ঘাস থেকে রোদ্দুর আরও সরে গেছে। উলকাঁটার থলি সংগ্রহ করে কল্যাণী ভেতরে চলে গেছেন। সম্ভবত দুপুরঘুম ঘুমোতে। সুরম্য জেগে উঠেছেন। খুবই জাগ্রত। হাতে চিঠি ধরা। চোখ খুলে, চোখ বুজে সুরম্য দেখছেন, দেখছেন, দেখছেন।
একদল হিংস্রমুখ ছেলে। অল্প বয়স। শাণিত বুদ্ধি। কিন্তু সামান্যতম সুযোগে ভেতরের রাক্ষসগুলো বেরিয়ে এসেছে। সুতরাং একদল ছেলে নয়। একদল রাক্ষস আসলে।
কী হল? একশোবার ওঠবোস করতে বললুম করলে না?
করলুম তো?
করলে? মাত্র পঁচিশবার করে বলছ একশো? শটকে জানো না এঞ্জিনিয়ার হতে এয়েচ, অ্যাঁ? করো বলছি আরও পঁচাত্তর বার।
আমি গুনে গুনে একশোবার করেছি।
দেখেছিস সৌমিত্র, তখনই বলেছিলুম ছেলেটা ত্যাঁদড়। অল্পের ওপর দিয়ে ছেড়ে দেব ভেবেছিলুম। এই ব্লাডি বাস্টার্ড, পাঁচশোবার কর।
সুরম্য অন্ধের মতো দৌড়ে গিয়ে বড়ো রাক্ষসের মুখ খিমচে দিয়েছে। তিনজন তিন পাশ থেকে ছুটে এসে তাকে ছাড়িয়ে নিল। বড়ো রাক্ষস রাগে কাঁপছে।
এত সাহস! অ্যাত্তো সাহস! এই তোরা ওকে নিয়ে যা। ওর ফাঁসির হুকুম হয়ে গেল।
সতেরো বছরের পেটের অসুখে ভোগা, মাদুলি-তাবিজ পরা, মা-বাপের একমাত্র আদুরে রোগাপাতলা ছেলে ঠক ঠক করে কাঁপছে। সুষ্ঠু একটা জাঙিয়া পরে।
সবাই মিলে তিনতলার ছাদে নিয়ে গেল ঠেলেঠুলে। বৃষ্টির জলের পাইপ দু হাতে ধরিয়ে দিল।
নাও। এবার কত বড় বাপের ব্যাটা তুমি দেখি, এই পাইপ বেয়ে নীচে মাটিতে নামতে হবে, তবে বুঝব শালা তোর বাপ আছে।
পাইপটা দু হাতে শক্ত করে ধরে সুরম্য ছাদের কোণে উপুড় হয়ে রয়েছে। দেহে সাড় নেই। মুখ ফ্যাকাশে। নীচে নিশ্চিত নিষ্ঠুর মৃত্যু।
কে একজন বলল, ও নিজে যাবে না। পা ধরে হ্যাঁচকা মেরে ঝুলিয়ে দে।
দৌড়ে ছুটে আসছে ওরা।
না। তীব্রস্বরে একটা চিৎকার। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়িয়েছে। কালো। ষণ্ডামার্ক। সুরম্য গতকালই ওকে দেখেছে। ওর পাশের বেড। এসেছে বীরভূম না বর্ধমানের গ্রামাঞ্চল থেকে।
আরে এটা তো সেই জংলিটা না? কী চাঁদ, তোমার দাওয়াই তো আগেই হয়ে গিয়েছে, আবার এয়েচ কেন? ব্যাধি বেড়েচে?
ওকে পাইপ ধরে নামতে বলছেন, যদি পড়ে যায়? যদি কেন? ও যাবেই পড়ে, তখন?
যাববাবা, পড়ে যাবার জন্যেই ওকে নামাচ্ছি।
বা চমৎকার! এই আপনাদের শহুরে কালচার? আমি এক্ষুনি থানায় যাচ্ছি।
যাও, যাও, প্রাণ যদি তাই চায় তো যাও।
তার মানে? আপনাদের প্রাণে ভয়ডরও নেই?
ভয় কীসের? নিজেই চড়ল ছাদে। কত করে বললুম ন্যাড়া ছাদ, এখনও পাঁচিল ওঠেনি। উঠিসনি, উঠিসনি। শুনল না। চড়ে নিজে নিজেই শূন্যে ঝাঁপ খেল। পাখি হতে সাধ গিয়েছিল বোধহয়। পাখি হয়ে কলকাতাতে যে কচি প্রিয়াকে ফেলে এয়েচে তারই কাছে যেতে যাচ্ছিল বেচারা। কেস এক্কেবারে সিধে সরল। যাকে জিজ্ঞেস করবে সাক্ষী দিয়ে দেবে।-খুদ খুশি কর লিয়া হ্যায় ইয়ে বেচারা।
কি করলে ছাড়বেন ওকে? বলতে বলতে ছেলেটি এসে হ্যাঁচকা টানে সুরম্যকে ছাদের কোণ থেকে রাক্ষসগুলোর মাঝখানে ফেলে দিল। সরম্যর পুরোপুরি জ্ঞান নেই। স্বপ্নে দেখার মতো দেখল রেনওয়াটার পাইপ বেয়ে দেখতে দেখতে ছেলেটা অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েকজন রাক্ষস নীচে ছুটেছে, আশিস আশিস, কী ডেঞ্জারাস ছেলে! তোরা শিগগিরই দোতলার বারান্দায় পজিশন নে।
প্রিয়াঙ্কুর তুমি তেতলায় চলে যাও। আর কেউ নেই জোরালো চেহারার? রাক্ষসের দলে ভীষণ চঞ্চলতা, ত্রাস, সাড়া পড়ে গেছে।
প্রায় মাঝ রাত্তির, তারা জ্বলজ্বল করছে কালো কুচকুচে আকাশে। হস্টেলের পেছনে ঘাসের ওপর বহাল তবিয়তে দণ্ডায়মান সেই ছেলেটি কান্তিময়। তাকে ঘিরে সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ারের দাদারা।
আরে বাস। শাবাশ ভাই। শাববাশ। ফর দা অ্যাক্ট অ্যান্ড দা স্পিরিট!
আমাদের একটু সময় দিলে না ভাই! কী যেন নাম বললে? কান্তি? এই, কান্তিকে একটা ট্রিট দে। সুরম্যকেও ইনক্লড কর। সুরম্য, লেটস বি ফ্রেন্ডস। শেক হ্যান্ডস। থ্রি চিয়ার্স ফর কান্তি উপাধ্যায় হিপ হিপ হুররে। থ্রি চিয়ার্স ফর সুরম্য ঘোষাল হিপ হিপ হুর রে।
প্রোসেশন করে ডর্মে নিয়ে আসা হল কান্তি আর সুরম্যকে। সুরম্যর পরনে তখনও খালি জাঙিয়া। প্রিয়াঙ্কুরদা বলল, ছি ছি সুরম্য, তুমি না বালিগঞ্জে মানুষ। এতগুলি দাদার মাঝখানে এই বেশে দেখা দিতে লজ্জা করল না তোমার? ছি, ছি ভাই। শত ধিক্কার তোমাকে।
জনকদা বলল, ধরো আমরা যদি কেউ মেয়ে হতাম? ওমা, কী লজ্জা গো! বেডকভারের খুঁট মাথায় চাপিয়ে মুহূর্তে জনকদা ঘোমটা-দেওয়া-বউ হয়ে পেছন ফিরে দাঁড়াল ত্রিভঙ্গ হয়ে।
চারদিক থেকে অমনি জামাকাপড় বর্ষণ হতে লাগল সুরম্যর মাথায়। বর্ষণ হয় আর দাদারা বলে, পরে নে সুরম্য, দেরি করলেই চাঁটা। মিনিট পাঁচেক পরে সুরম্যর সাজগোজ শেষ হল। প্যান্ট ফোর্থ ইয়ারের নিমাইদার যার কোমরের মাপ জলহস্তীর, শার্ট গিদওয়ানিদার, হাতাগুলো সুরম্যর হাত থেকে আরও এক ফুট মতো ঝুলছে, জুতো প্রিয়াঙ্কুরদার, সাইজ এগারো, সবাই বলে ইয়েতির পা, মোজাও তথৈবচ, তার ওপরে কোথা থেকে এক খুন-খারাপি রঙের টাই আর খোকাবাবুর মাপের স্ট্র-হ্যাটও হাজির হল।
মাঝরাতের ডিনারটা ভালোই হল। বাসমতীর ভাতের মধ্যে রুটির কুচো, লুচির কুচো, কড়াইশুটি, আলু গাজর, বাঁধাকপি, পালংশাক, স্কোয়াশ, টম্যাটো স-ব। মুখে তুলতে তুলতে জনকদা বললে, হরি হে মাধব, চান করব না গা ধোব? কে বেঁধেছ মানিক, চুপকে চুপকে না থেকে আমার নাকের গোড়ায় একটু এসে দাঁড়াও না বাবা, এ যে বিশ্বরূপের খাদ্য সংস্করণ রে শালা।
