বউদি গো। আমি জানি আপনার চাদ্দিকে এই যে অ্যাতো সামিগ্রি এতো পয়সা টাকা শাড়ি-জামা এসব কিছু না কিছু না। মনে সুখ নেই। ভয়ে, কষ্টে, লজ্জায় কাঁটা হয়ে আছেন। আমি সব বুঝি গো সব বুঝি।
মিসেস তালুকদারের কালো চশমা হঠাৎ খুলে যায়। বেরিয়ে পড়ে মার খাওয়া কুকুরের মতো দুটি চোখ। সন্ধ্যা ঘন হয়। আকণ্ঠ ওষুধ খেয়ে খোকন ঘুমোয়। বাড়ির কাজের লোক শান্তি পেছনের কারখানার লেম্যানের সঙ্গে তুমুল প্রেম করে। শব্দ করে ট্রাক যায়, ট্রাক আসে। চিৎকার করে কোথাও তীব্র কামোত্তেজক স্বরে বাজতে থাকে, মোকাবলা মোকাবলা লায়লা। মিসেস তালুকদার আর লক্ষ্মীমণি দাস মুখোমুখি বসে গুমরে গুমরে কাঁদতে থাকেন। সান্ত্বনাহীন।
মোহানা
সুরম্য ঘোষাল এবার বড়োদিনের পর বহু নববর্ষের চিঠির মধ্যে একটা চিঠি পেলেন সেটা একটু অন্যরকম। গতানুগতিক কার্ড নয়, প্রীতি শুভেচ্ছা নমস্কার ইত্যাদিও নেই। আছে আই আই টি খড়গপুরের কনভোকেশন উপলক্ষ্যে একটি ছাপানো নিমন্ত্রণপত্র। সেইসঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি লাইন বাংলায়, সুরম্য, এলে স্বভাবতই তুই আমার এখানেই থাকবি। ঠিকানা রয়েছে একটি এ-টাইপ। কোয়ার্টাসের, সই ডক্টর কান্তিময় উপাধ্যায়ের। চিনতে খুব দেরি হল না। দেরি হবার কথা নয়। কারণ আই আই টি জীবনে কান্তি বা কান্তিময়ই ছিল সুরম্য। ঘোষালের সবচেয়ে সহৃদয়, সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু। যদিও আই আই টি ছাড়ার বছরখানেকের মধ্যেই দুজনের কে কোথায় ছিটকে পড়েছিলেন তার ঠিক নেই। বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা, দেখাশোনা তো দূরের কথা, সামান্যতম যোগাযোগ পর্যন্ত ছিল না।
এতদিন পর এই নিমন্ত্রণপত্র এবং এক লাইনের চিঠি সুরম্যকে খুবই বিধুর এবং বিব্রত করল। বিধুর কেননা, মনে পড়ে যায়, সব মনে পড়ে যায়। বিব্রত কেননা, জানুয়ারি মাসের যে সময়ে কান্তি তার নিমন্ত্রণটা পাঠিয়েছে সে সময়ে তাঁর বম্বে যাওয়ার কথা। ডিরেক্টার্স-মিটিং। তাঁকে কাগজপত্র নিয়ে হাজির থাকতে হবে। তিনি যদি না যান বোসকে পাঠাতে হবে, তার জন্য বোসকে এখন থেকেই ব্রিফিং করা দরকার। কান্তি যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে, অভিজ্ঞতা এবং কাণ্ডজ্ঞান আছে তাই বেশ খানিকটা সময় হাতে রেখে নিমন্ত্রণটা পাঠিয়েছে। কিন্তু ঠিকানাটা পেল কী করে? গত তিরিশ বছরে তো স্থানবদল মন্দ হয়নি। তেত্রিশের এক বম্পাস রোড কলকাতা থেকে, মহাত্মা গান্ধি রোড ব্যাঙ্গালোর, চিন্তামননগর পুনা, জওহরলাল। নেহরু মার্গ ভুবনেশ্বর হয়ে এখন কোশি রোড জামশেদপুর।
সত্যি, দিনগুলো কীভাবে উড়ে যায়! না উবে যায়! সামান্য একটু গন্ধ রেখে। সুরম্য চিঠিটা পেয়েছিলেন দুপুরে খাওয়ার সময়ে বাড়ি এসে, স্ত্রী-ই ধরিয়ে দিয়েছিলেন খামটা। তখন লনের ছায়া-পড়া দিকটায় কাঁটালগাছের তলায়, স্টিল ফ্রেমের ইজিচেয়ার পেতে সুরম্য দু-মিনিটের জন্য চোখ বুজেছেন কি বোজেননি। এই সময়টা আজকাল বড়ো ঘুম পায়। ঘুমটা দশ মিনিটের মধ্যে বন্দি থাকলে ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তা থাকছে না। দশ ছাড়িয়ে পনেরো, পনেরো ছাড়িয়ে কুড়ি মিনিট। আধ ঘন্টার দিকে ঝুঁকছে। যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্নর মতো যা আধ ঘন্টা তাই এক ঘন্টা হয়ে যাবেই একটু সাবধান না হলে। মাঝে মাঝে নিজের নাক ডাকা নিজেই শুনে চমকে জেগে ওঠেন সুরম্য। আজ মনে করলেন স্ত্রীকে বলবেন। দুপুরেও রুটিই দিতে। এই ভাত-ঘুম বন্ধ করতেই হবে। কল্যাণী এসে চিঠিটা হাতে দিতে অর্ধনিমীলিত চোখ পুরো খুলে মনের বাসনাটা ব্যক্ত করলেন সুরম্য।
ভুরু কুঁচকে উল বোনা থামিয়ে কল্যাণী বললেন, কেন? ভাত-ঘুম বন্ধ করবে কেন?
সে কী! ভাত-ঘুম ভালো? চালিয়ে যাব?
পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছ, সারাদিন কোম্পানি অস্থি মজ্জা শুষছে। দুপুরে এক ঘন্টা ঘুমোলে কি বড়োসাহেব খুবই রাগ করবেন?
ওঃ তুমি যে একেক সময়ে কী বলো। বড়োসাহেবের রাগ-অনুরাগের ওপর আমার জীবনযাত্রা নির্ভর করছে নাকি?
তা ছাড়া আর কী? আজ তোমার ঘুম নির্ভর করছে, কাল তোমার খাওয়া দাওয়া শোওয়া-বসাগুলোও করবে। অমন চাকরি আর এ বয়সে না-ই করলে?
ভুঁড়ি হয়ে যাবে কল্যাণী, বোঝো না?
স্ত্রী যেমন স্বামীর দুর্বল স্থানে আঘাত করতে জানেন, স্বামীও তেমনি স্ত্রীর দুর্বল স্থানটির খোঁজ রাখতে ভোলেন না। এবং সে স্থান হল ভুড়ি। কল্যাণী নিজে যোগ ব্যায়াম করে চেহারাটি মোটের ওপর একহারা রাখতে পেরেছেন। ভুড়িয়াল স্বামী তাঁর দু-চক্ষের বিষ। কিন্তু সুরম্যকে অবাক করে দিয়ে কল্যাণী বললেন, এমন করছ যেন ভুড়ি হতে আর বাকি আছে! আর এই বয়সে একটু-আধটু ভুড়ি ভালোই দেখায়। যে সময়ের যা। প্রধানমন্ত্রীকে আজকাল টাকে কেমন সুন্দর মানিয়ে যাচ্ছে দেখছ না?
সুরম্য অবাক হতে হতে চিঠিটা পড়ছিলেন। চিঠিটা পড়তে পড়তে অবাক হচ্ছিলেন। আই আই টি খড়গপুর। কোথায় সে? কখন? দেশকালের কোন বিন্দুতে? ছেলেকে শান্তিনিকেতনে ভাস্কর্য শিখতে পাঠানো হয়েছিল। বাবা-মার অনেক ইচ্ছা সত্ত্বেও সে মহাজন পন্থা অনুসরণ করেনি। এখন কাঁথা-সেলাইয়ের পাঞ্জাবি পরে ললিতকলা আকাদমি ও কলাভবনের মধ্যে যাতায়াত করে। তার সঙ্গেই সম্পর্ক কমে আসছে, আর আই আই টি খড়গপুর! তারপয়ে আবার ক্ষুদ্র এক লাইনের অন্তরঙ্গ বাংলা, এলে তুই স্বভাবতই আমার এখানেই থাকবি কান্তি।
