এতক্ষণ ধৈর্য ধরে শুনছিলাম, এবার ঠান্ডা গলায় বলি, আপনার বন্ধু ও.সি বাবুও এই সন্দেহটির কথা বলছিলেন। যটুকু জানি বলছি সামন্তবাবু, সরি, মি. সামন্ত।
আরে না না, সামন্তবাবু ইজ অল রাইট। মিস্টার-টিস্টার নয়। বলুন, বলুন, কী বলবেন!
যদি বলি হ্যাঁ। বাস-স্ট্যান্ডের পাশে দোতলা বাড়িটার আড়তদার বরটার রসবতী বউটার সঙ্গে দীপ্তর আশনাই ছিল…বিশ্বাস করবেন?
কোন বাড়ি? কোন আড়তদার? কোন বউ? যদি কাইন্ডলি একটু ডিটেল বলেন।
কোন বাড়ি, কোন আড়তদার, কোন বউ জানি না। ওরকম হরদম আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আপনি যেমন সম্ভাবনার কথা বলছিলেন আমিও তাই বলছিলুম। কিন্তু আপনিই বলুন, এই আমার দিকে তাকিয়ে বলুন—গালে ব্রণর গর্ত, চোখে মাছ, বুকে পায়রা, গলায় বেড়াল আর পকেটে বিরাজ করছেন সাক্ষাৎ মা ভবানী। আপনার গোয়েন্দা মনটা কী বলে? এরকম ফেকলু পার্টি দিয়ে এক্সট্রা-দাম্পত্য হয়?
খুব লজ্জা পেয়ে সামন্ত বিড়বিড় করে বলতে লাগল, বড্ড বিনয়ী আপনি জয়বাবু। বড্ড বিনয়ী! ওসব ফেক টেকলু…নাঃ-দ্যাট ইজ টু মাচ। আফটার অল ইয়াং ম্যান! কারা এক্সট্রা-দাম্পত্য করে তাদের দেখেছেন? কেউই ময়ুরছাড়া কার্তিকটি নয়। কেউই একেবারে তাগড়াই ভীম পালোয়ান বীরসিংগিও নয়।
বেশ তো, তাহলে এই থিয়োরিটাই বসের কাছে পেশ করুন। উনি পিঠ চাপড়ে দেবেন।
আপনি জানেন না জয়বাবু, এভাবে কেস হাজির করলে… আমার চাকরিটা চলে যাবে। যতক্ষণ না আড়তদার বা রসবতী…কোনো সাবুত হাজির করতে না পারি…আমার নিস্তার নেই।
তাহলে আপনি খুঁজতে থাকুন। আমি উঠি।
আর একটু টাইম যদি দয়া করে দেন জয়বাবু, নইলে আবার একদিন বসতে হবে। কোথায় বাড়ি গিয়ে মাথায় দু-ঘটি জল ঢালবেন, তা না একটা টিকটিকির টিকটিকুনি শোনা।—খুব চিকচিকে চোখে চেয়ে মন্তব্যটি করে সামন্ত, ওর ধারণা একটা দারুণ মজার কথা বলেছে।
আমার যে সত্যিই বাড়ি গিয়ে মাথায় জল ঢালতে ইচ্ছে করছে সেটা ব্যাটা বুঝতে পেরেছে ঠিক।
বলল, ধরুন এ-ও তো হতে পারে জয়বাবু, দীপ্তবাবুর যে বোনটি আছে কোনো মস্তান তার পেছনে লেগেছে, দীপ্তবাবু তাকে ঠান্ডা করে দেবেন বলে শাসিয়েছেন…
আমি এবার হেসে ফেলি, শুনুন সামন্তবাবু এই মস্তান-টস্তানরা একটু রক্তমাংস চায় বুঝলেন? দীপ্তর বোন শিপ্রাকে একবার দেখে আসুন। তারপর এ বিষয়ে কথা হবে। দ্বিতীয় অধিবেশন।
প্লিজ প্লিজ দীপ্তবাবু, স্যরি জয়বাবু আর একটু। তাহলে কি আপনি বলছেন সেদিন দীপ্তবাবুর পকেটে বাই চানস অনেকগুলো টাকা ছিল? ট্রেন ডাকাতি?
শুনুন দাদা, পকেটে একটা মান্থলি আর দু-পাঁচ টাকা ছাড়া আমাদের পকেটে আর কিছু থাকত না। হাতঘড়িটা ডিজিটাল, ফুটপাত থেকে উনপঞ্চাশ টাকার কেনা।
সে ক্ষেত্রে এ-ও তো হতে পারে, দীপ্তবাবু ডিপ্রেশনে ভুগতে ভুগতে নিজেকে অযুগ্যি ভাবতে ভাবতে, একঘেয়েমির শিকার হতে হতে আত্মবিনাশ…মানে জিঘাংসা একটা—নিজেরই ওপর…?
এইবারে আমি বসে পড়ি। এতক্ষণ পাতি বকবকামির পর এটা তো লোকটা খারাপ বলেনি। সত্যিই তো! নিজেকে ঘেন্না করতে করতে, অযুগ্যি ভাবতে ভাবতে, আরও তিরিশ চল্লিশ কি পঞ্চাশ বছর এইভাবে বেঁচে থাকতে হলে…এ কথা মনে করে…এ তো আমারও কথা। আমারও। সামন্তর মতো একটা পাতি টিকটিকির মাথায় এটা আসতে পারে ভাবিনি তো!
কী হল?–সামন্ত ঝুঁকে বসেছে, চুপ করে রইলেন যে?
এটা ভাবা যেতে পারে—আমি অন্যমনস্কভাবে বলি
এটাই ভাবতাম জয়বাবু… যদি না দীপ্তবাবুর ভিসেরায় একটু স্ট্রং বার্বিচ্যুরেটের সন্ধান পাওয়া যেত। নিজেকে ঘুম পাড়িয়ে কি ব্লেড দিয়ে নিজের গলার নলি কাটা যায়? সেইজন্যে সব দিক ভেবে-চিন্তে আমরা এক দ্বিতীয় ব্যক্তির খোঁজ করছি, সে ঠিক দীপ্তবাবুর মতো, যার পরিস্থিতি ঠিক দীপ্তবাবুর মতো, দীপ্তবাবুর মতোই যার আত্মবিনাশ করতে প্রবল ইচ্ছে হয়, কিন্তু যে…আসলে আপনি নিজেকে মারতে চেয়েই দীপ্তবাবুকে মেরেছেন, তাই না জয়বাবু?
এগজ্যাক্টলি—আমি ক্লান্ত গলায় বলি এবং হা-ক্লান্ত চোখে কানাইলাল সামন্তর মুখের দিকে তাকাই। তাকিয়ে থাকি।
মাহ ভাদর
শহরের অবিরাম ঘূর্ণমান কর্মচক্রের কেন্দ্রবিন্দু থেকে অনেক দূরে নতুন বাড়ি বানিয়েছেন মুখার্জি-দম্পতি। দূরে দূরে ছোট্ট ছোট্ট বাগানের মধ্যে পুতুলের বাড়ির মতো বসানো বাসগৃহ। সুন্দর, সুন্দর ছাঁদ। লাল টালি, কাচ-ঢাকা বারান্দা, হাঁসের পালকের মতো মসৃণ গা। বেশ লাগে দেখতে। কিন্তু নির্জন। বড্ড নির্জন। রাত আটটার পরই নিশুতি হয়ে যায় একেবারে। বাজার-হাটও একটু দূরে। কিন্তু ভোর সকালে বহুবিধ গাছপালায় সবুজ ছায়াপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাও। প্রাতভ্রমণও হবে, আবার বাজারও হবে। মন্দ কী। মুখার্জিসাহেব পরিতুষ্ট মুখে চারদিকে চেয়ে গিন্নিকে বলছেন, কী গো? অসুবিধে হবে খুব?।
হলেই বা করছি কী? গৃহিণী ঈষৎ অভিমানের সুরে বললেন।
কেন? তিন লিটারের ফ্রিজ কিনে দিয়েছি। সব স্টোর করো। ওষুধপাতি, পোস্টেজ—এসবও স্টকে থাকবে। টেকনলজির যুগ। ওয়াশিং মেশিন থেকে, ভ্যাকুয়াম-ক্লিনার থেকে কোনটা নেই? বই পড়ো, বাগান করো আর গান শোনো। টেলিভিশনে সারা গ্লোবের খবরাখবর নাও। যেটা যখন ভালো লাগে। আর সবচেয়ে বড়ো কথা নির্জনতা, খানদানি নির্জনতা একেবারে। উপভোগ করো। এনজয় করো সেটা।
