মিসেস বিকাশ একদিন বললেন, ছেলেমেয়ে সব বিদেশে, বাইরে বুঝি, বউদি?
মুখার্জিগিন্নি কিছু উত্তর দেবার আগেই সাহেব বললেন, না, নেই, আমাদের নেই অণিমা, দুর্ভাগ্য!
পরে বিকাশবাবু বাড়িতে এসে গৃহিণী অণিমাকে ভীষণ বকাঝকা করেন। শহর ছেড়ে এসেছ বলে কি সভ্যতা-ভব্যতার অভ্যেসগুলোও সেখানে রেখে এসেছ? সেই এক মেয়েলি কৌতূহল—ছেলেপিলে ক-টি? আমার দিদিমা-ঠাকুমাকেও বলতে শুনেছি, মা-মাসিদেরও বলতে শুনেছি, আর আমার ডবল এম. এ. গিন্নিকে বলতে শুনছি। ছিঃ!
অণিমা ডবল এম, এ মানুষ, মোটেই বকাবকি মেনে নেন না! ঝাঁঝাল গলায় বলেন—শহুরে সভ্যতার মুখোশ জীবনভর বয়ে বেড়াবে তো তুমিই বেড়াও। আমি মানুষ, মুখোশ নই, বুঝলে? মানুষই মানুষকে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করাকরি করে, পরস্পরকে জানতে। মেয়েলি কৌতূহলেও নয়, আর কাউকে অপদস্থ করতেও নয়।
তা সে যাই হোক, বকুনিটা অণিমা গাঙ্গুলির ওপর দিয়ে গেলেও, দরকারি খবরটা সবারই জানা হয়ে গেল। মান্নাদের, মহাপাত্রদের, সিংদের, আরও আয়েঙ্গার, সেনগুপ্ত, রায়চৌধুরি যে যেখানে ছিল সবার। অরিন্দম মুখার্জি সেন্ট্রাল গভর্মেন্টের বড়ো চাকুরে, রিটায়ার্ড হবার পরও প্রাইভেট একটা কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অনেকদিন, ধনশালী লোক, স্ত্রীটি সেকালের গ্র্যাজুয়েট হলেও অতি ভালোমানুষ। এঁদের ছেলেমেয়ে নেই। নিঃসন্তান। অনিল সেনগুপ্ত বলেন, এ নিয়ে তোমরা এতো খেদ করছ কেন আমার মাথায় আসছে না ভায়া, আমাদের অনেকেরই তো আছে। আমার তো শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে পাঁচটি। বড়ো বস্টনে, মেজ অস্ট্রেলিয়ায়, সেজ বোম্বাই, বড়ো মেয়ে ডেড অ্যান্ড গন, ছোটোটি কানেটিকাট। তা হরেদরে তো সেই একই হল, না কি? যাঁহা পাঁচ তাঁহা শূন্য কেমন কি না?
এই অনিল সেনগুপ্তর বাড়ি নিমন্ত্রণ রাখতে গিয়েই সুরাহাটা হল। অনিলের স্ত্রী সাহানার ছায়ার মতো ঘোরে একটা রোমশ বেঁটে ভুটিয়া কুকুর পুটপুটি। কালো পুঁতির মতো চোখ হালকা খয়েরি রঙের লোমের ক্লোকটি পরে সে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায় আর ছোট্ট একটি নাতিপুতির মতো সাহানার আঁচল কামড়ে থাকে। লোকজন এলে কিছু দূরে চলে যায়। এবং থাবায় মুখ রেখে পিটপিট করে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকে। একটুও হিংসে-বিদ্বেষের লক্ষণ নেই। অভ্যাগতরা যতক্ষণ থাকবেন সে এইরকম সভ্যভব্য হয়ে থাকতে থাকতে এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়বে। এবং তাঁরা চলে গেলেই গোলাপি জিভ বার করে বিশাল হাই তুলে আবার সকর্মক হবে। সাহানাই পরামর্শটা দিলেন, আচ্ছা দাদা, আপনারা তো থাকেন একটেরে, একটা কুকুর পুষুন না! কুকুর যে কী ভালো সঙ্গী! কুকুরের স্নেহমমতা, বিশ্বস্ততা, এসব যে কী দুর্লভ গুণ, যারা কুকুর না রেখেছে বুঝতে পারবে না। আপনাদের কখনও কুকুর ছিল না?
মিসেস মুখার্জি বললেন, না সাহানা। কুকুরে আমার বরাবর কেমন ভয়, ঘেন্নাও বলতে পারো। কখনও পুষিনি।
মুখার্জিদা আপনি?
আরে আমার তো ভালো লাগে। কিন্তু এ সব ব্যাপারে গিন্নির ইচ্ছায় কর্ম। বুঝলে কি না?
সাহানা বললেন, ও সব বললে শুনছি না, কুকুর আপনাদের একটা কিনিয়ে দেবই। পরে আমাকে আশীর্বাদ করবেন।
সেই হাজরা রোডে জহর দাসের বাড়িতে আসা। অনিল সেনগুপ্তর অ্যামবাসাডর চড়ে। বেল বাজাতেই ভেতর থেকে ভৌ ভৌ, ঘাউ ঘাউ, কৌ কৌসারমেয়দের অর্কেস্ট্রা। দোতলার জানলায় জানলায় কৌতূহলী সারমেয়কুল ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। একজন আবার মুখ ঝুঁকিয়ে দিয়েছে, তার নোয়ানো বিঘৎ পরিমাণ ব্রাউন রঙের কান ঝুলছে। দেখেশুনে মিসেস মুখার্জি বললেন, বাপ রে!
সাহানা বললেন, ভয় পাবেন না দিদি, ওরা তো সব ঘরে ঘরে বন্ধ। কত রকমের ব্রিড আছে, নিজে দেখে শুনে পছন্দ করে নিতে পারবেন।
জহর দাস এবং তার স্ত্রী পুতুল তখন সাদা সাদা অ্যাপ্রন পরে সদ্যোজাত কুকুর শাবকদের পরিচর্যা করছিল। সে এক এলাহি ব্যাপার। এক একটা বড়ো বড়ো লোহার ক্রিবে, মা কুকুর তার ছানাদের নিয়ে সগর্বে বসে আছে। চারদিকে এমন করে তাকাচ্ছে যেন অমন কাজটি ভূ-ভারতে আর কেউ কস্মিনকালে করেনি। ওঁদের দেখে জহর দাস শ্ৰীমতী পুতুলের হাতে সবকিছু ছেড়ে তাঁদের সঙ্গে চলে এলেন। কী রকম কুকুর চান? পেট টাইপ? না প্রহরী কুকুর? চোর ডাকাত তাড়াবে, বদলোক ঢুকতে দেবে না। কী রকম?
দু তিন মাসের অ্যালসেশিয়ান বাচ্চা দেখালেন। এর আসল নাম জার্মান শেফার্ড ডগ, বুঝলেন? সবচেয়ে পপুলার এখন। ট্রেনিং দিন। দুর্দান্ত পুলিশ ডগ হয়ে দাঁড়াবে। ভালোবাসুন, খেলা করুন, সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে বেরোন, একেবারে বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য বন্ধু।
বাচ্চাটাকে তো বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। বড়ো হলে কী রকম দাঁড়াবে বলুন তো?
একটা ঘরের দরজা খুললেন জহরবাবু, একটা উঁচু লম্বা ভারী কুকুর দৌড়োতে দৌড়োতে এগিয়ে এল। কিছু করল না, খালি মুখ নীচু করে আগন্তুকদের শুকতে লাগল।
এই রকমটা দাঁড়াবে, এটাই বাবা বাচ্চাটার। সাতষট্টি আটষট্টি পাউন্ডের মতো ওজন হবে।
ওরে বাবা মুখার্জি গিন্নি বলে উঠলেন,–অ্যালসেশিয়ান আমি কোনোদিনও দু চোখে দেখতে পারি না। নেকড়ের মতো। কেমন হিংস্র দেখতে। তার ওপর অত ওজন, আমি সামলাতে পারব না বাপু।
জহর দাস হেসে বললেন, আপনি যদি বাচ্চা-কাচ্চার মতো নিয়ে, আদর করে আনন্দ পেতে চান আবার এ-ও চান বাড়িতে ইঁদুর আরশোলা বেড়াল না থাক, যদি চান চোর ডাকাত এলে লড়াই করতে না পারুক অন্তত পক্ষে ডেকে আপনাকে জাগিয়ে দেবে তাহলে আপনার জন্যে আইডিয়াল কুকুর হবে মাসিমা আইরিশ টেরিয়ার। সঠিক নামটা হবে গ্লেন অব ইমান টেরিয়ার। খুব রেয়ার ডগ, মানে আমাদের এখানে। টেরিয়ার আমার কাছে দুটো বাচ্চা এসেছে, একটা রাজ্যপালের জন্যে তাঁর এডিকং নিয়ে গেছেন, আর একটা আছে আপনাকে দেখাচ্ছি।
