সাহানা বললেন, ঠিকই বলছেন মুখার্জিদা, কিন্তু কে যে বেশি খানদানি সেটাও স্পষ্ট বোঝা হয়ে গেল। একজন ইঁদুর খায়, আরেকজন ছুঁয়েও দেখে না। ঠাট্টার সুরেই বললেন সাহানা, কিন্তু পরে দুই দম্পতি যে যার বাড়িতে একা হলে এ নিয়ে বেশ মনোমালিন্য হল। প্রতিমা বললেন, আজেবাজে জিনিস খাবার ঝোঁকটা ঝুপলি তার বাবা অর্থাৎ মুখার্জি সাহেবের থেকে পেয়েছে। তিনি যে অত শুদ্ধতা, বাছবিচার মেনে চলেন সে কি এমন এমনি? আর সাহানা কোন মুখে খানদানের কথা উচ্চারণ করে? পুটপুটিকে ওরা দার্জিলিঙে এক ভুটিয়ার কাছ থেকে কিনেছিল কুড়ি না পঁচিশ টাকা দিয়ে। আর ঝুপলি? জহর দাস তো বিগত তিন পুরুষের হিসেব দিল ঝুপলির। ঝুপলির ভাই তো রাজ্যপালের ঘরে মানুষ হচ্ছে। আইরিশ টেরিয়ার। পাওয়াই যায় না এদেশে। তবে?
ওদিকে সেনগুপ্তদের বাড়িতে সাহানা বললেন, এম. এ. বি. টি করা যে এত দোষের সেটা এই প্রথম জানলুম! অনিল সেনগুপ্ত বললেন, আরে ছাড়ো তো তোমাদের মেয়েলি কুটকচালি! সাহানা তখন রাগ করে বললেন, ঠেস দেওয়া কথাটা কিন্তু কোনো মেয়ে বলেনি, একজন পুরুষই বলেছেন এবং তাঁর সত্তরের যথেষ্ট ওপরে বয়স পঁচাত্তর তো হবেই। পেডিগ্রি-ডগ কিনে অহংকারে একেবারে মটমট করছেন। আরে বাবা পরামর্শটা কে দিল? কিনিয়েটা দিল কে?
ঝুপলি কিন্তু সেনগুপ্ত-পরিবারেরও খুব নেটিপেটি। প্রথম ইঁদুরটি মারার পর থেকে সে নিজেদের বাড়িতে তো বটেই সেনগুপ্তদের বাড়িতেও ইঁদুর মারতে যায়। যদিও আর খায় না। ইঁদুরের স্বাদ তার ভালো লাগেনি। একতলা বাংলো বাড়ি। ইঁদুর-ছুঁচোর উপদ্রব আছেই, উপদ্রব বাড়লে সাহানাই বলেন, ঝুপলিকে ডাকো তো! ইনি তো একটি কম্মের ঢিপি। এই নিন্দাবাদ শুনে পুটপুটি তার ক্লোকের মধ্যে আরও সেঁদিয়ে যায়। অন্তত সাহানার তাই ধারণা। কিন্তু লজ্জা পেলে কী হবে। আরাম, ঘুম এ সমস্ত ছাড়বার কোনো লক্ষণই সে দেখায় না। সাহানা বলেন, বেহায়া তো! অপমান হজম করবে, তবু গতর নাড়বে না।
সেবার পুজোয় বিজয়ার সময় ভারি মজাই হল। বিজয়া দশমীটাই একমাত্র উপলক্ষ্য যখন মুখার্জিদের বাড়িতে প্রচুর জনসমাগম হয়। সব বাড়িতেই হয়। মুখার্জিদের বাড়ি একটু বেশিই। একাদশী থেকে কালীপুজো পর্যন্ত চলে। তা, এইরকম একটা দল সেবার বোধহয় প্রথম আসছে, আশেপাশে জিজ্ঞেস করছে বাড়ির নম্বর বলে। এদিকে পরিকল্পিত পল্লি যেমন হয়, একই রকমের রাস্তা, বাড়িগুলোও মোটামুটি একই ধাঁচের। কিছুতেই ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছে না দলটি, অবশেষে একটি বালক বলল, ও ঝুপলিদের বাড়ি? ওই তো ডানদিকে গিয়ে বাঁ দিকে ঘুরেই দুটো বাড়ি পরে।
এঁরা মুখার্জিদের মাসিমা মেলোমশায় ডাকেন। বাড়ি খুঁজে আসা হল, খাওয়াদাওয়া আড্ডা সব হল, শেষে ইতস্তত করে বললেন—মেলোমশায় কি কোনও বাচ্চা পোষ্য-টোষ্য নিয়েছেন না কি?
কেন বলো তো?
না। ওইদিকে একটি ছোটো ছেলে বলল কি না ঝুপলিদের বাড়ি। ঝুপলি তখন গ্যাঁট হয়ে তার মায়ের কোলে বসে বসে কুতকুত করে অভ্যাগতদের দেখছে। এত বোকার মতো যে দেখলেই হাসি পাবে।
মুখার্জি সাহেব তাকে দেখিয়ে হেসে বললেন, পোষ্যই বটে। এই যে ইনিই সেই ঝুপলি ঠাকরুন, যাঁর নাকি এই বাড়ি! সাধ করে নাম রেখেছিলুম ফ্লাওয়ারি নুক। ফ্লাওয়ার্সও মন্দ ফোঁটাইনি। তিন রঙের জিনিয়া, কলাবতী, রাজ্যের দোপাটি, জবা, লাল সাদা গোলাপ। কিন্তু হলে কী হবে বাড়ি এখন ঝুপলিজ নুক হয়ে গেছে! একেই বলে ফোকটেল, বুঝলে হে প্রকাশ! আর একেই বলে কপাল!
এইভাবেই চলছিল। চলছিল ভালোই। বছর বছর ঝুপলির জন্মদিনে পার্টি হয়। সবাই মিলে নানারকম মুখরোচক খাবার ধবংস করতে করতে আড্ডা জমে। কিন্তু একদিন প্রতিমা অত্যন্ত অসময়ে অস্বাভাবিক বেগে ছুটে গেলেন সাহানার বাড়ি। দুজনে মিলে ফিসফিস করে কী কথা হল। শেষে সাহানা বললেন, অত ভাবছেন কেন বলুন তো? ওরা জানোয়ার, নিজেদেরটা নিজেরা বুঝবে, ওর জন্যে কি এখন আপনি স্যানিটারি ন্যাপকিনের খোঁজে যাবেন, না কি?
কী লজ্জা, কী নোংরা! পাঁচজনের সামনে, ছি ছি!
পাঁচজন কোথায় পেলেন দিদি? বাড়িতে তো পুরুষ বলতে এক আপনার উনি। মুখার্জিদার সঙ্গে এতদিন ঘর করলেন সে কি লুকোচুরি খেলে?
তোমার যেমন কথা! প্রতিমা মুখার্জির ভাঁজ পড়া মুখ লাল হয়ে গেল।
তবে? নিজেই তো দেখে-শুনে বিচ নিলেন? তখন ভাবেননি যে ইয়ে হবে?
সত্যিই ভাবেননি প্রতিমা। কেন নিয়েছিলেন? কেন স্ত্রী-জানোয়ারের প্রতি এই পক্ষপাতিত্ব? কেন? কেন? জহর দাস যখন, বলল, বিচ কিন্তু। তিনি তো আর পাঁচটা দেখতে চাননি, একেই তুলে নিয়েছিলেন। রুমুঝুমু চুল, পশমের গোল্লার মতো, যেন নীলচে ছাই রঙের ফারকোট পরে আছে। কাশ্মীর থেকে কিনেছিলেন এটা! ছোট্ট ফারকোট! সাদা জুতো বকলশ দেওয়া। বড়ো হয়েও যখন বি. এ. পাস করে এম, এ পড়ছে সে তখনও অমনি ছোট্টখাট্টো, মিষ্টি, কোকড়া পিঠ-ছাপানো চুল! বুকের ভেতর থেকে ডাকটা পাথর ঠেলে বেরিয়ে পড়ছে বুড়ি, বুড়িমা! প্রতিমা প্রাণপণে চাপবার চেষ্টা করেন, মুখ চোখ সে চেষ্টায় একবার লাল তারপর ফ্যাকাশে হয়ে যায়, যেন পাথর গিলছেন। চোখে অন্ধকার। সাহানা বলেন, কী হল দিদি! শরীরটা হঠাৎ খারাপ লাগছে না কী? আর শরীরের বা দোষ কী? যা গরমটা পড়েছে। কথায় বলে ভাদুরে গুমোট। সাহানা ঠান্ডা জল আনেন; কপালে বরফ বুলিয়ে দ্যান। সামলে উঠে আস্তে আস্তে বাড়ি ফিরে আসেন প্রতিমা।
