নীলচে ছাই-ছাই রঙের একটা ছোট্ট গোল্লামতন দেখালেন জহরবাবু। বললেন পেট ডগ, বিশেষ করে যেগুলো টয় টাইপ, সবই খুব লোমশ হয়। টিবেটান অ্যাপসো, কি টেরিয়ার, ওয়েস্ট হাইল্যান্ড টেরিয়ার, পিকিনিজ, পামিরেনিয়ান, স্পিঞ্জ। লোম নিয়ে উস্তম-খুস্তম হয়ে যাবেন। এটারও লোম আছে, ন্যাড়া টাইপের কুকুর মোটেই নয়, অথচ ম্যানেজেবল। ভীষণ মজাদার, কেজো কুকুর। এটাকে মানুষ করতে আপনার কোনো অসুবিধে হবে না। ভালোবেসে ফেলবেন। বড্ড ভালোবাসবেন। বিচ কিন্তু।
বিচই ভালো, বলে বেতের টুকরিসুদু নরম স্পঞ্জের গদিতে উলের বলটি তুলে নিলেন মুখার্জি গিন্নি। সাহানা বললেন, আমাদের পুটপুটিটার সঙ্গে মিলবে ভালো। ওটাও বিচ। খেলবে এখন দুজনে খুব। ছাপানো কুকুর-পালন-বিধি নিয়ে ফিরে এলেন মুখার্জি দম্পতি।
ফ্লাওয়ারি নুক-এর ফ্লাওয়ারগুলি আছে ঠিকই। কিন্তু নুকটি এখন ঝুপলির হয়ে গেছে। ঝুপলি, সেই নীলচে ছাই রঙের গোল্লাটা পেট উলটে বোতলের দুধ খায়। ছোটো বাচ্চাদের মতো সামনের দুই থাবা দিয়ে বোতল আঁকড়ে ধরে কখনও কখনও। মোটা তুলোর বিছানায় বেতের দোলনায় শোয়ানো হয় তাকে। পিচ পিচ করে হিসি করে বড্ড কম্মো করে, সেখানকার তুলোটুকু ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। ঝুপলির উন্নতি হয়, ঝুপলি নিজের কট থেকে ঝাঁপিয়ে নামে, লুটোপুটি খায়, খাটের পারা কামড়ে ধরে, নিউ মার্কেট থেকে তার জন্যে টিদিং রিং আনা হয়। ডগ বিস্কিট আসে। খেলবার জন্যে বল আসে, ছোটো বড়ো। খেলনা আসে। ঝুপলিকে কোলে নিয়ে মুখার্জি-মা বসেন চোখ বুজিয়ে, মুখার্জি-বাবা পা চেপে ধরেন। প্যাঁট করে ইনজেকশন ফোঁটানো হয়। পাউডার সাবান, বুরুশ, চিরুনি দুতিন রকম। অ্যান্টিসেপটিক। বোরিক তুলো, পেরোক্সাইড ভিনিগার। ক্রমশ নীলচে ছাই লোমে ছেয়ে যায় শরীর, মুখ। তার মধ্যে থেকে থ্যাবড়া কালো নাকটা বেরিয়ে থাকে। বোকার মতন কুতকুতে চোখ। বেঁটে লোমশ, খাড়া ল্যাজ নড়ে। মুখার্জি সাহেব তাকে সপাটে ওপরে ছুড়ে দ্যান, লুফে নেন, আবার ছুড়ে দ্যান। রই রই করে ছুটে আসেন গিন্নি! কী করছ? তোমার বদভ্যেস কি কখনও যাবে না? অত উঁচু থেকে পড়ে গেলে মানুষ বাঁচে?।
প্রতিমাদেবী, এটা মানুষ বাচ্চা নয়,—ঝুপলিকে লুফে নিতে নিতে মুখার্জি সাহেব বলেন!
আর মানুষ বাচ্চাদেরও এমনি করে লোফালুফি করতে হয়, নার্ভ স্ট্রং করবার জন্যে, কুকুরের তো কথাই নেই!
সব সময়ে অত কুকুর-কুকুর করবে না তো! কুকুর বলে কি মানুষ নয়! সযত্নে ঝুপলিকে কোলে তুলে প্রতিমাদেবী বেরিয়ে যান।
মুখার্জি সাহেব ভারি মজা পেয়ে হাসতে থাকেন, কুকুর বলে কি মানুষ নয়? সত্যিই তো কুকুর বলে কি এটা মানুষ নয় নাকি?
মাস তিনেকের বাচ্চা যখন, তখন থেকেই কুকুর-পালন-বিধি দেখে দেখে ঝুপলির ট্রেনিং আরম্ভ হয়ে যায়। নরম সোয়েডের কলার তৈরি হয় তার জন্যে বিশেষ অর্ডার দিয়ে। তার সঙ্গে স্টিলের চেন। আনব্রেকেবল গোল ফুলকাটা বোলে ঝুপলি পরিজ খেল, চকচক করে জল খেল, এইবার মুখার্জি সাহেব ডাকবেন —ঝুপলি কলার। ঝুপলি কলার। কলার পরতে ঝুপলির ভীষণ আপত্তি। সে দূর থেকে বোকার মতো চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।
প্রতিমা বলবেন পরে নাও ঝুপলি, লক্ষ্মী মেয়ে, কী সোনা মেয়ে গো! ও তো গয়না! বাবা গয়না কিনে দিয়েছে! ঝুপলি আরও বোকাটে চোখ করে পিছু হটে। মুখার্জি সাহেব বলেন—ওভাবে মানুষের মেয়েকে বলার মতো বললে হয় না আজ্ঞে! ও তো গয়না! বাবা গয়না কিনে দিয়েছে! হুঃ, খুব বুঝল ও, গয়নার লোভে লসলস করছে কি না কিছু শেখাতে হলে সোজাসুজি গম্ভীর, কঠিন গলায় নির্দেশ দিতে হবে, সম্ভব হলে মনোসিলেবল, যেমন সিট ডাউন–ডাইসিলেবলও চলতে পারে, কিন্তু ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করতে হবে। যেমন—ঝুপলি, কলার প রো। গম্ভীর কড়া গলায় বলে কলারটা সামনে ধরে নাচাতে লাগলেন মুখার্জি সাহেব, হঠাৎ এক পা দু-পা করে এগিয়ে এসে ঝুপলি কলারের ফাঁসের মধ্যে মাথাটা গলিয়ে দিল। ইতিউতি তাকাচ্ছে। ঠিক করেছে কিনা বুঝতে পারছে না এখনও। মাথায় কিস্যু নেই।
তখন তাকে প্রচুর আদর করতে হয়, গলায় খুশি ঢেলে দিতে হয় বুঝলে? যাতে সে বোঝে এই রকম আচরণ করলেই সে ভালোবাসা পাবে, হাততালি পাবে। এই দেখো লেখা আছে—ল্যাভিশ প্রেইজ অন হিম হোয়েন হি রেসপন্ডস টু কমান্ড, এসব ট্রেনিং-এর অঙ্গ। জহরের বইটা ভালো করে পড়ে দেখো না। তোমাকে তো তাই-ই করতে বললুম। এইবার তোমার ওই লক্ষ্মী মেয়ে, সোনা মেয়েগুলো প্রাণভরে ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে পারো।–বিজয়গর্বে স্ত্রীর দিকে চেয়ে মুখার্জি বলেন।
আমার ভারী বয়ে গেছে। গিন্নি উঠে যান।
নাগ হয়েছে নাগ? ছি! ছি! ছি! মানী মানতে শেখেনি, মানী মানতে শেখেনি বলে মুখার্জি সাহেব তাঁর বয়স-টয়স ভুলে গিয়ে আঙুলে তুড়ি দিয়ে দিয়ে নাচেন, ঘুরে ঘুরে নাচেন। গিন্নিকে খ্যাপাবার এই নতুন উপায় খুঁজে পেয়ে তিনি যারপরনাই আহ্লাদিত। তাঁর রকম দেখে ঝুপলি তার কচি গলায় ডাকে পৌ পৌ পৌ, গলার চেন ঝনঝনিয়ে সে-ও দু-একটা পাক খেয়ে নেয়। কিন্তু নাচে তার মুখার্জি কর্তার মতো প্রতিভা নেই, দেখা যায়।
উমি এসে বলে, ও দাদুসাহেব কী করছ গো? দিদিমা যে কাঁদতে নেগেছে।
