ট্রেনে কারও হাতে বাংলা কাগজ থাকলে তাক বুঝে ছোঁ মারি।–দাদা ওই মাঝের পাতাটা, পাঁচ নম্বর, পাঁচের পাতা।
বিরক্ত হয়, তো হোক, বয়ে গেল। কাগজ খুলে খুঁজে খুঁজে দেখি—জমজমাট খবরাখবর আছে কি না। যেমন ধরুন নস্কর লেনে দোতলা বাড়িতে গৃহিণীহত্যা, রক্তগঙ্গা, আলমারি খোলা, উদ্দেশ্য ডাকাতি। কিংবা বেহালা পর্ণশ্রীতে গৃহবধূর আত্মহত্যা, গলায় দড়ি। দড়ির দাগ বসেনি, জিভ ঝোলেনি, সন্দেহ—খুন। মহিলার স্বামী ও তাঁর বান্ধবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। বোবা-কালা কিশোরী পুলিশব্যারাকে ধর্ষিত, ডাক্তারি পরীক্ষা হচ্ছে। অপরাধী বলে এখনও কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। নিরুদ্দিষ্ট ডাক্তারের মৃতদেহ পুকুরধারে, কাদার মধ্যে পোঁতা, আগের রাতে সহকর্মির বাড়ি নেমতন্ন ছিল। শালবনিতে ডাকিনী সন্দেহে বৃদ্ধাকে খুন। কালাহান্ডিতে অপহৃত বালকের ছিন্নমুন্ড দেহ রঘুনাথপুরে, সন্দেহ নরবলি। প্রকাশ্য রাজপথে গণধর্ষণ ও হত্যা। ফোর্ট উইলিয়ামের পাশে যুবতির মৃতদেহ, সন্দেহ ধর্ষণ ও হত্যা, বালক-চাকরকে চোরের মার দিয়ে, ঘরে বন্ধ করে রেখে দম্পতি হাওয়া বদলাতে উধাও। প্রোমোটার খুনের চক্রান্তে জড়িত সন্দেহে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি ফেরার হবার চেষ্টায় ছিলেন।
দীপ্ত আমাকে কনুই দিয়ে ঠেলা মারে, কী রে জয়, খুনটুন করলেও তো বেশ আপনি আজ্ঞে পাওয়া যায় রে! খবরের কাগজওয়ালারা তো খুব খাতির করে!
যা বলেছিস। মহিলার স্বামী ও তাঁর বান্ধবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি ফেরার হবার চেষ্টায় ছিলেন।…
আমাদের উল্লাস দেখে পাশের লোকে বিরক্ত হয়ে তাকায়। কাগজটা কি আপনাদের দেখা হয়ে গেছে? শুকনো গলায় বলে।
নিশ্চয়, নিশ্চয় সার। চুম্বুক মানে চুম্বকটুকু পড়ে নিয়েছি, নিন ধনিয়বাদ দাদা।
ঠিকাছে, ঠিকাছে।
সেই দীপ্তই খুন হয়ে গেল।
খবরটা কাগজেই পড়ি। লোক্যাল চায়ের দোকানে গিয়ে জম্পেশ করে একটা ডবল-হাফ আর একটা সর্ষের তেলে ভাজা ওমলেট আমার রোববারের মেনু। সঙ্গে কাগজ। কাগজটা হাতবদল হতে থাকে। এই কাগজের লোভেই যে অনেক খদ্দের তার ধরা দুধের চা খেতে আসে চা-ওয়ালা তারক তা বিলক্ষণ জানে। রোববারে কাগজে কাগজে ছয়লাপ। লোকে বলে পেপার। একখানা পেপার পেয়ে যাবার কোনো অসুবিধে নেই। প্রথম পাতার বাঁ দিকে লম্বা কলমটায় দেখি ব্যান্ডেল ল্যোকালে যুবা খুন। আবার যুবা! আমি শব্দ করে হাসি। যুবাই বটে, যুবা কি এখনও আছে না কি? এখন সব ছেলেছোকরা ছ্যামরা মদ্দ, আধবুড়ো, সিকিবুড়ো। যুববা তা তিনি কেমন খুন হয়েছেন দেখি। যদি নতুন কিছু হয়।
লাস্ট ট্রেন সাইডিংয়ে নিয়ে যাবার সময়ে কিছু কিছু কর্মী লক্ষ করেন একটি কামরা থেকে লাল জল বেরিয়ে আসছে। বড়ই লাল, জমাট মতো, তখন কামরায় উঠে দেখা যায় এক যুবা, পরনে ছাই রঙের শার্ট এবং খাকি প্যান্ট, গলার নলি ও কবজির শির কেটে দেওয়া হয়েছে কোনো সূক্ষ্মধার অস্ত্র দিয়ে। অস্ত্রটি ঘটনাস্থলে পাওয়া গেলে এটি আত্মহত্যার কেস বলে সাবুত হত। কিন্তু অস্ত্রটি পাওয়া যায়নি। কবজি, গলা কেটে অস্ত্রটা জানলা গলিয়ে ফেলে দেবার সম্ভাবনা অবশ্য উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ। বডি পোস্টমর্টেমে যাচ্ছে। আশ্চর্য যুবাটির পকেটে কিছুই পাওয়া যায়নি, টিকিট—দৈনিক বা মান্থলি, কোনো টাকাপয়সা বা মানিব্যাগ, হাতে ঘড়ি নেই। কোনো ভাবেই শনাক্তকরণের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। দেখে মনে হচ্ছে না, কিন্তু সে কি কোনো কারণে অনেক টাকা নিয়ে যাচ্ছিল?
চিহ্ন পাওয়া যায়নি তো ছবি দে! বিরক্ত হয়ে বলি। একটা কাজ যদি এরা সুষ্ঠুভাবে করতে পারে! যখন পচে-গলে যাবে তখন দিবি বোধহয়। আরও কতকগুলো খুন, সুইসাইড, ধর্ষণের ঘটনা পড়ি নিয়মমাফিক। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাড়ি চলে যাই। কেননা যাবার পথে বাজারটা করে নিয়ে যেতে হবে। বেশি সকাল সকাল গেলে মাছ আগুন, বেশি বেলা করে গেলে বেগুন। অর্থাৎ পচা-পাচকো।
দেখেশুনে গোটা দুই ফলুই মাছ কিনি। কড়া করে ভাজলে কাঁটা টের পাওয়া যায় না। রোজ রোজ মাছের তেল-কাঁটার চচ্চড়ি কিংবা তেলের বড়া খেতে খেতে মুখ পচে গেছে।
আপিসের দিনে কাক-চান, জলও থাকে না তেমন। আজ একেবারে গলির মোড়ে টিউবওয়েলের তলায় বসে পড়ি। লাল সাবান মেখে জববর চান। বাড়ি গিয়ে এখন একটু আয়েশ করব, গায়ে পাউডার ছড়িয়ে একটা ফতুয়া আর লুঙি, তেল-মাখা চুলে যত্ন করে টেরি কাটব। তারপর ফলুই মাছের কড়া করে ভাজা মাখো-মাখো ঝাল দিয়ে মুশুর ডাল আর আলুপোস্ত দিয়ে এক থালা ভাত, তারপর বাড়ির একমাত্র তক্তপোশটা দখল করে নিয়ে দিবানিদ্রা। তা সেই দিবানিদ্রারই আয়োজন করছি এমন সময়ে রুখু চুল, শুখো মুখ, লাট খাওয়া সালোয়ার-কামিজ আর হাওয়াই চপ্পল পায়ে শিপ্রা এসে হাজির।
ভাই খুলে দিয়েছিল। এসে বলল, দাদা, কে এসেছে, একজন মেয়ে, বাইরে এসে দেখে যাও!
মেয়ে? আমার কাছে? মেয়ে-টেয়ে আমার কাছে আসবার মতো তো কেউ নেই! আওয়াজ-ফাওয়াজ দিলে অনেক সময়ে মেয়েরা খুব পটে যায়। ওটা এক ধরনের খোশামোদ। ওরা জানে। আমার তোমাকে খাসা লাগছে, বুঝলে মেমসাব, তো সেই পুলকটাই এইভাবে ঘুরিয়ে নাক দেখিয়ে দেখাচ্ছি। এটা বোঝে বলেই রাগতে রাগতে ঠোঁটের কোণে একটু প্রশ্রয়, চলাফেরায় একটু ময়ূরী ময়ূরী ভাব ফুটে ওঠে। তো আওয়াজ-ফাওয়াজ দেওয়া তো অনেক দিন ছেড়ে দিয়েছি। এখন আবার রোববারের দুপুরটা মাটি করতে কোন মাধুরী এলেন!
