একটা পা ট্রামের পা-দানিতে। এইভাবেই হাওড়া ট্রামগুমটি থেকে মহাত্মা গাঁধি রোড হয়ে কলেজ স্ট্রিট পৌঁছেই। মহান ইউনিভার্সিটি পাড়া, শতবার্ষিকী বিল্ডিং, মহান প্রেসিডেন্সি কলেজ, মহান হিন্দু স্কুল-হেয়ার স্কুল, সংস্কৃত কলেজ, আর মহান মহান সব দোকান, ফুটপাতে, বারান্দার রেলিং-এ, স্টল-এ। দোকানে শিক্ষার্থী, বিদ্বান। ইনটেলেকচুয়েলদের পাড়া। মাড়িয়ে চলে যাই। পাঠমন্দির, এঁরা আবার অধ্যাত্মচর্চা করে থাকেন। সমর্পণ করো, প্রশ্নহীন বিশ্বাস, ফেথ…কিছু আশা করো না, শুধু ডেকে যাও, কিছু চেয়ো না প্রে, প্রে, প্রে। কফি হাউজের সিঁড়ি দিয়ে উঠতি ইনটেলেকচুয়েলদের সঙ্গে প্রায় ধাক্কাধাক্কি করে উঠতে হয়। ইনটেলেকচুয়েলও শালা একসেস হয়ে যাচ্ছে। ভাবিসনি সবাই ইনটেলেকচুয়েল হবি, যদ্দিন আসতে পারছিস এসে নে, হেসে নে, যেন পৃথিবীটা কিনে নিয়েছিস এমনি করে গলাবাজি কর। তারপর উট। আড়াই পোঁচ কাটা, বাকি গলা দিয়ে কালো রক্ত পড়ছে, পড়ছে, পড়ছে।
এই যে ভাই এদিকে।–খুব নিচু গলা কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পেলুম। কানাইলাল সামন্ত। লোকটাকে এমন সাধারণেরও সাধারণ দেখতে যে কালই দেখেছি, আজই ভুলে মেরে দিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে মনে হচ্ছিল— লোকটাকে খুঁজে বার করব কী করে? চিনিই তো না। তা সে সমস্যাটা রইল না। কানাইলালই আমাকে খুঁজে নিয়েছে।
গুছিয়ে বসি।
একটু লেট হয়ে গেল,–রুমালে ঘাম মুছতে মুছতে কৈফিয়ত দিই-বড্ড ভিড়।
আমি বুঝতে পেরেছি জয়বাবু, টাইমিংটা…আমি দুঃখিত। এত ট্রাবল। খিদে পেয়েছে তো খুব?
ও তেমন কিছু না…।
আমি অলরেডি চিকেন স্যান্ডউইচ, চিজ-ওমলেট, আর পেঁয়াজ-পকোড়া অর্ডার দিয়েছি। আর কিছু?
আমি হেসে বলি, ইনাফ। আমাদের ইঞ্জিনিয়ার সাব এটা বলেন—ইনাফ।
খাবার আসে। লোকটি দুটো আলাদা প্লেটে খাবার সাজায়। আমার দিকে একটা এগিয়ে দেয়—এই যে ভাই-বেয়ারাকে ডাকে—পকোড়াটা কফির সঙ্গে দিও।
ঠিক আছে স্যার।
নিন শুরু করুন। নিজে একটা কাঁটা দিয়ে ওমলেট কেটে মুখে পোরে কানাই সামন্ত। আমি একটা স্যান্ডউইচ তুলে নিই, একটু জল খেয়ে নিই। ভীষণ তেষ্টা। তেষ্টাটাই এতক্ষণ জ্বালাচ্ছিল প্রচণ্ড।
বেশ কিছুক্ষণ দু-জনেই নিজের নিজের খিদে মেটাতে থাকি। কানাইলাল একবার বোকা লাজুক চোখে আমার দিকে চেয়ে বলে, কিছু মনে করবেন না জয়বাবু, বড্ড খিদে পেয়েছিল।
ঠিকাছে। ঠিকাছে—আমি ওঁকে নিশ্চিন্ত করি।
আমি আসলে অন্ধকারে হাতড়াচ্ছি। গ্রোপিং ইন দা ডার্ক, বুঝলেন? নিহত মানুষটির চারপাশটা কেমন ছিল, কাদের সঙ্গে মিশত সেইসব…
আমি চেয়ে থাকি।
দেখুন সম্ভাবনা নাম্বার ওয়ান, আপিসে কারও সঙ্গে গণ্ডগোল। ছোটোখাটো হলেও বলবেন কিন্তু স্যার। তুচ্ছ বলে গোপন করে যাবেন না, কোনো ছোটোখাটো কাজিয়া? তুচ্ছ কারণে লোকে আজকাল খুনোখুনি করছে।
দেখুন, আমি ওমলেট ছিঁড়ে মুখে দিই, সেই যে বলে না তৃণাদপি তৃণ! আমরা সেই রকমই। তুচ্ছ একেবারে। একটা চাকরি পেয়েছি, সেটাই আমাদের যথেষ্ট। না পেলে, না পেতেই পারতাম, জানি না কী করতাম, হাত পেতে ভিক্ষে নিতেও পারতাম না, আবার গুন্ডা-হুলিগান হয়ে বোমাবাজি…তা-ও আমাদের দ্বারায় হত না।
আপনি আমরা-আমরা করছেন কেন? দীপ্তবাবুর তো আলাদা সার্কল, আলাদা মন থেকে থাকতে পারে। ধরুন কোনো ড্রাগ-পাচারকারীর শাগরেদ হয়ে গেছেন পাকেচক্রে।
এটা কিন্তু আমি একটু ভাবি, তারপর বলি, আপনি বললেন, তাই ভাবলাম, ভেবে দেখলাম খুব হচ্ছে।
নাহ। ছোটোবেলা থেকে বন্ধু, ইস্কুলে, কলেজে, দুজনেই পি ডিভিশন। দুজনের এক চাকরি, ঝগড়া-কাজিয়া এড়িয়ে চলতাম, বোথ অভ আস। এ নিয়ে আমাদের অনেক কথাও হয়েছে। ও আমার সঙ্গে একমত ছিল। উই ক্যানট অ্যাফোর্ড টু প্রোটেস্ট, টু কোয়ার্ল। উই ক্যানট অ্যাফোর্ড টু পাচার ড্রাগ।
ইউনিয়নের দিক থেকে কোনো প্রেশার?
আমার এবার হাসি পেয়ে যায়। তেতো হাসি।
আরে দাদা, ইউনিয়নের সঙ্গে আমাদের কী? ইউনিয়ন প্রেশার দেবে আমাদের মতো চুনোপুটিকে? আমরা প্রেশারের মধ্যেই বাস করতাম। বুঝলেন? জলে মাছ যেমন জলের প্রেশারে বাস করে!
আপনি জয়বাবু ভারি চমৎকার কথা বলেন। এত সুন্দর কথা বলতে আমি অনেকদিন কাউকে শুনিনি। অথচ…অথচ…
অথচ কী? আমার কিছু হল না?—আমি হো হো করে হাসি। দেখুন কানাইদা, আপনার কতটুকু অভিজ্ঞতা আমি জানি না, ধৃষ্টতা মার্জনা করবেন—কিন্তু একটু লাগসই কথা বলার ক্ষমতা, লাগসই কাজ করার ক্ষমতা হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোকের আছে। তো কী?।
খুব অপ্রস্তুত হয়ে যায় ভদ্রলোকের মুখ।
ঠিক। ঠিকই বলেছেন জয়বাবু। একটা লাক-ফ্যাক্টর থেকে যায় না। না থাকলে…ক্যাঁচাল ভালো লাগে না সন্ধের ঝোঁকে। পাখাটা ওপরে বাঁই বাঁই করে ঘুরছে কিন্তু গরমে গ্যাদগেদে হয়ে যাচ্ছি।
বললাম, কী যেন বলছিলেন সম্ভাবনা নাম্বার ওয়ান…
হ্যাঁ হ্যাঁ, সরি। সম্ভাবনা নাম্বার টু—লাভ—মানে লভ-অ্যাফেয়ার। ধরুন কারও সঙ্গে লভ হয়েছে, কিন্তু তার একটি আগের লাভার আছে, ধরুন স্বামীই। এই এক্সট্রা ম্যারিটাল বা দাম্পত্য-বহিভূর্ত প্রেম বলুন, প্রেম, সম্পর্ক বলুন, সম্পর্ক…এটা এখন রাজনৈতিক খুনের পরেই প্রায়রিটি পাচ্ছে মোটিভে…বুঝলেন? স্ট্যাটিসটিক্স বলছে।
