নাহ, একটু জল দিও বরং, ভেতরটা তেষ্টায় কাঠ হয়ে আছে।
মাসিমা বললেন, দুটো বাতাসাও দিস শিপ্রা।
আসল কথা রাগ, প্রতিশোধস্পৃহা এসবের জন্যে একটু জীবনীশক্তি লাগে। সেটুকুও এদের নেই। আমারই কি আছে? জ্বলে উঠতে পারছি কি? অফিস যাই, নাম সই করি, পরেই দীপ্তর নামটা কাটা রয়েছে একটা লাল কলম দিয়ে, হাজিরা খাতার পাতায় যেন মার্ডার। ফেরবার সময়ে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে, ট্রেনে উঠে একটু ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেলেই মনে হয় এই কি সেই কামরা…যেখানে আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছিল দীপ্ত? এই কামরাতেই কি আমার বন্ধুর রক্ত লেগে আছে! ও আগে নেমে যেত-শ্রীরামপুর, কাঁচের মুখে ফিরে তাকাত একবার—আবার কাল, জয়। আবার…।
আবার কাল দীপ্ত… আবার… আমি ফিরে জবাব দিতাম। কতটা জবাব দেবার ইচ্ছে থেকে আর কতটা শুধু অভ্যেস…বলা মুশকিল। ঝাঁকে ঝাঁকে লোক নামছে। ঝাঁকে ঝাঁকে লোক উঠছে, একভাবে, প্রতিদিন একভাবে—সেই যে দাদা…ঝাল মুড়ি, কড়াক কড়াক কড়াক ঝাল মুড়ি…ছুরি নিয়ে নিন সাত ফলা ছুরি… নখ কাটুন, পাঁউরুটি কাটুন, কোকাকোলার বোতল খুলুন চ্যাঁক করে, কাগজ ফাঁড়ুন, চিঠি খুলবেন তো দাদা… চিঠি খুলবেন না?… ইমপর্যান্ট চিঠি—চাকরির চিঠি, বাপের অসুখ, শুভবিবাহ, হোল খুলবেন দাদা, হোল, বাড়িতে ডাকাত এলে স্রেফ পেটটা ফাঁসিয়ে দিন—সাত ফলার মাল্টি পারপাস ছুরি দাদা… চা… চা… লেবু চা…, দুধ চা…, দুধ চা, লেবু চা…।
আমার ভেতরেও ইচ্ছেটা আস্তে আস্তে মরে আসছে। মাসিমার মতো বা শিপ্রার মতো করে ভাবছি। কী হবে? ফিরে তো পাব না। তবু রুটিন করে থানায় হাজিরা দিয়ে যাই। কী স্যার, হল কিছু?
ও. সি কান খোঁচাতে খোঁচাতে বলেন, হলেই হল দীপ্তবাবু, স্যরি জয়বাবু?–এ যে কী ছ্যাঁচড়ার চাকরি! ডিউটি কর, বাড়ি যাও, একটু পেট আলগা করে খেতে বসেছি…বাস কল এখুনি যেতে হবে। এ-শালার চাকরি তো আর করেননি!
সেদিন ওই রকমই গেছি। ও. সি পাশের চেয়ারে বসে এক সাদা শার্ট আর কালো জিনস পরা ভদ্রলোককে বললেন, এই যে এঁর কথাই বলছিলাম স্যার। মা ছাড়ল, বোন ছাড়ল, ইনি কিন্তু লেগেই আছেন, এই দীপ্ত চম্পটি, মৃত জয় সমাদ্দারের প্রাণের বন্ধু। সরি জয় চম্পটি আর দীপ্ত সমাদ্দার।
বিবরণ শুনে আমি একটু হাসি। শুকনো, বিরস কঠিন হাসি।
আর জয়বাবু, ইনি আই, বি থেকে আসছেন। কেসটা হ্যান্ডল করছেন। কানাইলাল সামন্ত।
ভদ্রলোক ইয়াং ম্যানই বলা যেতে পারে। মেরেকেটে পঁয়ত্রিশের এদিক-ওদিক। আমাদের থেকে বড়ো হলেও তেমন কিছু নয়। মুখটা ভালোমানুষ-ভালোমানুষ।
মাফ করবেন, জয়বাবু—কেমন কাঁচুমাচু হয়ে বললেন কানাইলাল—আপনাদের মতো ঘনিষ্ঠ ক-জনের সহযোগিতা না পেলে…আই মিন…মুখ দেখাতে পারছি না ডি. আই. জি-র কাছে।
আমি অবাক হয়ে বলি, সহযোগিতা ছেড়ে, আমি তো জোঁকের মতো লেগে আছি দাদা, তা এনারা তো যে তিমিরে সে তিমিরেই। এক বছর পুরো পার হয়ে গেল।
মার্ডার জয়ন্তী—ও. সি বললেন।
ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকাই। কোনো লাভ নেই। অবশ্য। যেমন অসাড় তেমন অসাড়ই থেকে যাবে এই লোকগুলো।
কানাই সামন্ত বললেন, কোথায় একটু বসা-টসা যায় বলুন তো?
ও. সি বলেন, ওই তো ওদিকের ঘরটা খুলে দিচ্ছি। জেরা ঘর। চলে যান। এখানেও বসতে পারেন, তবে এখানে নানান কিসিমের লোক তো অনবরত আসছেন, আপনাদের ব্যাঘাত হবে।
না, না। এখানে একেবারেই নয়।
আমি বললাম, এখানে ছোটোখাটো চায়ের দোকান আছে, কাছাকাছি দেখে। আমরাও বসতাম… আমি দীপ্ত…
না, না। ওখানে একেবারেই নয় জয়বাবু। আপনাকে সবাই চেনে, আমার আইডেনটিটি সম্পর্কে একটা কৌতূহল… না না, তাতে আমার অসুবিধে আছে।
দীপ্তর বাড়িতে যাবেন?
কে কে আছেন?
ওর বোন তো চাকরিতে বেরিয়ে গেছে। মা হয়তো ফিরে এসেছেন…
না, না।
সবেতেই যদি এত না-না তাহলে উনিই বলুন। আমি চুপ করে যাই। ভেবে চিন্তে উনি বললেন, কলেজ স্ট্রিট কফি হাউজে যাতায়াত আছে?
নাহ, এখন আর…
আইডিয়্যাল প্লেস বুঝলেন। আপনি কাল বিকেলে ধরুন সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ওখানেই চলে আসুন। অফিসের পর। কী, ঠিক আছে? আমি তিনতলাটাতে অপেক্ষা করব, ওখানে আমাকে বা আপনাকে কেউ চিনবে না।
চারটে-পাঁচটা নাগাদ ইদানীং, আমার শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে। কেন জানি না। গরম প্রচণ্ড। ঘামে যেন গঙ্গাজল বয়, বড্ড ঘামছ—মদন শূর বলে, একটু নুন-চিনির শরবত খেয়ে নাও বুঝলে? শরীর থেকে নুনটা বেরিয়ে যায় তো! বিরাট গোল হাঁড়ি লাল ভিজে কাপড়ে জড়িয়ে শরবতঅলারা দাঁড়িয়ে থাকে।
আশেপাশে থাকে লেবু, চিনি, লবণ। সব মিলিয়ে বেশ ঠান্ডা-ঠান্ডা গা-জুড়োনো শরবত করে দেয়। খেয়ে সত্যিই একটু আরাম পাই। মদন শুর বলে, কে জানে আবার কলেরা খাচ্ছি, টাইফয়েড খাচ্ছি না হেপাটাইটিস বি খাচ্ছি।
কেন, ইনজেশন নেন না? আজকাল হেপাটাইটিস বি-র তো ভ্যাকসিন বেরিয়েছে।
তুমিও যেমন। আমি নেব ভ্যাকসিন? তুমি নিয়েছ? নাও? আমি না নিলেও কিছু হবে না। আমি হাসি—আমাদের কিছু হয় না। হবে …যতক্ষণ না খুন হচ্ছি, অনন্ত আয়ু শূরদা।
যা বলেছ, মদন শূর তার গেলাসে চুমুক দেয়।
তারপরেই মনে পড়ে যায়—আরে আজ কফি হাউজ যাবার কথা নয়?
গুচ্ছের পয়সা খরচা করে কে আবার বাসে যায়। আর একটু সময় থাকলে হেঁটে মেরে দিতাম। কিন্তু সময় নেই হাতে। হাওড়ার ট্রামগুমটি থেকে গুঁতোগুতি করে ট্রাম ধরি। রাস্তাময় থিকথিকে পিঁপড়ের মতো দলা পাকিয়ে আছে মানুষজন। কিংবা চিটেগুড়ে আটকে থাকা ভিনভিনে মাছি। কেমন ঘেন্না করে। ঘিনঘন মতন। এমন নয় যে আমি এর বাইরে, কোনো মহান বিশিষ্ট। নিজেকেও দেখতে পাই ওইসব মাছি-ভিনভিনে ঘিনঘিনে ভিড়ে। বাসে-ট্রামে একটু পা রাখার জন্যে গুতোগুতি, বাজারে আনাজ-তরকারি একটু কম পয়সায় পাবার জন্যে ঝুলোঝুলি, হাসপাতালে পেচ্ছাবখানার পাশে মেঝেতে একটু জায়গা করে দেওয়ার জন্য ওয়ার্ড মাস্টারকে ধরাধরি, আপিস-ফ্যাকটরিতে বাদুড়ঝোলা ঝুলতে ঝুলতে প্রাণ হাতে করে লেটে পৌঁছোনো, গালাগাল খাওয়া, ইউনিয়ন-সর্দারদের গা-জ্বালানি চালবাজি শুনতে শুনতে প্রাণপণ চেষ্টায় ভুরু সোজা করে রাখা…টিউবওয়েল থেকে জল আনতে ঠেলাঠেলি, রাত্রে মশারির মধ্যে চটাস-চটাস…ঘেন্না…খুব ঘেন্না…দীপ্তটা বেঁচে গেছে একরকম, মরে বেঁচে গেছে।
