আরে কোক খাবে তো ক্যানের কোক খাও, মুখের সামনে ক্যান খুলে ধরছে।
আসল জিনিস। খেলেই তফাতটা ধরতে পারবে। কত জিনিস আনত, দু হাতে উপহার দিত, এনতার খরচ করত। পাতা ওলটালেন মুখার্জিগিন্নি, একটি রুমুঝুমু চুলঅলা শিশু বেবি-ফ্রক পরা, নিদন্ত মুখে হাসছে। এ ছবি অনিরুদ্ধ ঠাকুরপোর তোলা। তলায় লেখা বুড়িমায়ি, পঁচিশে নভেম্বর, উনিশশো তেষট্টি।
খসখস শব্দ, চটি ঘষতে ঘষতে মুখার্জিসাহেব ঘরে ঢুকছেন। চকিতে গৃহিণী অ্যালবামটা বন্ধ করে দ্যান। ঘরে ঢুকে আড় চোখে অ্যালবামটা দেখেন সাহেব। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, ও সব তো পাস্ট, ইতিহাস নিয়ে কি আর বাঁচা যায় গিন্নি, বাঁচতে হয় বর্তমানে। প্রেজেন্ট কন্টিনুয়াস। এই মুহূর্তে কী হচ্ছে, আমি কী করছি, কেন করছি—এই।
বাঁচার দরকারটা কী? মৃদু, থমথমে স্বরে কথাগুলো বলে মুখার্জিগিন্নি ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। হালকা কী একটা গন্ধ-অলা ট্যালকম পাউডার মাখেন, সেই গন্ধটা অতীতের সুখস্মৃতির মতো ঘরের হাওয়ায় ভেসে থাকে। নিশ্বাস ফেলে মুখার্জিসাহেব অ্যালবামটা তুলে নেন। অন্যমনস্কভাবে যে-কোনো একটা পাতা খুলে ফেলেন। অমনি বেরিয়ে পড়ে কালো গাউন পরা মাথায় ঝালর অলা টুপি, হাতে গ্রাজুয়েশনের সার্টিফিকেটটা পাকানো, এক তরুণী। হাসছে। তলায় লেখা বুড়িমা ১৯৮৩। দেখতেই থাকেন, দেখতেই থাকেন। অবশেষে কাপড়ের খসখস শব্দ পান পিঠে ঝনাত করে চাবি ফেলার শব্দ। গিন্নি আসছেন। চট করে অ্যালবামটা বন্ধ করে বিছানার ওপর যেখানে ছিল, সেখানে রেখে দিয়ে নিজের কামানো গাল পরীক্ষা করতে থাকেন মুখার্জি সাহেব। যেন ভীষণ চিন্তিত, কাল সকালে দাড়িটা কামাবেন, না কামাবেন না।
গৃহিণী ঢুকে কোনোদিকে না তাকিয়ে ঝনাত করে আলমারি খোলেন, কড়াক করে লকারের চাবি ঘোরান, অ্যালবামটা রেখে দ্যান। চাবি বন্ধ করেন পর পর, তারপর বলেন, এত তো গান শোনো, গান শুনলে তো জানি মানুষের মনমর্জি নরমসরম হয়। তা যদি না-ই হয় তো শোনা কেন? তিনি যত দ্রুত সম্ভব ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। মুখার্জিসাহেব জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এতক্ষণ, যে মনে হয় তাঁকে কেউ স্টাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে গেছে।
সকালবেলায় বেরিয়ে একদফা আলাপ হয় স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে। তার মধ্যে সবজিঅলা তাজু, মুরগিঅলা কিষেন, মাংসকাটা আনোয়ার, ডিমঅলা ভুবন এরা আছেই।
ও সাহেব, পরশু দিনকেই তো মুরগি নিলেন। আজ আমার কাছ থেকে একটু খাসির মাংস নিয়ে যান না। অনুযোগে অনুরোধে মিশিয়ে আনোয়ার বলে।
আরে বাবা, রেড মিট আমাদের চলে না। মুরগি, তা-ও তোর দিদিমা খায় না। তবে নেব, নেব। বাড়িতে লোকজন এলে দেখবি নিয়ে যাব।
কবে তোমার বাড়ি লোক আসবে?—কাঁচা গলায় ডিমঅলা ভুবন বলে। বারো তেরো বছরের ছেলেটা। ভুবনের কাছ থেকে ডজনখানেক ডিম কিনে সবজিবাজারের দিকে এবার এগোন মুখার্জিসাহেব। উদাস গলায় বলেন, আসবে, আসবে…।
ছোটো বাজার। যা এল তা এল। তার বাইরে আর কিছু নেই। তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। —বেগুনগুলো কেমন চিকন দেখুন সাহেব তাজু তার আজকের পসরা নিয়ে বড়াই করে। মামুলি আলু পেঁয়াজ ছাড়া আজ তার কাছে ওই বেগুন।
চিকন তো বলছিল খুব! কানা নয় তো! ভাবিসনি আমি দেখতে পাবো না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেন মুখার্জিসাহেব। শাকে ভিটামিন, মিনার্যালস আছে। টাটকা শাক তিনি রোজ কিনবেন। বাঃ, আজ বড়ো বড়ো পালং পাতা রয়েছে। চট করে থলি খুলে ধরেন তিনি। মাছ? মাছ বসেনি? ছোটো ছোটো পোনা, চারাও নয়, বড়োও নয়। মাছঅলা ডোম্বল বলে, একেবারে লাফাচ্ছে দাদুসাহেব, ঝালে খাবেন, ঝোলে খাবেন, ভাজা খাবেন, মুখ ছেড়ে যাবে, তাকত বাড়বে।
ছোটো বাজারের ব্যাপারী। বড়ো বড়ো শহরে বাজারের বিক্রেতাদের ঘমন্ড এদের নেই। যত না বিক্রিবাটা হয়, তার চেয়ে বেশি হয় গল্পসল্প, একটু ডাকাডাকি করে মানুষকে বুঝি আপন করে নেওয়া।
বাজারে আসেন আরও দু-পাঁচজন ভদ্রলোক। বিকাশ গাঙ্গুলি, অজয় মান্না, প্রীতম সিংহ, বীরেশ্বর মহাপাত্র। প্রায় সকলেই মুখার্জিসাহেবের থেকে ছোটো। জিনিসপত্রের দর নিয়ে, শহরের ক্রমবর্ধমান দূষণ নিয়ে, সংস্কৃতির হাল নিয়ে আলোচনা হয়। তাঁর থেকে ছোটো হলেও দেখা যায় এঁরা তাঁর সঙ্গে একমত হয়ে যাচ্ছেন। শহর থেকে দূরে হওয়া সত্ত্বেও এই জায়গায় বাস করতে এসেছেন দূষণমুক্ত হাওয়া, শব্দহীন দিনরাতের খোঁজে। বিকাশবাবু বলেন, আমি তো প্রায় বার্ডওয়াচার হয়ে গেলাম মুখার্জিদা। এত রকমের যে পাখি আছে, তারা যে শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না, বাস্তবেও নড়েচড়ে উঠে ডেকে বেড়ায়—তা আমার জানা ছিল না। অনেকেরই গাড়ি আছে। প্রীতম তো গাড়ি নিয়েই অফিস করে। ট্রাভল এজেন্সি আছে তার। শহরে চলে যায় হুশ করে। একটা পার্ট-টাইম ড্রাইভার পেলে মুখার্জিসাহেবও গাড়ি রাখতে পারেন। নইলে আজ কাল আর গাড়ি চালাতে ঠিক ভরসা পান না। তা প্রীতম বলে, গাড়ি রাখবেন কেন আঙ্কল, হররোজ তো দরকার হচ্ছে না। কোথাও যেতে হলে প্রীতম আছে। প্রীতমকে ডেকে নেবেন।
তা এসব আলাপ মুখার্জিসাহেবের একার। আসল আলাপসালাপ হয় বিকেলবেলা। সস্ত্রীক বেড়াতে যাবার সময়ে। তখন মিসেস বিকাশ, মিসেস ও মিস মহাপাত্র, মিসেস মান্না, তাঁর দুরন্ত নাতি—এঁরাও বেরিয়ে পড়েন।
