উঠে দাঁড়িয়েছি, শিবানী, আমার বড়ো বোন, শিপ্রাকে নিয়ে ঢুকল।
আরে শিপ্রা? কী ব্যাপার? হঠাৎ? এখন?
শিপ্রা লালচে চোখ মেলে বলল, দাদা কাল বাড়ি ফেরেনি।
বাড়ি ফেরেনি? দীপ্ত? সে কী! কালকে ওর ওভারটাইম ছিল অবশ্য, তা কোনো খবরও দেয়নি?
আপনি…মানে আপারও তো ওভারটাইম…আমরা ভেবেছিলাম আপনার কাছ থেকে কোনো খবর পাব।
আমি কালকে ওভারটাইম করিনি শিপ্রা। ছুটি হতেই ডাক্তারখানা, এইসা ভিড়। মায়ের জ্বর হচ্ছিল…। দ্যাখো, আরও কিছুক্ষণ…হয়তো কোথাও আটকে গেছে। হয় এসে যাবে, নয় খবর দেবে।
কী করে খবর দেবে? পাশের বাড়ি থেকে আজকাল আর আমাদের মেসেজ দেয় না। আর আটকে কোথায় যেতে পারে! তেমন কোনো জায়গা আছে? বলুন না, তাহলে খোঁজ নিই।
কী করে আর বন্ধুর বোনকে বলি রাত্তিরে আটকে যাওয়ার একটাই জায়গা আছে আমাদের মতো আত্মীয়-বন্ধুহীন ছোকরাদের। হয়তো দীপ্তটা সেখানেই…
আমার বড্ড ভয় করছে জয়দা, আমার সঙ্গে একটু যাবেন?
ঘড়িতে দেখি দেড়টা। এখনও পর্যন্ত ফিরবে না? যে চুলোতেই যাক!
মা বড্ড কান্নাকাটি করছে, যদি একটু…যদি পুলিশে খবর দিতে হয়…
বিকেল অবধি অপেক্ষা করবে না?
কখনও এরকম হয় না জয়দা। কখনও…
এটা কিন্তু একদম শতকরা শতভাগ সত্যি। আমরা একশো ভাগ ভদ্রবাড়ির ছেলে, যেমন করেই হোক বি. এটা পাস করেছি। দীপ্তর বাবা ছিলেন লোক্যাল স্কুলের হেডমাস্টার। শুনেছি ওঁর বিরোধী গ্রুপ ওঁকে কায়দা করতে না পেরে ওঁর বিরুদ্ধে টাকা তছরুপের অভিযোগ আনে। জামিন পাবার আগে দু-দিন হাজতবাস করতে হয় ওঁকে, হাই ব্লাডপ্রেশার ছিলই, স্ট্রোক হয়, এক ঘায়েই শেষ। যখন এ ঘটনা ঘটে, দীপ্ত তখনও স্কুলে। কাজেই যেভাবে লেখাপড়ার কথা ছিল, সেটা হয়ে ওঠেনি, মা-ও খুব শোকগ্রস্ত ছিলেন বহুদিন। তাই বলে ভদ্র হোয়াইট-কলার ছাপটা যাবে কোথায়? আমার বাবা আবার সরকারি আপিসে কলম পেষেন। যতই হোক সরকারি চাকরি। একটা খাতির আছে। সন্তান সংখ্যা একটু কম রাখলে আর একটু স্বচ্ছন্দে থাকতে পারতেন। তবে আমার বোনেরা, ভাই সব—পড়াশোনা করে, বাজে সঙ্গে মেশে না, একটা নিয়ম-নীতি আছে চাল চলনের। যেমন আমরা মা-বাবাকে তুমি করে বললেও অন্যদের কাছে যখন উল্লেখ করি আপনি করে বলি। দীপ্ত বলে, আমার বাবা মারা গেছেন আমি বলি, মা ডাকছেন। খিস্তি ফিস্তি সব চৌকাঠের বাইরে রেখে বাড়ি ফিরি। বাজার করি, আত্মীয় কারও অসুখবিসুখ করলে মা খোঁজ নিতে পাঠান। মুখ মুছে ভিজে বেড়ালটির মতো যাই। বাড়ি ফেরার নির্দিষ্ট সময় আছে। বড়োদের সামনে ঝুঁকি না। কাজেই শিপ্রা বলতেই পারে, কখনও এ রকম হয় না জয়দা, কক্ষনও। এবং আমিও ওর উদবেগ চিন্তা বুঝতেই পারি।
মাকে বলে চটপট জিনসটা গলিয়ে নিই, আর সেই সময়ে হঠাৎ কেন যেন একটা কথা মনে আসে। শি-আ, ঘর থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করি, দীপ্ত কী পরে গিয়েছিল রে কাল?
কেন, আপনার মনে নেই?
আছে। কিন্তু রোজ রোজ নিজেদের খাড়া-বড়ি-থোড় জামাকাপড় কে-ই বা অত খেয়াল করে। তাই নিশ্চিত হবার জন্যে জিজ্ঞেস করি, বলই না।
খাকি প্যান্ট, আর ছাই-ছাই রঙের শার্ট।…
ঠিক, আমারও তাই মনে হচ্ছিল। খাকি প্যান্ট, আর ছাই রঙের শার্ট।
ভেতরটা গুড়গুড় করছে, হঠাৎ কেমন শীত করে কাঁপুনি এল। কাঁপা কাঁপা গলায় শিপ্রাকে বললাম, চল!
সেদিন সন্ধের খবরই দু-তিনটে চ্যানেলে ছবিটা দেখাল। চোখ বুজে শুয়ে আছে। দীপ্ত। গলার কাছটা জমাট রক্ত। মুখটা ইতিমধ্যেই একটু ফুলে গেছে। যেন মৃত্যুর মধ্যেই দীপ্তর স্বাস্থ্য ফিরে গেছে।
ছোট্ট সাদা-কালো টিভিতে ছবিটা দেখাতেই আঁক করে উঠলেন মাসিমা, আঁ ক দ্বিতীয়বার, তারপর একেবারে অজ্ঞান। শিপ্রা যেন পাথরের মূর্তি, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে। ইতিমধ্যে আমি শিপ্রাকে নিয়ে লোক্যাল থানাতে ঘুরে এসেছি। ওসি, আশ্বাস দিয়েছেন—খোঁজখবর করছেন, কতকগুলো রুটিন প্রশ্ন করে নিয়েছিলেন।
কোনো পার্টি, মনে পলিটিক্যাল পার্টিতে…
স্যার, ফ্যাক্টরিতে থাকলে একটা ইউনিয়নে চাঁদা দিতেই হয়, ব্যস।
কোনো শত্রু?
আমার অত দুঃখেও হাসি পেয়ে যায়, দীপ্তর শত্রু? আমার শত্রু? তার চেয়ে যদি জিজ্ঞেস করতেন, কোনো বন্ধু আছে?—তাহলে সহজে উত্তরটা দেওয়া যেত।
শুনুন স্যার, আমাদের মতো চুনোপুঁটিদের শত্রুও থাকে না মিত্রও থাকে না।
দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে কান খোঁচাচ্ছিলেন অফিসারটি, এমনিতেই মুখটা বিকৃত হয়েছিল, এখন একেবারে খিচিয়ে উঠলেন, যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দেবে ছোকরা।
হাসি পায়, এই তো পথে এসেছ, যুবা-টুবা তরুণ-ফরুন নয়। ছোকরা। স্রেফ ছোকরা। শিপ্রা থাকায় আমি যথেষ্ট সংযত থাকি।
রাগ করছেন কেন স্যার, আমরা বড্ড উদবিগ্ন।
উদবিগ্ন লোকেরাই এখানে আসে। খিচোতে হলে পাড়ার এম. এল. এ-কে খিচোও, কাউন্সিলরকে ঘিঁচোও। আমরা তোমাদের কাছে ভোট চাইতে যাব না, বুঝলে হে? ছ্যাঁচড়া একটা চাকরি করি। মাইনে পাই, ডিউটি করি, ডিউটি মাঝরাত্তিরে কলার ধরে টেনে আনে। বুঝলে?
বুঝেছি, স্যরি স্যার।
শিপ্রার দিকে তাকিয়ে বললেন, লভ অ্যাফেয়ার! পিরিত নাকি? ট্রায়াংগুলার?
শিপ্রা কেঁদে ফেলে। আমি বলি, ও নিরুদ্দিষ্ট ব্যক্তির আপন বোন, বাড়ি ফেরেনি বলে আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছে। আর কেউ তো নেই!
