয়েছে, ইয়া খাড়াই, ইয়া ছাতি, তোর সাধারণ ফিতেতে কুলোবে না।
বলিস কী? বনময়ূরী আর বনময়ূরী নেই? বনময়ূরী ছেড়ে, বনমুরগি, বন-হরিণী, বন-বাঘিনী কিছুই নেই। নিতান্ত এক ঘরপোষা দুধেল গাই-গোরু বনে গিয়েছে। এমনিই পৃথিবীটার অ্যান্টি ক্লাইম্যাকসের ধরনধারণ রে পাগলা!
বলতে বলতে কালভার্টের ওপর বসলেন কান্তিময়। পাশে বসতে বসতে সুরম্য বললেন, তুই কি আমার মতন হাঁপিয়ে গেলি নাকি রে?
উঁহু। হাঁপাতে আমার এখনও দেরি আছে। একটু বসাই যাক না। একটু বসলেই বুঝতে পারবি ঠিক এইখানটায় আমরা বসতে ভালোবাসতুম। সাইকেল দুটো ও-ই গাছটার গায়ে ঠেসানো থাকত। আমরা বসতুম যেন ঘোড়া থেকে নেমে রাজপুতুর মন্ত্রীপুতুর।
বেশ শীতের রাত। চারদিক শুনসান। পাতাটি কাঁপছে না কোথাও। পৃথিবীর যেন কেমন ঘোর লেগে গিয়েছে। নক্ষত্র দেখতে ওপর দিকে চাইতে হয় না। তারা গোল হয়ে ঘিরে ধরেছে দুজনকে। অগণ্য তারা, তারামণ্ডল, ক্যাসিওপিয়া কালপুরুষ, লঘু সপ্তর্ষি, পারসিউস। রাজপুত্তুর, মন্ত্রীপুত্তুর। অনেক অনেকক্ষণ পরে সুরম্য বললেন, কীসের গন্ধ রে? কী ফুল? যেন ঘুম ভাঙা স্বর।
পাচ্ছিস? পাচ্ছিস তা হলে? চাপা উত্তেজনা কান্তিময়ের গলায়।
পাচ্ছি। পাচ্ছি। কী ফুলের গন্ধ বল তো?
ফুল নয় ফুল নয় রে সুরম্য, এ সময়ে ঘর সাজানো রঙিন ফুল ছাড়া আর কী পাবি, বল? এ হল মউল আর শাল, ছাতিম আর বকুল গাছের শরীরের গন্ধ, অন্তত আমার তাই ধারণা। গত তিরিশ পয়ত্রিশ বছর, তারও অনেক অনেক বেশি কতকগুলো ভীষণ ব্যক্তিত্বশালী, অহংকারী গাছ এই রাস্তার আশেপাশে, কোণে টোনে কোথাও নিজেদের অস্তিত্ব সদর্পে টিকিয়ে রেখেছে রে পাগলা। সেই এক গাছ, এক গন্ধ যা আমরা ছাত্রকালে পেতুম। সেই এক। মনে কর সুরম্য কী আশ্চর্য! কী পরমাশ্চর্য! এইসব ইট কাঠ, রাস্তাঘাট বদলে গেছে, মানুষজন, আমরা যারা যৌবনবাউল ছিলুম কাঁচা বয়সের, তারা এখন পরিপক্ক প্রৌঢ়, তোর মাথায় টাক আমার রগে সাদার ছিট, তোর পেটে ভুঁড়ি, আমার পায়ে কড়া। দ্যাখ তবু সেই এক গাছ, এক বৃক্ষগুচ্ছ, একই গন্ধ সুরম্য, সেই একই গন্ধ। কিছু কি অনুভব করছিস? কিছু কি মনে পড়ছে? মনে পড়ে? এখন? এইখানে? এমনি করে?
মন্ত্রমোহিতের মতো সুরম্য বললেন, পড়ে কান্তি। পড়ছে। পঁচিশ বছর আগে কনভোকেশনের পর এখানে এই কালভার্টে তুই আর আমি। আমি আর তুই।
মনে আছে আমরা সেদিন কীরকম যেন হয়ে গিয়েছিলুম-কান্তি বললেন।
স্পষ্ট মনে পড়ছে আমার, সুরম্য বললেন, কান্তি তুই রুদ্ধ গলায় বলছিলি, সুরম্য, বন্দরের কাল শেষ হল রে। এবার আমরা এক একজন এক এক দিকে পাল তুলে ভেসে পড়ব। আমি বললুম, জাহাজ আবার পুরোনো বন্দরে ভেড়ে, ফিরে আসে। কান্তি আমরা কোনোদিন এ বন্দরে ভিড়ব না। ফিরব না।
কান্তিময় বললেন—আমি বললুম—সুরম্য কথাটা খুব মেয়েলি শোনাচ্ছে কিন্তু আমি তোকে ছেড়ে থাকব কী করে? আমার এই আসল বড়ো হওয়ার কাল, বালক থেকে যুবক। আর কেউ নয়, তুই, তুই-ই থেকেছিস আমার পাশে। দেখেছিস আমার সব দুঃসহ ঘাম দেওয়া কষ্ট, আমার সব শির ভেঁড়া দপদপে আনন্দ। কেউ জানে না, শুধু তুই জানিস। আমি চিন্তাই করতে পারছি না কীভাবে আমি তোকে ছেড়ে …।
সুরম্য বললেন, আজ বলছি, সেদিন তোকে বুঝতে দিইনি। আমি ভেতরে ভেতরে ঠিক এই একই কারণে কাঁদছিলাম। কাঁদছিলাম রে কান্তি। অথচ আমি পুরুষ, আই আই টি-র কঠিন বছরগুলো আমাকে অনম পুরুষ করে গড়েছে, তাই সে কান্না দেখানো যায় না। প্রেমিকাকে ছেড়ে চলে যেতে হলে যে দুঃসহ যাতনা হয়, সেই যাতনা তখন আমার মনে।
কান্তি বললেন, আমারও মনে। জানি কোনোমতেই প্রকাশ করতে পারব না। লোকে ভুল বুঝবে। ভুল ব্যাখ্যা দেবে। অথচ একজন যুবক ছাড়া আর একজন সদ্য যুবককে কেউ বুঝতে পারে না। বোঝার কথা না। সুরম্য সেদিন কী আমরা আবেগের মাথায় কোনো প্রতিজ্ঞা করেছিলাম?
না রে কান্তি, সুরম্য বললেন, প্রতিজ্ঞা করার পক্ষে, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পক্ষে অনেক পরিণতমনস্ক, প্রাজ্ঞ, আমরা হয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের প্রাজ্ঞমন আবেগকে সারাক্ষণ বলছিল, স্থিরো ভব। স্থিরো ভব। এই কাঁচামি ভালো না। তাই দুজনের একজন অন্যজনকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি।
কিন্তু মনে মনে? মনে মনেও কি না?
তা নয়। মনে মনে আমরা অবিরাম প্রতিজ্ঞা করছিলাম এই ক-বছরের বিচিত্র অভিজ্ঞতা বৃথা হতে দেব না। এই অনুপম বন্ধুত্ব নষ্ট হতে দেব না। এই বিদ্যা ব্যর্থ হতে দেব না। আমি কি ঠিক বলছি?
ঠিকই বলছিস রে রাজপুত্তুর, একদম ঠিক। তোর কি মনে আছে সেই সময়ে, ঠিক সেই সময়ে যখন আমরা আসন্ন বিচ্ছেদে ভারাক্রান্ত দুটি বিভ্রান্ত হৃদয় তখন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল!—সুরম্য বললেন, গাঢ় গম্ভীর স্বরে বললেন, এত মনে আছে, আর এই চূড়ান্ত ঘটনাটা, ক্লাইম্যাকসটা মনে থাকবে না? আমরা মৃদু গলায় কথা বলছি। আমাদের ডান দিকে যেখানে এখন প্রফেসরদের কোয়ার্টাস, দুরে কিছু প্রাইভেট বাড়িও উঠেছে, ওইখানে ছিল তখন সালোয়ার জঙ্গল। বেশ ভালো জঙ্গল। রাতেরবেলায় শেয়াল ডাকত। সেই জঙ্গলের মধ্যে থেকে হঠাৎ মেয়েলি গলার, খুব মৃদু, মধুর মেয়েলি গলার একটা কান্না উঠল। আমরা দুজনেই সটান উঠে দাঁড়িয়েছি। তিরবেগে ছুটে যাচ্ছি।
