খটখট করে হাই-হিল বেরিয়ে এল, ছেলের হাত ধরল গাড়িতে উঠে গেল। হুশশ।
মিসেস চক্রবর্তী বললেন, ভাঙবে তবু মচকাবে না।
ওদিকে ছেলেকে বাড়িতে রেখে মিসেস তালুকদার আবার অফিসে ফিরে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগত ব্যাপারে উতলা হয়ে অফিসের কাজের ক্ষতি যে করা চলে না এ বিষয়ে তাঁর জ্ঞান টনটনে। কিন্তু ব্ৰাবোর্ন রোডে উড়াল থেকে নামতে গিয়ে তিনি আরেকটু হলে একটা দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছিলেন। মারমুখী পুলিশ জনতা সব ঘিরে এসেছিল।
কানা না কি? চোখে দেখতে পান না?
সকালবেলাই মদ গিলেছে। এসব ধরনের মেয়ে লোক…
যে মুটেটি পড়ে গিয়েছিল তাকে একশো টাকার একটা নোট বার করে দিলেন। মিসেস তালুকদার। কিছু হয়নি। তিনি শেষ মুহূর্তে ব্রেক কষেছেন। কিন্তু ঘাবড়ে গিয়েই লোকটা রাস্তার পাশে পড়ে গেছে। সামান্য একটু ছড়েছে হাঁটুতে। পুলিশটি তর্ক করতে করতে ওঁর গাড়িতে উঠল। কিছুদূর গিয়ে তাকেও একটা বড়ো নোট দিলেন মিসেস তালুকদার।
চোখ থেকে কালো চশমাটা নামালেন মিসেস তালুকদার। টেবিলের ওপর রাখলেন ব্যাগ, কালো চশমা। টয়লেটে গেলেন। চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিলেন। মেক-আপ উঠে যাওয়া মুখখানা ফুটে উঠেছে আয়নায়। তিনি প্রসাধনের নানান সামগ্রী বার করে মুখে-চোখে ফ্যাশন, অহংকার, উচ্চপদস্থ গাম্ভীর্য, যান্ত্রিক নির্লিপ্তি সব এঁকে নিলেন। শুধু চোখদুটোকে কিছুতেই পালটানো যায় না। তাই ঘরে কেউ এলেই তিনি কালো চশমা পরে নেন।
ইয়েসস হোয়াট ক্যান আই ডু ফর য়ু…।
বাড়ি ফিরতে সন্ধে। তিনখানা টিপটপ সাজানো শূন্য ঘর। নিজেই চাবি ঘুরিয়ে ঢুকেছেন মিসেস তালুকদার। তাঁকে কফি তৈরি করে দিয়ে তাঁর কম্বাইন্ড হ্যান্ড শান্তি চলে গেল। কফি পান করে চুপচাপ বসে রইলেন তিনি। একেবারে নিস্তব্ধ, স্থাণু, পা দুটো সামনে ছড়ানো, মাথাটা সোফার গায়ে হেলে আছে। চোখ দুটো বোজা।
দরজায় টুকটুক করে ঘা। প্রথমে উপেক্ষা করেছিলেন, আবার টুকটুক টুক। মিসেস তালুকদার দরজার চোখে চোখ লাগিয়ে দেখলেন একটি বেশ বেঁটে দীন চেহারার মহিলা, যদিও পরিপাটি করে ছাপাশাড়ি, লাল ব্লাউজ পরা। তিনি কালো চশমাটা পরে নিলেন, দরজাটা খুলে দিয়ে বললেন, কী চাই?
আমাকে চিনতে পারছেন না বউদি? আমি লক্ষ্মী।
ভেতরে এসো। কে বলো তো?
ভেতরে ঢুকে, আঁচল দিয়ে গলাটলা মুছে লক্ষ্মী বলল, আমি সেন্ট অ্যালয়ের আয়া। পুজোয় অত বখশিস করতেন আর চিনতে পারলেন না?
এতক্ষণে চিনতে পারলেন মিসেস তালুকদার। বললেন, ও, তুমি লছমি না?
ওই হিন্দুস্তানিরা লছমি লছমি করে ডাকত। আমার নাম লক্ষ্মী, বউদি।
লক্ষ্মী বা লছমি কেন এখানে তাঁর বাড়ি এসেছে মিসেস তালুকদার বুঝতে পারলেন না। আর একটা বড়ো নোট খোয়াবার জন্যে তিনি প্রস্তুত হলেন। তাঁর পরিচিত জগতের সর্বত্র মিসেস তালুকদার নিজের অজ্ঞাতে যেন ক্ষমার অযোগ্য সব অপরাধ করে ফেলেছেন। গুনগার দেবার জন্যে তাঁকে সবসময়ে প্রস্তুত থাকতে হয়।
বউদি খোকন কোথায়?
ঘুমোচ্ছে।
ভালো, ঘুমুক, ঘুমিয়ে নিক। বড়ো ধকল। বড্ড ধকল ওর ওপর দিয়ে যায় বউদি। … কত চাইছে এই লক্ষ্মী? কেন চাইছে?
বউদি, আপনি একবার ভালো করে খোঁজ করলেন না?
কীসের খোঁজ করব।
ওই যা সব ডি সুজা, ছেলেরা, গার্জেনরা বলল খোকার সম্পর্কে? বিশ্বাস করে নিলেন।
মিসেস তালুকদার চুপ করে রইলেন।
সেই ছোট্ট থেকে তো ওকে দেখে আসছি বউদি। ভগবান দয়া করেননি। এমনি করেই ওকে গড়েছেন বউদি। ওকে আপনাকে দগ্ধে দগ্ধে মারবেন বলে। ছেলেগুলো এইটুকুন টুকুন ছেলে সব কী পাজি। কী নিষ্ঠুর। ওর ওপর কী অত্যাচার করে ভাবতে পারবেন না।
মিসেস তালুকদার নড়েচড়ে বসলেন।
হঠাৎ লক্ষ্মী কেঁদে ফেলল, ও তো ঘুমুচ্ছে, আমার কথা বিশ্বাস না হয়, ওর পিঠের জামাটা ভালো করে তুলে দেখুন দিকি বউদি। কোথায় সে? আসুন।
লক্ষ্মী নিজেই বাড়ির কর্ত্রীকে তার শোবার ঘরে নিয়ে গেল।
অকাতরে ঘুমোচ্ছে খোকন।
সন্তর্পণে পিঠের দিকে জামাটা তুলল লক্ষ্মী। ফিসফিস করে বলল, টর্চ আনুন, টর্চ আনুন একটা।
সারা পিঠময় আঁচড়ের দাগ। পুরোনো, নতুন, ঊরুতে, আঙুলেও।
এসব কী বউদি? দেখেননি?
আমি ভাবি মারামারি করেছে। পড়ে গেছে—এইসব।
না, না—লক্ষ্মী প্রতিবাদ করে উঠল—ওকে পেনসিল দিয়ে খোঁচায়, ব্লেড দিয়ে পিঠে কেটে দেয়, আঁচড়ে দেয়, অন্য অত্যেচারের কথা না-ই বললাম।
ক্লাস টিচার জানে?–কেঁপে উঠে বললেন মিসেস তালুকদার।
ওই ডি সুজা? হাড় হারামজাদি বজ্জাত। সব জানে। ওকে দেখতে পারে না তো। প্রিন্সিপাল সাহেবের কাছে লাগায়। সেই নার্সারি থেকে লাগাতার এই চলে আসছে।
ও তো আমার কোনোদিন বলেনি? কেউ তো বলেনি।
কে বলবে? ওইসব গার্জিন মায়েরা? ওদের কি মা বলে? না মানুষ বলে! ওই সোমগিন্নি তো প্রিন্সিপালের পায়ে পড়েছিল। কী না ছোটো মেয়ে থার্ড হয়ে গেছে। সে নাকি ফার্স্ট না হলে দুঃখে আত্মঘাতী হবে। বেরাকেটে ফার্স্ট করিয়ে তবে ছাড়ল। ওদের কথা ছাড়ন। আর কে বলবে? আপনার খোকন? হা ভগবান তিনি কি ওদের বলবার মুখ দিয়েছেন? কে মারছে। কে গাল দিচ্ছে। কিছু বলবে না, বলতে পারবে না। আমি জানি বউদি। আমার যে ঠিক এমন একটি আছে। কত ওযুধপালা, কত ওঝা, কত পিরের থান করলুম বউদি, ওই একই ধারার রয়ে গেল। যত বড়ো হচ্ছে ততই আরও খারাপ। আমি পেটের ধান্দায় বেরিয়ে আসি, আশেপাশের ছেলেরা ওকে মেরে হেঁচে দেয় বউদি। বাড়ি গিয়ে দেখি দাঁত দিয়ে রক্ত পড়ছে। মুখ নীল, জামাকাপড়ে নর্দমার কাদা… বলতে বলতে লক্ষ্মী ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল।
