জোর আলোচনা চলছে বাবা আর কাকার মধ্যে। অনিল সেনগুপ্ত বললেন, জহর দাসকে কনট্যাকট করা ছাড়া তো আর উপায় দেখছি না। কেনেল ক্লাবের ব্যাপার-স্যাপার আমরা কিছুই জানি না! ওদের শুনেছি অনেকরকম নিয়মকানুন আছে। গিয়ে শুধু শুধু অপমান হব কেন? তার চাইতে জহরকে কনট্যাকট করি। কিন্তু জহরের তো আবার ফোন পাচ্ছি না!
তা মানুষটাকে দু দিন সময় দে! জহর থাকে, সে কি এখানে? অনিলের গাড়ি গেছে গ্যারাজে, তারও তো সাতষট্টির কাছে বয়স হল। ওরকম হুড়মদুম করলে সে পারে? ঝুপলি দিব্যি সকালবেলা ব্রেকফাস্ট করলো, দুটোর সময়ে আটার রুটি মাংস, অসময়ের গাজর দিব্যি সব সাঁটাল। তিনটে নাগাদ খুব সম্ভব, দূরে শোনা গেল সেই আওয়াজ, ঘেউ ঘেউ, ঘৌ। ঘেউ ঘেউ ঘেউ!
অমনি ভৌ ভৌ! সাড়া দিয়েই ঝুপলি ছটফট করতে লাগল। মুখার্জিসাহেব রকম দেখে তাকে বেঁধে রাখলেন। প্রতিমা আড়চোখে চেয়ে দেখলেন একবার, তারপর বললেন, এ ভাবে শাস্তি দেওয়া কেন? কথায় বলে যার যেখানে মজে মন…।
তাই বলে একটা পারিয়া ডগ? নেড়ি কুত্তা? গর্জন করে উঠলেন মুখার্জি সাহেব। প্রতিমা কেঁপে উঠলেন।
ছোট্ট একটু দুপুর-ঘুমের অভ্যেস মুখার্জি সাহেবের। আর্ম চেয়ারে শুয়ে শুয়েই ঘুমোন। চটকাটা ভাঙলে মুখ-টুখ ধোবেন, চান করবেন, পোশাক পরিচ্ছদ পরবেন, তারপর দাঁতে চুরুট কামড়ে চেন হাতে ঝুপলিকে নিয়ে বেরোবেন। বেরোতে গিয়ে দেখলেন, চেন ছেড়া পড়ে রয়েছে, ঝুপলি নেই।
বিকেল কাটল, সন্ধে হল, রাত হল, রাত গড়িয়ে ভোর হল ঝুপলি নেই। রাতে দুজনে ঘুমোতে পারেননি, পোর্টিকোয় বসে কাটিয়ে দিয়েছেন। ভোরের দিকে
চেয়ারে বসে বসেই টুলেছেন। পরদিন যখন দুপুর কেটে বিকেল হচ্ছে, আকাশে সাজো সাজো রব পড়ে গেছে, গুড় গুড় করে মেঘ ডাকছে, ভরা বাদর শুরু হল বলে, এমন সময় দেখা গেল ঝুপলি ফিরছে! খোলা গেট দিয়ে ঢুকে এল, কুকুতে লোমে-ঢাকা চোখদুটো এদিক ওদিক ঘুরছে, সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে এবার।
মুখার্জি সাহেব গর্জন করে উঠলেন, গেট আউট, গেট আউট আই সে।
ঝুপলি ভেবলে গিয়ে তাকাল। তিনি পথ আটকিয়ে দাঁড়ালেন! যেদিক দিয়েই ঝুপলি ঢুকতে যায় তাঁর কেডস পরা পা জোড়া সেখানেই গিয়ে দেয়ালের মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। প্রতিমা পেছন থেকে আর্ত গলায় বললেন, কী করছ? কী করছ? এবার ছেড়ে দাও। অনেক শাস্তি হয়েছে, ওকে ঢুকতে দাও!
মুখার্জি সাহেব তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, নো।
গর্জমান আকাশের তলা দিয়ে মুখ নীচু করে ঝুপলি চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরেই আকাশে রোলার গড়িয়ে প্রচণ্ড জোরে বৃষ্টি নামল। জলের প্রবল ছাটে পোর্টিকো ভিজে যাচ্ছে, উঠে যেতে যেতে প্রতিমা কাঁদো কাঁদো গলা বললেন, দেখো তো কী করলে? এই বৃষ্টিতে কোথায় ভিজে জাব হবে এখন! নিউমোনিয়া না হলেই বাঁচি। মুখার্জি বললেন, কিসসু হবে না। কম চালাক নাকি? সেনগুপ্তদের বাড়ি সেঁদিয়েছে দেখবে। পুটপুটির সঙ্গে হয়তো খেলা জুড়ে দিয়েছে।
তাই বলে এই ভীষণ বৃষ্টির মধ্যে এইভাবে বার করে দেবে?
মুখার্জি-সাহেব দাঁতে চুরুট কামড়ে বললেন, ওর একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।
ওই শিক্ষাই দাও জীবনভর, আর কিছু দিয়ো না, কিছু দিতে শিখো না প্রতিমা দ্রুতবেগে স্বামীর এলাকা থেকে দূরে শোবার ঘরের আশ্রয়ে চলে যেতে থাকলেন।
বৃষ্টি থামলে, চকচকে ভিজে রাস্তায় ওপর টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে মুখার্জি সাহেব চললেন সেনগুপ্তের বাড়ি। বেল বাজছে। সাহানা খুললেন, কী ব্যাপার দাদা? আপনি এতো রাতে?
ঝুপলি আসেনি?
কই না তো? বাড়িতে নেই?
নাঃ।
মহাপাত্রদের বাড়ি গেলেন মুখার্জি, ঝুপলি? আমার টেরিয়ারটা! এসেছে?
কই না।
প্রীতমের বাড়ির বেল বাজালেন মুখার্জি। প্রীতম খুলে দিয়েছে, ক্যা হুয়া আঙ্কল কুছ গড়বড় তো নহী হুয়া!
ঝুপলি ইজ মিসিং। একটু বকাঝকা করেছিলুম!
ওহ হো প্রীতম বোকার হাসি হাসল, কীধর জায়েগী উও, পেট হাউজ ডগ, কোঠী গিয়ে দেখুন, এসে বসে আছে।
কোঠীই চলে এলেন মুখার্জি। উমি খুলে দিল।—ঝুপলি ফিরেছে রে?
না তো দাদুসাহেব! এই দুর্যোগের রাতে কোথায় গেল বলো তো?
বাইরের জুতো মোজা ছেড়ে শোবার ঘরে এসে থমকে গেলেন মুখার্জি। প্রতিমা একটা অ্যালবাম বুকে আঁকড়ে মড়ার মতো চোখ বুজিয়ে শুয়ে আছেন। ঠোঁট নড়ছে। বোধহয় জপ করছেন।
তারপর দিনও ঝুপলি এল না। পর দিনও না। পর দিনও না। কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল লস্ট কলমে এ টুয়েলভ ইঞ্চ হাই ব্লয়িশ গ্রে আইরিশ টেরিয়ার আনসারিং টু দা পেট নেম অব ঝুপলি ইজ মিসিং সিনস থার্ড সেপ্টেম্বর…এটসেটেরা এটসেটেরা। একদিন দুদিন করে পুরো একমাস হয়ে যাবার পর অবশেষে মুখার্জি সাহেব বুঝতে পারলেন ঝুপলি আর আসবে না। এবং প্রিয় মানুষে আর প্রিয় কুকুরে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোনো তফাতই নেই। ঝুপলি তাঁর সমস্ত আদেশ বেদবাক্য বলে মানতে শিখেছিল। মনোসিলেবিক সব আদেশ। সিট ডাউন তো সিট ডাউন, স্টে পুট তো স্টে পুট, গেট আউট তো গেট আউট। সে এমনটাই বুঝছে। তার বোকাটে কুতকুতে চোখ, ভোঁতা কালো নাক আর বেঁটে খাড়া লোমশ ল্যাজ নিয়ে ঝুপলি এই নিরাত্মীয় পৃথিবীর বুকে হারিয়ে গেছে।
পোর্টিকোয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষাক্লান্ত মানুষটি শেষে একেবারে ভেঙে পড়েন। ভাঙা গলায় বলতে থাকেন, আই ড্ডিনট মীন ইট বুড়ি, ওহ বুড়ি মা, আই নেভার মেন্ট ইট। ইউ জাস্ট কাম ব্যাক অ্যান্ড সি…।
