ঘেউ ঘেউ ঘেউ! রাস্তায় কতকগুলো নেড়ি কুত্তা তাঁর পেছু নেয়। দূর! দূর! প্রতিমা কোনোমতে বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়ির গেটের কাছে এসে নেড়ি কুত্তাগুলো দ্বিগুণ জোরে ডাকতে থাকে, ঘেউ ঘেউ ঘেউ।
আমর—মোলো যা—উমি বাগান থেকে ঢিল কুড়িয়ে নিয়ে মারে—দূর দূর দূর। যায় না নেড়িগুলো। যদি বা অন্যগুলো যায় একটা কিছুতেই যায় না। গেরুয়া আর কালো মেশানো রং, বেশ হৃষ্টপুষ্ট। পাত-কুড়োনো খেয়েও। গেট টপকাবার চেষ্টা করে, ডাকতে থাকে, ঘেউ ঘেউ ঘেউ। খাবার ঘরের কোণে কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়েছিল ঝুপলি। তার ছোটো ছোটো কানগুলো খাড়া হয়ে ওঠে, সে একবার সাড়া দেয়—কৌ।
ঘৌ ঘৌ ঘাউ! ওদিক থেকে ভেসে আসে।
তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে ঝুপলি—কৌ, খৌ, ঘৌ, ঘৌ—সে তিরবেগে গেটের দিকে ছুটে যেতে থাকে। মুখার্জি সাহেবের সমস্ত শরীরের জোর লাগে তাকে কোলে তুলে নিয়ে আবার খাবার ঘরে আনতে, কলার এবং চেন বেঁধে আটকাতে। আটকাবার পরও ঝুপলি মেঝেতে গড়াগড়ি দেয়, আকুলিবিকুলি করে এবং ডাকতে থাকে কৌ, কৌ, ভৌ। যদিও নেড়িটাকে ততক্ষণে নির্ভীক উমিচাঁদ তাড়াতে তাড়াতে পাড়া পার করে দিয়ে এসেছে।
মুখার্জি সাহেব জরুরি বৈঠকে বসেন সেনগুপ্তের সঙ্গে। সেনগুপ্ত বলেন, আমার পুটপুটিটা যদি পুং হত তো কথাই ছিল না। দুটোতে কেমন চমৎকার মিলও। আহা জানোয়ারদের জগতে যদি হোমো থাকত দাদা।
মুখার্জি চুরুটে টান দিয়ে বলেন, না অনিল, কথাটা তুমি লাইটলি নিয়ো না।
অনিল সেনগুপ্ত বলেন, আচ্ছা রাত্তিরের দিকে সব চুপচাপ হয়ে গেলে একটা খুব গম্ভীর কুকুরের ডাক শুনি যেন। কোথায় বলুন তো? দাঁড়ান আমি খোঁজ নিই।
দু চারদিন পরে খোঁজ খবর করে এসে অনিল সেনগুপ্ত বলেন, চলুন দাদা আপনার সমস্যার সমাধান বোধহয় হয়ে গেল। যশবন্ত কাপুর বলে এক পাঞ্জাবি থাকে ওদিকে। অ্যালসেশিয়ান। আপত্তি নেই তো?
আরে বাবা জাতে খানদানি হলেই হল। অ্যালসেশিয়ানই হোক আর তোমার ডালমেশিয়ানই হোক।
বিকেলের দিকেই ঘটকালি অভিযান শুরু হল। প্রতিমা যেতে চাননি।
যত সব অনাছিষ্টি কাণ্ড! সাহানা পুটপুটিকে নিয়ে হাওয়া খেতে বেরোবেন। অগত্যা অনিল সেনগুপ্ত একাই মুখার্জিদাকে সঙ্গ দ্যান। মুখার্জি সাহেবের পাশে। পাশে হেঁটে চলে শেকলবন্দি সদ্য রজঃস্বলা ঝুপলি।
যশবন্ত কাপুর সাদরে গেট খুলে দ্যান, আই য়ে আই য়ে মুখার্জিসাব, আই য়ে সেনগুপ্তা সাব, ইয়ে তো আপকীই কোঠি হ্যায়। বইঠিয়ে, আরাম কিজিয়ে। লনের মাঝখানে বেতের চেয়ার টেবিল পাতা। কেতাদুরস্ত বেয়ারা এসে লস্যি দিয়ে যায়। বেয়ারাকে নির্দেশ দেন যশবন্ত কাপুর-রোভারকো ছোড় দো। সবে দু তিন চুমুক দেওয়া হয়েছে লস্যিতে, পশ্চাৎপটে মিসেস কাপুরকেও দেখা যাচ্ছে হাসতে হাসতে, বিপুল ফাঁদের সালোয়ার কুর্তা পরা সদালাপিনী বেরিয়ে আসছেন, এমন সময় শোনা গেল—ঘাঁউ ঘাঁউ ঘাঁউ। অর্থাৎ রোভারকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পরক্ষণেই সুপুষ্ট্র পেশিপ্রবাহে বিদ্যুৎ খেলিয়ে দৌড়োত দৌড়োতে আসতে লাগল রোভার। রোভার তো রোভারই। বালি-বালি রঙের মাজা শরীরটি। দুই কানের মাঝখানটা কালো, নাক মুখও কালো। ঝকঝকে, বলিষ্ঠ, অভিজাত, মধ্যযুগের বীর যোদ্ধাদের মতো কুকুর রোভার। জামাই করতে হয় তো এইরকম! বাতাসে নাক তুলে যেন কী শুকল, তারপর ঝড়ের বেগে ঝুপলির দিকে দৌড়ে আসতে লাগল রোভার। এবং সঙ্গে সঙ্গে মুখার্জি বাবার হাতের শেকল হ্যাঁচকা টানে খুলে টেবিলের ওপর লস্যির গেলাস উলটিয়ে ঝুপলি তার নোম-টোম খাড়া করে দিল ভোঁ দৌড়। দৌড় দৌড় দৌড়। একেবারে এ গলি পেরিয়ে সে গলি পেরিয়ে সে বাড়ি টপকিয়ে সে ফ্লাওয়ারি নুক-এ হাজির। মুখার্জি মা-র কোলের ভেতরে ঢুকে তবে নিশ্চিন্ত।
লনে লস্যির প্লাবন বইছে, দুখানা গ্লাস ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। মুখার্জি সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন বারবার।
ইসমে আপকা ক্যা কসুর হ্যায় জী? যশবন্ত কাপুর মজা পেয়ে হাসতে লাগলেন।
গম্ভীর মুখে বাড়ি ফিরে এলেন মুখার্জি বাবা, সেনগুপ্তকাকা। বাড়ি ফিরতে সাহানা জিজ্ঞেস করলেন, কী হল?
সেনগুপ্ত বললেন, না, রিস্তা নাকচ করে দিলে বেটি! বহোৎ নারাজ।
তাই-ই! সাহানা হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগলেন সব শুনে!
মুখার্জিদের পক্ষে কিন্তু ব্যাপারটা খুব হাসির রইল না। তাঁরা ঝুপলিকে সাধারণত ছেড়ে রাখতেই পছন্দ করেন। খুব ভালো মেজাজের কুকুর। কাউকে বিরক্ত করে না, কামড়ায় না। ঘরদোর নোংরা করে না, গেট বন্ধ আছে, তার চত্বরের মধ্যে যত খুশি ঘুরে বেড়াক না। চেন পরবে একমাত্র বেড়াতে যাবার সময়ে। ঝুপলি তার এ স্বাধীনতা উপভোগ করে, অপব্যবহার করে না কখনও। মুখার্জি সাব বিকেলবেলা তাকে বেড়াতে নিয়ে যাবার সময়ে ডাকাডাকি করেও পেলেন না। আশ্চর্য! ঝুপলি তো বাড়ির মধ্যে নেই। আঁতিপাঁতি খুঁজেও তাকে পাওয়া গেল না। এ বাড়ি ও বাড়ি খোঁজা শেষ করে, উদ্বেগে হতাশায় কালো হয়ে দুজনে বসে আছেন, এমন সময়ে দেখা গেল ঝুপলি ফিরছে। গেটের ফাঁক দিয়ে গলে এলো। আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল। বাবা কিছু বলছেন না, মা কিছু বলছে না। ঝুপলি ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল সে তার চেনটা মুখে করে আনছে। বাবার পায়ের কাছে চেনটা রেখে দিয়ে সে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল। বোকা বোকা কুতকুতে চোখদুটো বাবার চোখের দিকে চেয়ে স্থির। প্রতিমা ধীরে ধীরে উঠে ভেতরে চলে গেলেন। মুখার্জি সাহেব আর্দ্র গলায় বললেন, ঝুপলি, ঝুপলি, নটি গার্ল তোমাকে চেন পরতে হবে না, এখন চেন পরালে তোমার মা ভীষণ কাঁদবে। কিন্তু আর কক্ষনো অমন একা একা বাইরে যাবে না। যাবে না তো? ঝুপলি তার বেঁটে ল্যাজটা প্রাণপণে নাড়াতে লাগল। তারপর লাফিয়ে বাবার কোলে উঠল, কোলের মধ্যে যদুর সম্ভব কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে বসে আদর খেতে লাগল।
