দুর্ঘটনায় মারা যাওয়াও ওর অসম্ভব ছিল না। কেননা শ্যামবাজার শ্রীরামপুর বাসে ও বালি থেকে উঠত, একদিন জি, টি, রোডে সেটা একটা লজঝড়ে বাসের সঙ্গে লেগে যায়। ঘ্যাচাং। ডান সাইডে যারা ছিল তাদের মধ্যে দু-তিনজন স্পট ডেড, বেশ কয়েকজন মারাত্মক জখম। দীপ্তও বসেছিল ডান দিকেই, শেষ সিটে। তেমন কিছুই হয়নি। একটু ফার্স্ট এড দিয়ে ছেড়ে দিল। সবাই বলল, লগনচাঁদা ছেলে, মঙ্গল খুব স্ট্রং, তা নয়তো আগে জখম, পাশে জখম, ওইভাবে বেঁচে যায়। ভাবাই যায় না।
আজকাল লোকে বাসে-মিনিবাসে ওঠে প্রাণ হাতে করেই। ভালো করে চালাতে শিখেই লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে সব, হাত দরস্ত হতে না-হতেই বাস-ট্রাকের স্টিয়ারিং ধরছে। তা তখন যদি মারা যেত, বিরাট একটা কান্নাকাটি, দৌড়োদৌড়ি, বুক চাপড়ে ভাগ্যকে অভিসম্পাত, মর্গ…এইভাবে শেষ হয়ে যেত ব্যাপারটা। বাস কোম্পানি থেকে ফ্যামিলিকে ক্ষতিপূরণ দিত কিংবা দিত না। ফ্যাক্টরিতে ওর বোনকে একটা চাকরি পাওয়াবার জন্যে তদবির করতাম। মেয়েটা সবে সাবালক হয়েছে, কোনো ট্রেনিং নেই বলে ওরা গাঁইগুঁই করত। আমরা লড়ে যেতাম। কিন্তু মঙ্গল স্ট্রং। বেঁচে গেল। সবাই বলল, ছেলেটা দীর্ঘায়ু হবে। আমার মনে আছে, দীপ্ত বলেছিল, দীর্ঘায়ু না দ্রিঘাংচু? মাঝেমাঝেই মাসিমাকে বলত, অত হাঁকপাঁক করো কেন বলো তো? দেখলে, তো শালা ম্যালিগন্যান্ট আমার কি করতে পারল না। অ্যাকসিডেন্ট? সিনে নেই। কী রে জয়, কী বুঝছিস গুরু?
মুখে কিছু আটকায় না? মাসিমা রাগ করে বলতেন, ওভাবে বলতে নেই। গ্রহ কূপিত হন।
মাসিমার সামনে এই। আমাদের সামনে আবার দীপ্ত অন্য মানুষ। তখন বলত, কী করা যায় রে জয়, কিছু বল?
কীসের কী?
দেখছিস তো চারদিকে কী অবস্থা! একেবারে নো-হোয়্যার হয়ে আছি। এক মুহূর্ত ভাল্লাগছে না। শালারা বাবাটাকে ফুটিয়ে দিলে। মাথার ওপরে কেউ থাকার সোয়াস্তি কী জীবনে জানলাম না। মুখ শুকনো বিধবা মা, বোনটা কালো, কত দূর পড়াতে পারব, পারলেও কোনো হিল্লে হবে কি না…তুই কিছু ভাবিস? তোর অবশ্য বাপ আছে।
তেমনি দুটো বোন, একটা ভাই এখনও স্কুলে। তবে কী জানিস, আমরা যা হোক করে চালিয়ে নিচ্ছি। চারপাশে লোক দ্যাখ-ধুকছে। তাদের তুলনায়…
একটুকুই আমাদের সান্ত্বনা। ধরুন চৌরঙ্গি এলাকায় সার সার গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে। জ্যাম জমাট একেবারে। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। সড়সড় সড়সড় করে কিছু ভিখিরি এঁকেবেঁকে গাড়িগুলোর মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। কার কোলে রিকেটি ছেলে, কার একটা হাত কাঠের মতো, কার গাল এমন ভাঙা, চোখ এমন গর্তে ঢোকা যে মনে হয় এই বুঝি শ্মশান থেকে উঠে এল। বাচ্চা ছেলে, করুণ মুখে পয়সা চাইছে, একটা গাড়ির কাচ নেমে গেল, কোনো মহিলা কিছু দিলেন। গাড়ি চলে যেতেই ছেলেটা ষাট-বছুরে বুড়োর মতো মুখ করে ভ্যাঙালে, ভিক্ষে পছন্দ হয়নি।
এই দৃশ্যগুলো আমরা লোলুপ চোখে দেখতাম, ঠিক যেমনভাবে কাঙালরা সুখাদ্য দেখে—শিককাবাব, গলদা চিংড়ির কালিয়া, মটন দো পিঁয়াজা। দীপ্ত বিড়বিড় করত—ঠিকই, এর চেয়ে বোধহয় ভালো। আমি বিড়বিড় করতাম— আমাদের চেয়েও খারাপ।
দীপ্ত বলত, টপ করে লাল আলোটা সবুজ হয়ে গেলে আর সব গাড়িগুলো এক সঙ্গে ছেড়ে দিলে, এইসব ভিখিরিগুলো তো পিষে যাবে রে জয়!
আমি বলতাম, রাস্তা ভরতি ধর থকথকে রক্ত…
রাস্তা ভরতি ধর থ্যাঁতলানো মড়া…
কেউ কি বাঁচবে?
অসম্ভব। কেউ না।
আর গাড়িগুলো?
কয়েকটা পড়িমরি করে পালিয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু বাকিগুলোতে জনগণ নির্ঘাত আগুন ধরিয়ে দেবে। টেনে নামাবে ড্রাইভারগুলোকে। মার মার বেদম মার।
পুলিশ আসার আগেই ফুটে যাবে।…হাসতাম আমি।
শুধু ড্রাইভার? মালিকগুলো!
ঘাবড়াচ্ছিস? বেশির ভাগই নিজেরা ড্রাইভ করে। আর পেছনে হেলান দেনেওয়ালারা? পার পাওয়া অত সোজা নয়! রেমন্ডের স্যুট, এক্সক্যালিবারের শার্ট, নাইকির শু…কি করতে পারবে না। গণপিটুনির পর কে বড়োসাহেব আর কে ছোটোসাহেব ধরতেই পারবি না। পেট্রোল ট্যাংকে কেউ ধর একটা বিড়ি ফেলে দিল। ব্যস সব কাঠকয়লা। ষ্টু মন্তর ঘু মন্তর ঘু মন্তর ছুঃ।
দুজনে খ্যাখ্যা করে হাসি।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ওরকম কিছু ঘটে না। ভিখিরিগুলো ম্যাজিক জানে, কিংবা ওদের বডিগুলো হাওয়া দিয়ে তৈরি। এ গাড়ির বনেট, ও গাড়ির বাম্পার, সে গাড়ির বডির পাশ দিয়ে দিয়ে ভানুমতীর খেল দেখাতে দেখাতে ঠিক বেরিয়ে আসে সব। গাড়িগুলোও এঁকেবেঁকে, কায়দা করে পাশ কাটিয়ে আবার অন্য কোনো মোড়ে সিগন্যাল খাবার জন্যে হুশ হয়ে যায়। ঠিক যেমন ম্যালিগন্যান্ট বা অ্যাকসিডেন্ট টপকে বেঁচে থাকে দীপ্ত, বেঁচে থাকি আমি।
দীপ্ত আসে শ্রীরামপুর থেকে, আমি শ্যাওড়াফুলি। নিজেদের মধ্যে আমরা বলি বিশ্রীফুলি, আর শ্যাওড়াপেতনিপুর। কারখানায় যাই, খোঁচা-দাড়ি খাড়া চুল হাজিরাবাবুর খেরোর খাতায় সই করি—দীপ্ত সমাদ্দার, রফিক আসলাম, বিহারীলাল পান্ডে, মহম্মদ বেণু, ইসমাইল খাদির শেখ…।
এক মাস মান্থলি আমার, পরের মাসে দীপ্তর। একজনই পকেট থেকে একটু বার করি, বলি, আমরা এক সঙ্গে দাদা, ডেলি।
এখন চিনে গেছে। কেউ আর ওসব দেখা টেখার ঝামেলায় যায় না। দীপ্ত বলে, পুরনো পাপী বুঝলি তো? দাগি হয়ে গেছি।
