মুখার্জিগিন্নি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বুড়ো বয়স এমনিতেই নির্জন। হাজার মানুষ আশপাশে ঘুরলেও মনে হয় কেউ নেই। যাদের সঙ্গে এক স্মৃতি ভাগ করে বাঁচা, তারা সব চলে গেছে। যারা আছে তারা অন্য প্রজাতির জীব যেন। নির্জনতা আর কাকে বলে? এই নিঃসঙ্গতা যেন পাষাণভার, বুকের ওপর ক্রমশই ভারী হয়ে চেপে বসছে। আর উনি এলেন এখন নির্জতার ওপর লেকচার দিতে। দূর দূর!
তা ভোরবেলা সত্যি সত্যিই প্রাতভ্রমণের নাম করে বাজার আর বাজারের নাম করে প্রাতভ্রমণ সারেন মুখার্জি সাহেব। পরনে খাকি শর্টস, হাফহাতা মোটা সুতির ভেস্ট, পায়ে কেডস আর হাতে লাঠি। ঘুরতে ঘুরতে একসময়ে চুরুটটা ধরিয়ে নেন। ফিরে একপট চা নিয়ে দুজনে বসবেন, পাটশাক পেয়েছি আজ, কিংবা একেবারে ফ্রেশ পটোল বুঝলে? খয়রা মাছগুলো ঠিক খাবার আগে কড়কড়ে করে ভাজবে। এসব জিনিস তুমি শহরে পাবে না। সেখানে পুঁতেয় ভেজানো পটোল, শাকে ইনসেকটিসাইডের গন্ধ, বুঝলে?
নিঃশব্দে চা ঢালতে ঢালতে স্বামীর যাবতীয় কথা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আর এক কান দিয়ে বার করে দ্যান মুখার্জিগিন্নি। তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে, এখন পাটপাতা আর ফ্রেশ পটোল নিয়ে আদিখ্যেতা ভালো লাগে না তাঁর। টাটকা খয়রা মাছ! হুঁ! মাছের জন্যে তো তিনি মরে যাচ্ছিলেন কি না!
চা খেয়ে বাগানে নেমে পড়েন সাহেব। খুরপি দিয়ে খোঁচাখুঁচি। এটা তুলে ফেলা, ওটা বসানো। ঝারি কিনেছেন একটা। গাছে জল দিতে দিতে মুখ থেকে হাসির ছটা বেরোতে থাকে একেবারে। গিন্নি এই সময়ে খুটুরখুটুর করে গৃহকর্ম আরম্ভ করেন। অল্পস্বল্প ফার্নিচার। সব নরম কাপড় দিয়ে ঝকঝকে করে মোছেন। কাচগুলো খবরের কাগজের টুকরো জলে ভিজিয়ে পরিষ্কার করেন। উমি আসে, সে বাসন ধুয়ে, ঘরদোর পরিষ্কার করতে থাকে, বলে, নতুন করে মোছামুছি আর কী করব দিদিমা, সব তো পরিষ্কারই আছে গো। থাকত একটা কচিকাঁচা তো হন্ডুল-মভুল করে দিত তোমার সব। তখন উমির কাজ বাড়ত। ন্যাতা টানে আর আপনমনে বকবক করে যায় উমি, সতৃষ্ণ শ্রবণে শুনতে থাকেন মুখার্জিগিন্নি। উমি কাজ সেরে চলে গেলেই একটু দূরে গুড়ি-মেরে বসে-থাকা নির্জনতাটা আবার হুড়ুম করে এসে পড়বে, গ্রাস করে নেবে এই ছোট্ট ফ্লাওয়ারি নুক।
উমি বলে, এবার চানটা সেরে নাও গো দিদিমা, আমি কাপড়চোপড়গুলো কেচে, মেলে দিয়ে যাই।
নিতান্ত অনিচ্ছুকভাবে মুখার্জিগিন্নি চানঘরে ঢুকে যান। তাঁর রান্না সারতে আর কতটুকু সময় যাবে? দুই বুড়োবুড়ির রান্না। এটা বারণ, সেটা চলে না। পরিমাণও খুব কম। তবে মুখার্জি সাহেব শৌখিন খুব। নানান রকম খেতে ভালোবাসেন। তাই টুকটাক করে হালকা হালকা খাবার বানান গৃহিণী। পনির অ্যাসপারাগাস, মটর ডালের বড়ি দিয়ে পাটপাতা, মৌরলা মাছের টুক, বেগুন-বাসন্তী। এইটুকু একমুঠো বানান। তাইতেই ঢের হয়ে যায়, ঢের। বিকেলে বাসন ধুতে এসে উমি বলে, তোমাদের যেন পুতুলের ঘরকন্না, এইটুকুনি-টুকুনি বাটিতে কী খাও গো দিদিমা?
কেন ডাল?
ঘন ক্ষীরের মতন করো বুঝি?
দূর, পাতলা সুপের মতো ডাল চুমুক দিয়ে না খেলে খাওয়াই হয় না তোর দাদুসাহেবের।
উমি, মুখার্জি সাহেব উঁচু দরের দামি মানুষ বুঝে শুধু দাদু বলে না, বলে দাদুসাহেব। আর মুখার্জি সাহেব উমিকে বলেন শেঠ উমিচাঁদ। দিদিমার সঙ্গে কথাবার্তা জমলেই তিনি বলবেন, এই যে শেঠ উমিচাঁদ, ষড়যন্ত্র কদূর এগোল?
বিকেলবেলা রোজই দুজনে হাঁটতে বেরোন। শীতকালে চারটে নাগাদ।
গরমকালে আর একটু পরে। তখন সাহেবের পরনে তাঁতের সূক্ষ্ম ধুতি, ফিনফিনে পাঞ্জাবি, কাঁধে চাদর, হাতে রুপো বাঁধানো লাঠি। এটা গরমকালে। শীতে ঢোল্লা গরম কাপড়ের ট্রাউজার্স। গিন্নির বুনে-দেওয়া কার্ডিগান, মাফলার, মাথায় কানঢাকা টুপি। মুখার্জিগিন্নি কী শীত কী গ্রীষ্ম ধবধবে সাদা বাহারি পাড়ের টাঙ্গাইল শাড়ি। সাদা ব্লাউস। শীতকালে উলের জামা, হাতা-অলা সোয়েটার আর তার ওপর গরম শাল।
বেরোবার সময়েই চা-টা খেয়ে নেন দুজনে। ফিরে খেলে বড়ো দেরি হয়ে যায়, রাতে ঘুম হয় না। ফিরে দুজনের কারোই কোনো কাজ নেই। গোল বারান্দায় বসে গান শোনেন মুখার্জিসাহেব। পুরোনো দিনের গান—কানা কেষ্ট, ভীষ্মদেব, শচীন দেববর্মন এইসব। কিংবা বাজনা শোনেন, মেনুহিনের ভায়োলিন। বিদেশি সব বাখ মোৎসার্ট মেন্ডেলসন-ফন গুচ্ছের কী যেন আছে! একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যান ঘ্যানঘ্যান করে বেজে যায়। সাহেবের মন রাখতে বেশ খানিকক্ষণ বসে থাকেন গৃহিণী, তারপর টুক করে উঠে পড়ে গুটিগুটি ঘরের ভেতরে চলে যান। একটু আয়নার সামনে দাঁড়ান। একটু এ ছবি দেখেন, একটু ও ছবি, পিকাসো না কি ছাইভস্ম। অসভ্য ছবি সব। কাঞ্চনজঙ্ঘার লম্বা পোস্টার একখানা—বরফে বরফ। তিনি ফিরে দাঁড়িয়ে বিছানার টান-চাদর আবারও টানটান করেন। তারপর আঁচল থেকে চাবি নামিয়ে আলমারি খোলেন, লকার খোলেন। লকারের ভেতর সোনাদানা নেই। হীরে-মুক্তো কিছু নেই। রয়েছে কয়েকটা ফটো। অ্যালবাম। বাস। যে-কোনো একটা নামিয়ে নেন। তারপর খাটের পাশের হেলানো চেয়ারে বসে অ্যালবামের পাতা খোলেন বেরিয়ে পড়েন রায়বাহাদুর মাখনলাল চ্যাটার্জি। তাঁর বাবা। ইয়া গোঁফ, সুট কোট হ্যাট, একেবারে পুরোদস্তুর সাহেব। রংটি ছাড়া। তা রং তো আর ফোটোগ্রাফে বোঝা যায় না। তাঁদের বিয়ের ছবি। বিয়ের পরেই ভোলা। ইলাস্ট্রেটেড উইকলিতে দেওয়া হয়েছিল। মুখার্জিসাহেবের চেহারাটা তখন কত ভালো ছিল! স্বাস্থ্যবান, উজ্জ্বল যুবক। পাশে তিনি, খুব রোগা। গলার হাড় দেখা যাচ্ছে। চুড়িবালা হাতে ঢলঢল করছে। মাথায় ঘোমটা নেই। ঘোমটা খুলে দিয়েছিল ফোটোগ্রাফার, আজকাল আর ফোটোতে চলছে না। দেখে শাশুড়ির কী রাগ। যতই সাহেব-মেমসাহেব হও, নতুন বিয়ের কনে মাথায় ঘোমটা থাকবে না? এ ছবি দেখলে এ–বাড়ির গুরুজনরা সব বলবে কী? আবার আলাদা করে ঘোমটা দেওয়া ফোটো ভোলা হল। সেই ফোটোই বাঁধানো তাঁদের টেবিলের ফোটোস্ট্যান্ডে থাকত।-হাজারিবাগে বাড়িসুষ্ঠু সব যাওয়া হয়েছিল, রোজ পিকনিক! রোজ পিকনিক! সেখানে পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গে আলাপ! কত গান, কত গল্প! সেই সব ফটো। অনিরুদ্ধ ঠাকুরপোর ছবি। জ্বলজ্বলে চেহারা, হাসিটা কী! একেবারে জ্যান্ত। চোখের সামনে যেন ভাসছে! চীনের যুদ্ধে মারা গেল। অনেকক্ষণ ধরে ছবিটা খুলে বসে থাকেন মুখার্জি গিন্নি।
