ঘুঁটেউলির গোরি নাতনি ফণীমনসার বিপজ্জনক ঝোপের আড়াল থেকে মুখটা একবার বাড়ায় একবার লুকোয়, একবার বাড়ায় একবার লুকোয়। তারপর খিলখিল হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে। কলাইয়ের থালায় লাবণ্য তার নিরমিষ্যি হেঁসেলের যাবতীয় রান্না ধরে দিয়েছে। ডালের সঙ্গে চচ্চড়ি তার সঙ্গে ঘন্ট তার সঙ্গে তেঁতুলের টক মেখে তাগাড় করে ফেলে সোনাবাতি, ছোটো ছোটো মুঠিতে তুলে কবজির কাছ থেকে খায়। কিছুক্ষণ হাঁ করে দেখে লাবণ্য। মাথার ওপর মাটিমাখা চুল দেখে। ময়লা মাখা টিকটিকে মুখখানি দেখে, পিঠ-ছেড়া ফ্রকটি দেখে আগাগোড়া। তারপর কী জানি কী মনে করে খিড়কির কপাট তুলে দিয়ে ফিরে যায়। মানুষটি বোধহয় হাতের কাছে ঘন্টি টিপে ডাকছে।
ছুটি কাটাতে এসে বড়ো তিনটি ছেলে বউ, দুটি মেয়ে, একটি জামাই, তাদের ছেলেমেয়েরা দূর থেকে গড় করল, কারণ লাবণ্যর পা গাড়ির কাপড়ে ছুতে মানা। চিবুক ছুঁয়ে লাবণ্য বলল, আহা থাক, থাক ভালো আছ তো সব? তোমাদেরই ঘর, তোমাদেরই বাড়ি, তোমরাই দেখেশুনে করে কম্মে নাও গে। ছেলে-মেয়ে-বউরা এ ওর মুখে চায়, ও এর মুখে চায়। লাবণ্যর গালের হাড়ে এবার মাস লেগেছে, কণ্ঠা ঢাকে ঢাকে। মেয়ে বউদের করে-কম্মে নিতে বললেও লাবণ্য বড়ি দেয়, আচার মাখে, পিঠেপুলির নারকেল কোরে, কীসের সঙ্গে কি মিশিয়ে অদ্ভুত সোয়াদের সব দিশি রান্না রাঁধে, তার গন্ধে নাতি-নাতনিদের লাল ঝরে, কাসুন্দের মাঠ দিয়ে পথচলতি লোক চমকে চমকে বাতাস শোঁকে, হাত পাখার হাওয়া দিয়ে দিয়ে রুগি মানুষের বিছানা থেকে লাবণ্য মাছি তাড়ায়। মেয়েরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, ছেলেগুলি নিশ্চিন্তে পায়ের ওপর পা দিয়ে কেউ পান চিবোতে চিবোতে, কেউ সিগারেট ফুকতে ফুকতে, যার যে রকম নেশা, দুপুরঘুম ঘুমোয়।
ধাক্কা দেওয়া শান্তিপুরি শাড়ি পরেছে লাবণ্য অনেকদিন পর। মুখে জর্দাপান দিয়ে দুপুরের জানালায় এসে দাঁড়িয়েছে। ছোটো ছোটো ধুলোর ঘূর্ণি উঠছে মাঠে, পাঁচিলের খুঁটের ওপর ধুলোর সর, তিড়িংবিড়িং বিড়িং নাচছে শালিখ, একটা দুটো তিনটে চারটে। নোদল গোল হেঁটে বেড়াচ্ছে গোলা পায়রা। কী খুঁটে খাচ্ছে তা সে-ই জানে, গাছের ডালে ঘুঘুর গলায় রামধনু চিকমিক করছে, ওপর ডালে দুপুর কাক, সহসা ডাকছে না, মাঝে মধ্যে আকাশপানে গলা তুলে হাঁ-এর মধ্যের টুকটুকে লাল রং বার করে বলে উঠছে খ্যাঁ, খ্যাঁ, খ্যা-অ্যা। গলা দিবিব সুরে বলছে। ধুলোর মধ্যে সবুজ কাচের চুড়ি দুলিয়ে, ছেড়া ফ্রক ঘুরিয়ে খেলা করে বেড়াচ্ছে সোনাবাতি। পিঠে বোম নেই। সোনারঙের পিঠের ওপর অনেকদিনের নোংরার জালি। সোনারঙের জট পাকানো চুলগুলি কিলবিল করছে মাথাময়। পান চিবোতে চিবোতে জর্দার রসে নেশা ধরে। ডলপুতুল নিয়ে লাবণ্য কখনও বুকে আঁকড়ায়, কখনও বালিশে শোয়ায়, রান্নাবাটি নিয়ে সারা দুপুর খেলে, আবার মাথার চুল সামনে ঝুলিয়ে হাতের ওপর চাবির গোছা নিয়ে এতোল বেতোল, তামাক তে-তোল করে। লাবণ্যর চারপাশে খেলে বেড়ায় সাদা ফ্রক, হলুদ টিপ ছাপ, ছোটো ছোটো চুলে হলুদ কিলিপ, খিলখিলিয়ে হাসে। লাবণ্য ঘুমচোখে আলমারি খুলে সেই ফ্রকটি বার করে, সেই পুতুলটি বার করে, করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। সোনাবাতি প্রথম হেমন্তের দিনে সে বছর গোটাগুটি একটি ফ্রক পায়। একটি পুতুল পায়। একটি নীল গলাবন্ধ সোয়েটারসুদ্ধ পেয়ে যায়।
কাসুন্দের মাঠের দিন এ শীতে অন্য রকম। রাতও তেমন রাত নয়। গভীর রাত পর্যন্ত তাসখেলা চলে। এই সেদিন সত্যনারায়ণের শিন্নি হল। চরণামিত্তির খেয়ে, শান্তির জল নিয়ে লাবণ্য নিজের হাতে কাঠের হাতায় শিন্নি খুঁটল। দুপুরবেলা বাপের ঘরে বসে গল্প করছে বউ-ঝিরা। মানুষটি কথা বলতে পারে না, চেয়ে চেয়ে দেখে। চোখের কোলে খুশি। লাবণ্য কুঠরি থেকে বেরিয়ে এসেছে। সারাদিন দৌড়ঝাঁপ করে কাজ, নাতিনাতনিদের গল্প বলা … দত্যি ছিল সত্যি সত্যি!
রাক্ষসে আর দৈত্যে কি তফাত দিদুম?
বাপরে! কী একটা তফাত? রাক্ষসের দাঁত দু-পাশ থেকে হাতির মতন বেরিয়ে থাকে। দত্যির দাঁত মুখের মধ্যে নুকুনো। রাক্ষসের মাথায় দুটো শিং। দত্যির মাথায় একটা। শিং ঢাকতে দত্যি কান মাথা ঢাকা টুপি করে, মানুষের মধ্যে বড়োসড়ো মানুষটা সেজে ঘুরে বেড়ায়।
ও ঠাকুম, রাক্কসের গায়ে বেশি জোর না খোক্কসের?
বলা কঠিন বাপু, তবে খোক্কসের পা ছিনে-পড়া, রাক্ষসের পা গোদা গোদা, ভীমের গদার মতো, এখন বুঝে দ্যাখো।
বহুদিন আগেকার হাওয়া-খাওয়া পোর্সিলেনের মেমপুতুল, কুকুর নিয়ে বেড়াতে যাওয়া সাহেবপুতুল, ক্রুশের ওপর যিশুপুতুল, কাচের টাঙাগাড়ি, পুতুলের জুতো, যক্ষির ধন সব লাবণ্য বার করে দেয়। মায়েরা বলে, সাবধানে খেলো, মায়ের যতুকের জিনিস সব। কোনো কোনো মা আবার ছেলেমেয়ের অনেক আপত্তি ও কান্নাকাটি সত্ত্বেও সেসব পুতুল তোয়ালে মুড়ে সুটকেসে তুলে রাখে। এসব জিনিস আর আজকাল পাওয়া যায় না। অ্যান্টিক হয়ে গেছে। জামাইরা বোদ্ধার গলায় বলাবলি করে। কে কী বলল, কার জিনিস কমনে রাখল, লাবণ্যর আর হুঁশ নেই। কদ্দিন আর জিনিস তাংড়াবে? জিনিস বলতে এক আলমারি দুমূল্য সেকালের কাচ পাথরের পুতুল, কাঠের, লোহার খেলনা সব, ন্যাপথলিন কালো জিরে-শুকনো লংকা দিয়ে জিইয়ে রাখা ছোটো ছোটো কাপড়জামা। লেপ কাঁথা, তা ছাড়া আলমারির গুপ্ত খোপে ছোটো ছোটো চুড়ি-বালা-মটরমালা-আংটি মাদুলি। যার জিনিস তার ছাড়া কারও অঙ্গে ওঠেনি। খাওয়া-দাওয়ার পর সকড়ি-কাপড় ছাড়ার হাঙ্গামা লাবণ্য এদানি করছে না। দুপুরঘুমের স্বপ্নটুকু লেপে পুঁছে একাকার। দরজায় হুড়কো তুলে দিয়েই জানালার কপাট খুলে দেয়। ছিট ছিট ফ্রক। নীল সোয়েটার ভাঙা রিকশার খোঁদলে পুতুলের সংসার পেতেছে। রামধনিয়া ডাকে, এ সোনাবাত্তি, পানি দিবি না? জানকি হাঁকে, সোনাবাত্তিয়া-আ আটা ডলবি নাই? সাড়া মেলে না। কেমন নিবিড় নিশ্চিন্দি খেলা দেখো! খাওয়া নেই দাওয়া নেই। সারাদিন গুলি খেলা, ঘুড়ি খেলা … পুতুল খেলা। পুতুলের বালিশবিছানা, হতাশক মশারি সুষ্ঠু মায়ির সাবেকি আলমারির গহ্বর থেকে বেরিয়ে এসেছে। এ মায়ি বহুত দোয়া আছে। হাঁ! টইটই করে শীতের মাঠ চষে বেড়ায় দুখানি পাতলা পাতলা খালি পা। খালিপায়ে ঘুন্টি দেওয়া লাল জুতুয়া দেখতে সাধ যায়। গোলাপি মোজা। গোলাপি টুপি, কান-ঢাকা, ডগা উঁচু, কানাঅলা, কতরকম, কত্তরকম দেখতে সাধ যায়। লাবণ্য জানলার গরাদ ধরে সারা দুপুর একবার পরায়, একবার খোলে। একবার খোলে, একবার পরায়। তার গলা ধরে মিষ্টি মিষ্টি দুটি হাত সারা দুপুর দোল খায়, শুকনো গালে, কপালে, চিবুকে মিটি দেয়। লাবণ্য স্বপ্নহীন অঘোর ঘুমে ঢলে পড়ে, ঠোঁটের কোনা চিকমিক করে।
