অ্যাঁ? সাহেবের নাচ থেমে যায়।
কুকুর বগলে তিনি তৎক্ষণাৎ দিদিমার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
খাবার টেবিল সামনে নিয়ে চোখে আঁচল দিয়ে দিদিমা বসে আছেন।
কী হল? আরে বাবা, কুকুর যখন তোমার আদেশ ঠিকঠাক পালন করতে পারবে?
আমার পড়েও কাজ নেই। কিছু করেও কাজ নেই! গিন্নি একই রকম থমথমে মুখে বসে থাকেন।
তবে রইল তোমার ঝুপলির মর্নিং ওয়াক, সে মোটা হিপো হোক, তার গেটে বাত ধরুক, আমার কী। ঝুপলিকে গিন্নির কাছে টেবিলের ওপর বসিয়ে দিয়ে সাহেব চলে যান। আর কুকুরটাও এমনি পাজি যে পৌ পৌ করে দুবার ডেকে মায়ের কোলের ওপর লুটোপুটি খেয়েও লাফাতে লাফাতে ছোটে মুখার্জি সাহেবের পিছু পিছু, পেছনে চেন লুটোচ্ছে।
কী বিচ্ছু দেখো দিদিমা, উমি চেঁচায়, ওই যে জানে দাদুসাহেব বেই বেই যাবে?
ওরা ওইরকমই। মায়ের থেকে আদর যত্ন সেবা সব আদায় করবে। আর হবার বেলায় হবে বাপ-সোহাগি; গভীর খেদের সঙ্গে দিদিমা উচ্চারণ করেন।
উমি বালতিতে ন্যাতা ডুবিয়ে বলে, তা যদি বলো দিদিমা, ব্যাটাছেলে হয়েও দাদুসাহেব ঝুপলির জন্যে কম করে না! দৌড়োদৌড়ি ছোটাছুটি, খেলা দেওয়া! মুখের গোড়ায় খাবারটি যেমন বোঝে, ঘুমের সময় কোলটি যেমন বোঝে, খেলাটিও তো তেমন যোলো আনার জায়গায় সতেরো আনা বোঝে কি না! একটা মানুষের বাচ্চার সঙ্গে তফাত কী?
হঠাৎ বুকটা চেপে ধরেন মুখার্জি গিন্নি প্রাণপণে। বুকের মধ্যে যেন তীক্ষ্ণ লৌহশলাকা ঢুকিয়ে দিয়েছে কেউ। না না, সত্যিই, মানুষের বাচ্চার সঙ্গে কোনো তফাতই নেই। কোনোই তফাত নেই।
আনোয়ারের আজকাল মুখে খুশি ধরে না। মুখার্জি সাহেব নিয়মিত মাংস কিনছেন। হাড়-হাড় দেখে মাংস বেছে দেয় আনোয়ার। মেটুলি, কিডনি একেক দিন! মুরগিঅলা কিষেণের দিন খারাপ যাচ্ছে। তাকে মুখার্জি সাহেব ধৈর্য ধরে বোঝান—তাঁর নিজের জন্যে আর কতটুকু লাগে। দিদিমা যে খায় না। আর ঝুপলি? কক্ষনো ওদের মুরগি দিতে নেই। সরু সরু হাড় যদি একবার পেটের ভেতরে চলে যায় তো ইনটেসটিন ফুটো হয়ে যাবে একেবারে। তখন অ ক্কা। –নলি নলি হাড় দিস, বেটি চিবোক, যত পারে চিবোক—তিনি আনোয়ারকে নির্দেশ দ্যান। বেছে বেছে গাজর কেনেন, বাঁধাকপি কেনেন, পালং শাক, কলমি শাক। ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থ যেন কম না হয়ে যায় ঝুপলির শরীরে।
ইতিমধ্যে মুখার্জি গিন্নিরও বিজয় গৌরবের কারণ ঘটে। তিনি প্রথম থেকেই ঝুপলির পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা শুচিতা সম্পর্কে খুব সজাগ। প্রত্যেকবার খাবার পর তুলো জলে ভিজিয়ে মুখ মুছে দ্যান। ঝুপলির দাঁত মাজার দরকার নেই শুনে তিনি আকাশ থেকে পড়েছিলেন। মানতেও চাননি। কিন্তু তাঁর স্বামী যখন কিছুতেই দাঁত মাজাতে দিলেন না তখন তিনি জল আর পেরোক্সাইড়ে মিশিয়ে তাতে তুলে ভিজিয়ে রোজ রাতে একবার করে ঝুপলির দাঁত পরিষ্কার করে দিতে থাকলেন। ঝুপলি হেগো পেছনে থাকবে এ-ও তিনি কিছুতেই বরদাস্ত করতেন না। তুলো ভিজিয়ে তার শৌচকার্য সম্পন্ন করতে লাগলেন। মুখার্জি সাহেব যতই ব্যঙ্গের হাসি হাসুন। আর খ্যাপান, এ কাজগুলো তিনি করবেনই। উমি পর্যন্ত তাঁকে বোঝায়, আচ্ছা দিদিমা, ধরো তুমি কোনোদিন পারলে না অদড় হলে তখন? কে ওকে চুঁচিয়ে দেবে? কে দাঁত মাজাবে? ভগবান ওদের ওমনি করেই গড়েছেন, দাঁত মাজবার, ছোঁচাবার দরকার হয় নাকো।
শুনে দাদুসাহেব বলেন, উমিচাঁদ একটা মুকখু মেয়ে যা এত সহজে বুঝে গেল, তুমি ভিক্টোরিয়া ইন্সটিটিউশনের গ্র্যাজুয়েট হয়েও তা বুঝলে না গিন্নি; তোমাকে আর উমিচাঁদকে দেখেই আমি খুব ভালো করে বুঝতে পারি—নলেজ ইজ ইনস্টিংটিভ, ইট কান্ট বি অ্যাকোয়ার্ড।
তা সে যাই হোক তার মুখার্জি-মায়ের গর্বোল্লাসের উদ্রেক করে একদিন ঝুপলি ঝুম ঝুম করে বাগানে দৌড়ে গেল। ঝুপলি কোথায় গেল? ঝুপলি কোথায় গেল? দেখা গেল ঝুপলি বাগানের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে সযত্নে তার বড়ো-বাইরে চাপা দিচ্ছে।
দেখেছ? দেখেছ। কী রকম ট্রেনিং। কাজটা যে খারাপ, জিনিসটা যে নোংরা ও ঠিক বুঝতে পেরেছে। মুখার্জি গিন্নি বলে ওঠেন।
রে রে করে ওঠেন মুখার্জি কর্তা, জিনিসটা নোংরা না হয় স্বীকার করছি প্রতিমা, যদিও জিনিসটা আমরা প্রত্যেকে দেহের ভেতরে বইছি। কিন্তু কাজটা খারাপ, মানে? কাজটা তাহলে না করাই ভালো বলছ? ঠিক আছে উমিচাঁদ, তোকে ভার দিয়ে রাখলুম, পাহারা দিবি কাল থেকে তোর দিদিমা যেন খারাপ কাজটা না করে।
উমি হি হি করে হাসতে থাকে। প্রতিমা বলেন বুড়ো যে হয়েছ, সেটা অসভ্য কথা শুনলেই বোঝা যায়। যার যত বয়স তার তত অসভ্য মুখ!
এরই মধ্যে আবার ছোট্ট একটু অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে গেল। সাহানা সেনগুপ্তদের কুকুর পুটপুটি, আর প্রতিমা মুখার্জিদের ঝুপলি বিকেলের দিকে একই সঙ্গে বেড়াতে যায়। বেড়িয়ে টেড়িয়ে হয় মুখার্জিদের বাড়ির গোল পোটিকোতে নয় সেনগুপ্তদের বাগানে দুই দম্পতি কুকুর নিয়ে বসে আড্ডা দ্যান। এ সময়টা কুকুরদের চেন, কলার সব খুলে নেওয়া হয়। কলারটা খুলে সযত্নে গলাটা ক্রিম দিয়ে ডলে তবে ঝুপলিকে ছেড়ে দ্যান মুখার্জি সাহেব। দুটো কুকুরে মিলে কৌ কৌ পৌ পৌ করে, লুটোপুটি খায়, এ ওর পেছনে দৌড়োয়। একদিন দেখা গেল ঝুপলি তিরবেগে দৌড়োচ্ছে। কী? না একটা ধেড়ে ইঁদুর। দেখাদেখি পুটপুটিও দৌড়োল। কিন্তু ঝুপলি একটা টেরিয়ার, তার ভেতরের জিন তাকে ইঁদুর ভোঁদড় শিকার করতে শিখিয়ে দ্যায়। অপর পক্ষে পুটপুটি একটা চুড়ান্ত অলস ও সুখী কুকুর-দিবারাত্র পাখার তলায় শুয়ে হ্যাঁ হ্যাঁ করে আর থাবা পেতে ঘুমোয়। সুতরাং অবিলম্বে ঝুপলি ইঁদুর ধরে। আছড়ে মেরে ফেলে। মুখার্জি সাহেব মন্তব্য করেন, দ্যাখো সাহানা, পুটপুটির মা বিদ্যেয় ঝুপলির মায়ের থেকে বড়ো হতে পারে, ঝুপলি কিন্তু পুটপুটিকে অনায়াসে হারিয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে ঝুপলি তার জীবনের প্রথম শিকারটিকে পরম পরিতোষ সহকারে খেতে শুরু করেছে। এবং প্রতিমা চেঁচিয়ে উঠেছেন, মাগো, ঝুপলি এই, ঝুপলি—তুই কি খেতে পাস না যে ওইসব নোংরা! ছি ছি ঝুপলি খায় না। না না। ঝুপলি ভেলে গিয়ে একবার মুখ তুলে মা বাবার দিকে তাকাল, কেন যে মা তাকে বাহবা দেওয়ার পরই হঠাৎ এমন কঠোর হয়ে গেছে তা সে বুঝতে পারল না, এবং না পেরে ইঁদুরটিকে চেটেপুটে খেয়ে নিল। পুটপুটি তখন অনেক দূরে বসে পিট পিট করে দেখছে।
