হলে কি আর সন্তানের মঙ্গল হয়? চাই আত্মত্যাগ। মিসেস পিঙ্কি অগ্রবাল একটি কচি মারোয়াড়ি মা। তাঁর ছেলে বান্টি দুর্ধর্ষ দুরন্ত। পড়াশোনায় মন নেই। টিফিনের ছুটি হওয়া মাত্র মায়ের কাছে থেকে বল নিয়ে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার মা তার পেছনে ছুটে ছুটে তাকে খাওয়ান। অন্যান্য মারোয়াড়ি তনয়রা-তনয়ারা বাড়ি থেকে টিফিন আনারও ধার ধারে না। টিফিনের সময়ে ফুচকা, চটপটি, দহি-বড়া, আইসক্রিম এইসব খায়। মিসেস মুখার্জি গালে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, আচ্ছা ভাই পিঙ্কি, তোমাদের ছেলেমেয়েদের অসুখও তো করে না। বারো মাস তিরিশ দিন এই খাচ্ছে।
সত্যি এক-একজনের স্বাস্থ্য কী? গাঁট্টাগোট্টা, কেউ কেউ আবার ইয়া মোটা। পিঙ্কি অগ্রবাল বাঙালিপ্রধান এক মাল্টিস্টোরিড-এ থাকেন, বাঙালিদের মতো হয়ে গেছেন, তাঁর একটি গোপন বাসনাও আছে, মিসেস মুখার্জির মেয়ে বান্টির সঙ্গে পড়ে, যথারীতি ফার্স্ট হয়। আর বান্টির কোনো ঠিক নেই। আজ থার্ড হল তো কাল লাস্ট বাট ওয়ান। একবার ফেল করতে করতে বেঁচে গেল। তা পিঙ্কি অগ্রবালের গোপন বাসনা হল, মিসেস মুখার্জির মেয়ে ঈশিতা মুখার্জির খাতা। খাতাগুলো যদি একবার পান! তাই তিনি এই বাঙালিনি সংঘের সভ্য হয়ে গেছেন, সব কথাতেই সায় দ্যান।
মিসেস মুখার্জির বিস্ময়ের উত্তরে তাই তিনিও বিস্মিত হন, মেরি সমঝমে তো নহি আতা বহিন। বান্টিকো তো ম্যায় সেরভর ভঁইস কা দুধ পিলাতি, ভুজিয়া ভি উও বহোৎ পসন্দ করতা, চাবল থুক থুককে ফেক দেতা। রোটি একঠো উসকো অন্দর জায় তো পূজা চড়াতি ম্যায় হনুমানজিকো। চল তো যাতা উনকি আশীরোয়াদ সে।
এইভাবেই মায়েদের সাধনা চলে। বা বলা চলে তপস্যা। এই তপস্যার প্রত্যক্ষ ফল মিসদের সঙ্গে ডাইরেক্ট কানেকশন। পারস্পরিক আদানপ্রদান। ছেলেমেয়েদের পরীক্ষাসাগর সসম্মানে উত্তীর্ণ হওয়া এবং সারাদিনের মজলিশ। আড্ডা।
রোমাঞ্চকর ঘটনাও ঘটে। যেমন মিসেস তালুকদারের ছেলে বেধড়ক পিটুনি খেতে খেতে বেঁচে যায়। অনেক চেষ্টা করে ক্লাস ওয়ানে উঠেছে ছেলেটা সাধারণত তার আদত মুখে আঙুল পুরে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা। কিন্তু ওয়ানে পড়া বাচ্চারা প্রায় সবাই যুযুধান টাইপের। তারা তাকে তেমন থাকতে দেবে কেন? কেউ তার চুলে ফড়িং বেঁধে দেয়। কেউ তার পিঠে ডঙ্কি লিখে দ্যায়, কয়েকজনে মিলে চারদিক থেকে হু ক্কা হুয়া করতে থাকে। সমবেত মায়েরা ব্যাপারটা দেখে হেসে এ ওর গায়ে চলে পড়েন।
পারেও ছেলেগুলো…মিসেস সোমের মন্তব্য। হাসিতে তাঁর শ্বাস আটকে যাবার অবস্থা।
খালি মিসেস দস্তুর, ডিগডিগে রোগা, বুক পিঠ সমান ফ্যাকাশে ফরসা মিসেস দস্তুর বলেন, দিস ইজ নট প্রপার। দে শুড ডু সামথিং অ্যাবাউট ইট।
কিন্তু এই দে যে কারা সে সম্বন্ধে তিনি কোনো ইঙ্গিত দ্যান না।
মিসেস মুখার্জি বলেন, থামুন তো। এই করতে করতেই দেখবেন ছেলেটা স্মার্ট হয়ে উঠবে।
স্মার্ট না হলেও প্রতিক্রিয়া হল। মিসেস তালুকদারের ছেলে একদিন রাগে সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, সামনে ছিল রোগা দুবলা কৌশিক। দড়াম করে মাটিতে পড়ে, তার মাথা ফেটে কাঁচা রক্ত।
মায়েরা সব দৌড়ে কেউ জল আনলেন। কেউ অফিসে, কেউ প্রিন্সিপালের কাছে খবর দিলেন। ছেলের দল ফরসা। খালি মিসেস তালুকদারের ছেলে মুখে আঙুল পুরে এককোণে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশ দিয়ে যেতে যেতে মিসেস সোম বললেন, শয়তান একটা।
মিসেস রে বললেন, আজ তোমার হবে!
প্রিন্সিপালের আদেশে ক্লাসে যাওয়া এখন বন্ধ ওর। তিনি হসপিট্যাল থেকে কৌশিক ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
মায়েরা দারুণ কৌতূহলাক্রান্ত হয়ে বসে আছেন। কেনিংটা প্রিন্সিপ্যালের ঘরে হবে না সর্বসমক্ষে এই স্কুল কমপাউন্ডেই হবে এই নিয়ে গবেষণা চলছে।
এমন সময়ে বাহাদুর সরসর করে গেট খুলে দিল। মিসেস তালুকদারের গাড়ি।
নেমে ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বোধহয় একটু অবাক হলেন। গালে একটা আঙুলের টোকা দিয়ে প্রিন্সিপ্যালের ঘরের দিকে চলে গেলেন।
প্রিন্সিপ্যাল কঠিন চোখে তাকিয়ে আছেন, মিসেস তালুকদার বসলেন, আপনাকে ডাক্তারের সার্টিফিকেট আর একটা চিঠি দিতে এলাম আমার ওয়ার্ডের ব্যাপারে।
দেখি।
চিঠি এবং সার্টিফিকেট পড়ে প্রিন্সিপ্যাল সামান্য নরম চোখে চেয়ে বললেন, ইটস আ স্ট্রেঞ্জ কয়েনসিডেন্স মিসেস তালুকদার। আপনার ছেলেকে আমি আর একটু হলেই পাবলিক কেনিং করতে যাচ্ছিলাম। এই চিঠিটার ফলে…
শিউরে উঠে মিসেস তালুকদার বললেন, সে কী কেন?
ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে ক্লাস ফেলোর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। ইটস আ ন্যাস্টি ক্র্যাক…
ও তো এরকম…
হি ইজ আ জুয়েল টাইপ। আমি আগেও রিপোর্ট পেয়েছি।
এরকম কিছু তো আমি জানি না। দেয়ার মাস্ট হ্যাভ বিন সাম গ্রেভ প্রোভোকেশন। আপনি প্লিজ খোঁজ করুন। …
খোঁজ করাতে ক্লাস ওয়ানের মিস ডি সুজা, ক্লাস ক্যাপটেন চিত্রেশ রঙ্গনাথন এবং কমপাউন্ডে বসে থাকা মায়ের দল মিসেস অগ্রবাল আদি একবাক্যে সাক্ষ্য দিল, ইয়েস হি ইজ আ ক্রুয়েল টাইপ। ডি সুজা ক্লাস টিচার সবেচেয়ে খারাপ রিপোর্ট দিলেন। মিসেস তালুকদারের ছেলে নাকি অন্যদের চিমটি কাটে, পেনসিলের খোঁচা দেয় যেখানে-সেখানে, ব্লেড দিয়ে হাত পা কেটে দেয়। শুনতে শুনতে মিসেস তালুকদারের মুখ পাঁশুটে হয়ে যাচ্ছিল। সানগ্লাসটা কিন্তু একবারও নামাননি। কাজেই চোখের ভাব পালটেছে কি না দেখা গেল না।
