হিম ক্রমেই জমাট হচ্ছে। মাঠের মাঝে মাঝে জমাট হিমের হিমপাহাড়। অনেক বেলা করে রোদ উঠছে। বড়ি শুকোতে চায় না, আচার ভটভট করে, জামাকাপড়ে স্যাঁতা লেগে যায়, বর্ষার দিনের মতো জুতোয় ছাতা ধরে যায়, এত আঠা হাওয়ায়। ঘরের মধ্যে মালসা-আগুন, তবু রুগি নাকের জলে চোখের জলে। রুগির আর দোষ কী। তার ধাইটিই তো জ্বরে কাবু। জবুথবু। ভোরের চানে ঠান্ডা লেগে বুকে সর্দি। ঘঙ ঘঙ খক খক। রুগিটি বুঝি দেখাশোনার অভাবে বুড়ো গাছের শেষ পাতাটির মতো ঝরে খসে গেল। ডাক্তার এসে লাবণ্যর বুকে নল বসাচ্ছে। লাব ডুপ লাব ডুপ দিব্যি উঠছিল। উঠতে উঠতে হঠাৎ হঠাৎ ফাঁস করে কেমনতরো একটা বেখাপ্পা আওয়াজ উঠছে। মুড়িসুড়ি দিয়ে কড়া কড়া ওষুধ গিলে কাঠের মতো পড়ে থাকে লাবণ্য। দুবেলা গরম গরম সুরুয়া খায় চুপচাপ। জামাই চলে গেছে। ছেলেগুলিও গেছে। মেয়ে বউগুলি সব যায়নি। বাড়িতে দুটি রুগি। পরন্তপের বউ একলা ক-দিক সামলায়? তার ওপর আবার চাকুরে মানুষ!
তা শীতের বুড়ির মাথার খেয়াল! মাথার পোকা নড়ল তো ঝপ করে কাঁথা কম্বল নামিয়ে দেবে, আবার পোকা ঘুমোল তো মিঠে আঁচে সেঁকে তুলবে মাটির তাওয়ায় মাঠের মাটি। তাই একদিন বাদুলে কাঁদুনে ঠান্ডার জোলো পর্দাখান টান মেরে সরিয়ে ঝকঝকে নীল আকাশ লম্ফ দিয়ে নামে। ঘাসের শিশিরে ফুরফুরে সব হালকা মেঘের ছায়া পড়ে। গায়ের ব্যথা মরেছে, কাশি ধরেছে। জ্বর নেমেছে। লাবণ্য বুঝি এবারের ধাক্কা সামলে নিল।
পায়ের দিকের জানলাটুকু খুলে দাও তো মা …
উত্তুরে জানলা যে মা, হাড়অব্দি হিম হয়ে যাবে …।
তা হোক দাও গে একবার, ঘরে কদ্দিনের স্যাঁতা …।
জানলার কপাট খুলতেই ভলকে ভলকে রোদ এসে ঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায়, হাউ-হাউ আওয়াজ ঢোকে পিছু পিছু। কিন্তু রোদের তেজে তার বঁটিতে আর শান নেই। টলর টলর পায়ে লাবণ্য গরাদ ধরে দাঁড়ায়। চিরণ গাছের মাথায় একটা বাদামি চিল, গোদা লোমশ পায়ের থাবা থেকে সদ্য-মারা মেঠে ইঁদুর ঝুলছে। ফেলে-যাওয়া কাকের বাসাখান দোল খাচ্ছে পাতাঝরা নিমের শুকনোশাকনা ডালে। পোড়ো পাঁচিলের গায়ে জানকি দেখো একমনে থাবড়া থাবড়া গোবর মেরে যাচ্ছে। রামধনিয়ার মুখে চুট্টা। কাঁধে গামছা। জাড়ের দিনে ধুপে বসে আয়েস করছে দুপুরবেলা। এখন সোয়ারি লিবে নাই। আপিস-টাইমে ঠিকঠাক টিশনে হাজিরা দিবে। ওই তো জানকি উঠল, মাথায় বিড়ে, তার ওপর ঝাঁকা, তার ওপর থাক থাক খুঁটে। চালির ওপর টাল করে রাখবে আপাতত। আষ্টেপিষ্টে শুখা হোক এখন। ধাঁইধাঁই করে আঁচ উঠবে, শাঁইশাঁই করে রটি হোবে। ইদিক-উদিক তাকিয়ে অসুখে ভাঙা সরু গলায় লাবণ্য ডাকে, সোনাবাতি, সোনাবাতি রে-এ-এ। জানকির মাকড়ি-পরা চওড়া-চওড়া কানে মায়ির ডাক ঠিকঠাক পৌঁছে গেছে। ঝাঁকা সামনে দোতলার জানলার দিকে এক চোখ তুলছে দ্যাখো। সোনাবাত্তি চলি গেলো হুজুর। ই মওশুম মকাই হলো, বঁট হলো, খেতিতে কাম করবে মায়ি। ইন্ডাসে ভেঁকুলে পানি ঢালবে, মকাই কাটবে, মসুরি কাটবে, সাঁড়ি হোবে, কুঁড়ি হোবে। বাপে এলো, চলি গেলো … খুঁটিয়া লিবি মায়ি? হেই মা আ!
জানলার গরাদ থেকে মরাসোনাপরা নীলশির-ওঠা রোগা রোগা হাত দুখানি শীতের শেষ পাতার মতো ঝরে যায়। টলর-টলর পায়ের বিছানায় এসে বসে লাবণ্য।
আটা ভাজাসমেত চায়ের বাটিটি বিকেলে পরন্তপের বউ নিয়ে এলে নিম্নরূপ কথোপকথন হয়—
চায়ের বাটি মাজল কে?
ঝি!
সেই বাগদি বেটি? ক-মাস আগে যে বাউনের ছেলের সঙ্গে বেরিয়ে গিছল?
সেই তো আছে মা এখনও!
বাগদি-বেটির মাজা বাটি কি আদপেই মাজা বাটি বউমা? তাতে কি শুঙ্কু জল দিয়ে হেঁসেলে তুলতে মনে ছিল?
বউ চুপ।
রোগে মানুষ অদড় হলে তবে তাকে ছত্তিশ জাতের ছোঁয়া-ন্যাপা নিয়ে জয়-জয় করতে হবে? এ কি অসৈরন কাণ্ড মা!
আওয়াজ পেয়ে মেয়ে, দুটি বউ এসে দাঁড়ায়, দুপুর-শো-এ তারা কাছের হলে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল।
রাস্তার কাপড়েই সব ভেতরে এসে দাঁড়ালে? কেন, দোরে দাঁড়াতে কী হয়েছিল?
গনগনে মুখে লাবণ্য কুলুঙ্গিতে গঙ্গাজলের ঘটি খোঁজে, গোবরমেশানেনা শুদ্ধির জল খোঁজে, কোশার মধ্যে বিল্বপত্র ডোবায়। শীতের আসন্ন সন্ধ্যায় সমস্ত মানুষজন, বিছানা বালিশ, চালিতে তোলা অতিরিক্ত লেপ-কম্বল, চেয়ার-টেবিল, আলমারি-খাট, মায় বাড়ির দরজা-জানালা, দেয়াল-মেঝে, কড়ি-বরগা সব কিছুর ওপর সে ডিঙি মেয়ে মেরে গঙ্গাজল ছিটোতে থাকে। নমঃ শিবায়, এ কি অসৈরন কাণ্ড মা? ছিটিয়ে-টিটিয়ে লাবণ্য হাত গুটোয়, পা গুটোয়, মাথাটি শুদু কাছিমের মতো গুটিয়ে নেয়, তারপর হাত-পা, মুণ্ডহীন একখানা সৃষ্টিছাড়া ধড় অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকে তার বুকের ভেতরের, ভেতরের ভেতরের কুঠুরিখানিতে যেখানেও আবার সত্যিকার লাবণ্য থাকবে কি থাকবে না সে কথা স্বয়ং ঈশ্বরও জানেন না।
মর্তুকাম
দীপ্তটা মারা গেল। আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু দীপ্ত, আজকাল যাকে বলছে ভালো বন্ধু। কোনো অসুখে-বিসুখে স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এমনকি দুর্ঘটনাও নয়। মার্ডার। কোনো মৃত্যুরই কোনো সান্ত্বনা নেই। কিন্তু মাত্র বছর দুয়েক আগেই দীপ্তর ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়েছিল। এমনও হয়েছে ছ-সাত রাত ওর জন্যে। নীলরতনে ঠায় বসে আছি। মশার কামড় খাচ্ছি আর চমকে চমকে উঠছি। এই বুঝি কোনো খারাপ খবর এল…এই বুঝি…। এক এক সময় এমন হয় না? বাড়িসুষ্ঠু আপনজন বন্ধুবান্ধব ভেতরে ভেতরে কাঁটা হতে হতে মড়াকান্না কাঁদতে তৈরি হয়ে যায়? তখন যদি দীপ্তটা সত্যি-সত্যি মারা যেত বোধহয় তৈরি ছিলাম। বলেই মেনে নিতাম। বুকের ভেতরটা কিছুদিন হা-হা করত, চায়ের দোকান, ধাবা, মাঠ-ময়দান যেসব জায়গায় দুজনে কত ঘুরেছি সেখানে স্মৃতি হাঁ করে থাকত। ওর বাড়িতে থেকে থেকে খোঁজখবর নিতাম, মাসিমা কেমন আছেন? কোনো দরকার হলে নিশ্চয়ই বলবেন…ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু দীপ্ত দিব্যি ফিরে এল। সেই হালকা-পলকা দীপ্ত, কথার কথায় হঠাৎ চুপ করে যাওয়া, নীচু গলায় খিস্তি।
