ঠিক দুপুরবেলা লাবণ্যর তিনবারের চান সারা। সকালে পুজোর আগে একবার, রুগি চান করানোর পর গু-মুতের ছোঁয়া দেহখানিকে ঝামা দিয়ে ঘষে ঘষে দু-বার, ভাত খাওয়া সকড়ি কাপড়টি ছাড়ার পর তিনবার। সেরে লাবণ্য যখন ঘরে ওঠে তখন মাথার ওপর তিনটি-চারটি চিল ঘোরে, ঘুরে ঘুরে কীসের নেশায় অনেক ওপরে উঠে যায়, লাবণ্যর লম্বা গরাদের জানলার ফ্রেমে কাটাকুটি খেলতে থাকে, চিলের হেষা অনেক মিটার উঁচু শূন্যের পাহাড় থেকে ঝাঁপ খায়, ভাসতে ভাসতে সোজা পৌঁছে যায়, লাবণ্যর বুকের কুঠরিখানিতে। লাবণ্য একখানা রাক্ষুসে-ঢেউ সুমুদুরে কলার ডোঙার মতো ওলট-পালট খায়। ভাসতে ভাসতে কোত্থেকে কোথার চলে যায়, সে কি জন্মের আগের দেশ? না মরণের পরের? অ্যাত্তো বড় সমুদ্দুরে হায় এইটুকুনি প্রাণ! ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল? সাদার ওপর হলুদ টিপ টিপ খুকু-ফ্রক, পাঁকের মতো নরম, ঠান্ডা, আস্তে আস্তে শক্ত কাঠ হয়ে যায়, ভাসতে ভাসতে অকুল সমুদ্দুরে কোথায় যে চলে যায় এলোচুল আধপোড়া শিশুর মড়া এক! শীতদুপুরের ঘুমের চটকা মাছির ভ্যানভ্যানানিতে ভেঙে যায়। লাবণ্যর শুকনো চোয়ালে চোখের জলের নুনটুকু শুকিয়ে আছে, তারই ওপর মাছির লালচ। তারই জন্য লাবণ্যর সমুদ্দুরের শেষটুকু দেখা হয় না। উঁচু হাড়ে চাপড় মেরে ভুরু কুঁচকে লাবণ্য বলে, মর মর, গুয়োর বেটা মর। পরক্ষণেই আকাশমুখো হয়ে বলে ওঠে, ষাট, ষাট, ষাটের বাছা-ষাট!
যে ছেলেটির ঘরে বিছানা থাকায়, ছাঁইদানি থাকায় ঘরটি চিরজন্মের মতো বাসি এঁটো হয়ে গেছে সেটি লাবণ্যরই সন্তান। তবে অভাসের সন্তান। সন্তান বস্তুত অনেক প্রকার। বিস্ময়ের, আনন্দ-আকাঙক্ষার, আগ্রহ ও বাঞ্ছার, তারপর অভ্যাসের, উদাসীনতার। পরন্তপ তাই তার বাপ-মার অভ্যাসের সন্তান। কিন্তু যতই হোক পুরুষ ছেলে তাই সাতটির পর আটটিতেও পরন্তপের ঠাকুমা পুজো দিয়ে ঘটাপটার অন্নপ্রাশন করলে। মা-ঠাকুমার দু-তিন আলমারি কাপড়চোপড়, তিন চারখানা বিছানা বালিশ ওইটুকু ছেলে তার দাদাদেরই মতো হুলুট থুলুট করতে থাকায় লাবণ্য—তখন উত্তরতিরিশ-ধমকালে, ছেলের বাবার কাছ থেকে চোপ, ঠাকুরমার কাছ থেকে চোখরাঙানি খেয়ে-টেয়ে ভুরু কুঁচকে ঘর ঝাড় দিতে চলে গেল।
চার-পাঁচটি ছেলেমেয়ে উড়ো খইয়ের মতো দেশবিদেশে ছড়িয়ে আছে, কে কোথায়, কমনে অতশত লাবণ্যর আজকাল হুঁশ থাকে না। তাদের বাপের, তাদের ঠাকুমার থাকুক গিয়ে। ঠিকুজি, কুলুজি, জ্ঞাত-গোত্তর, আর পারি না বাবা! মাঝে মাঝে এসে সব হাঁকডাক করে নিজেদেরই গরজে। ছেলে কটির হাঁকডাকে লাবণ্য আজকাল ঘাবড়ায় না, বাড়িটি তার স্ত্রীধন এবং সে কাগজ আলমারির ভেতর খোপে ভেলভেট বাক্সয় ভোলা আছে এইটুকু বুঝে। মেয়েগুলি বলে, মা আমাদের দেখতে পারে না। আরও বলে তাদের দারুণ জামাইরা, বউরাও অমন মা জন্মে দেখিনি। লাবণ্যর কানে এসব কথা যায় কি না যায় বলা যায় না। কারণ তার ভেতর বাড়ির নিরমিষ্যি হেঁসেলে সে প্রাণ গেলেও কারুকে ঢুকতে দেবে না। এসো, থাকো, খাও, মাখো। সব ওদিকে। এদিক পানে ঘেঁষতে এসো না। মেজো মেয়ে অন্নপূর্ণা বলে, মা আমি চান করে, খেটের কাপড় পরে আজ তোমার রান্নাটা করে দিই? মা শুধু ভুরু কুঁচকে তাকায়। মনে মনে বলে, মরি মরি! এতো ভাগ্যি আমার কোথায় ছিল মা এতগুলি দিন। বলি খেটের কাপড় যে পরবে, তোমার শরীরের কাঠামোখানি শুন্ধু যে অশুদ্ধ স্লেচ্ছসঙ্গ করে করে সে কথা কি মনে রেখেছ মা? মেজো জামাই, যার সুটপরা গায়ে গোবরগোলা গঙ্গাজল ঢেলে দিয়েছিল লাবণ্য মুরগি খেয়ে আসায়, সে আসে না যদিও।
বর্ষার বিকেলে কাসুন্দের মাঠ যখন জটাইবুড়ি হচ্ছে ধীরে, সন্ধে যেন ঘোলা জল, বাতাস যেন ধোঁয়া, মাটি থেকে আঁশ গন্ধ, যখন জানকি হাঁকে, মায়ি, হে মায়ি। ঘুঁটে লিবি নাই? সুখা খুঁটে! কুঠরি থেকে লাবণ্য কচ্ছপের মতন মুখ বাড়িয়ে দেখল পরন্তপের বউ এখনও আপিস করে ফেরেনি। খুঁটেউলি ছুঁটে সাজাতে আরম্ভ করে দিয়েছে, গিনতি করে লিন মা। দো … চার … ছে … আঠ…।
জানকির কোমরের কাছে এক কন্যে।
অ বউ, তোর কোমরের কাছে ঘুনশির মতো ওটা কে রে?
হমার নাৎনি আছে মা।
তোর আবার মেয়ে কবে হল যে নাতনি?
হাঁ মা। দেহাতে থাকে, ঢোলিসাকারা, মনহরপট্টিয়া, মায়ি। খরা হল, হাঁতিয়া হল না, ঘঁনুয়া ধান ভি উঠল না-ই। গরমেন্টের ডোল ভি মিলল নাই। পাঁচটা, ছেটা আন্ডা বাচ্চা, ইটাকে হমার পাস ভেজ দিয়েছে। হাঁ।
কী নাম রে?
হাঁরে, নাম বোল না তেরি। এ মায়ি বহুত দোয়া আছে।
কন্যেটি ক্রমশই জানকির বিশাল কোমরের পেছনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে থাকে।
ও নুকুচ্ছে কেন রে বউ? থাক বাবা, নাম জিজ্ঞেস করব না আর, নুকুসনি।
জানকির কোমরের পেছন থেকে মিহি গলায় আওয়াজ আসে, সোনবত্তিয়া।
কী বললি? কী পাতিয়া?
সোনবত্তিয়া, সোনাবাতি হুজুর, জানকির হাসি রুপোর হাঁসুলি অব্দি ছড়িয়ে যাচ্ছে, বাপে কালো, মায়ে কালো, বিটিয়া গোরি মায়ি, ইসলিয়ে সোনাবাত্তি।
দুপুর দুটোর সময় খিড়কির দুয়ারে, পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে বাঁকারির মতো পলকা পিঠখানা উঁচু করে অতঃপর লাবণ্য ডাকে, সোনাবাতি! এই সোনাবাতি! …সোনবত্তিয়া রে-এ-এ! জানকির বাজখাঁই গলায় ডাক লাবণ্যর মিহি ডাকের সঙ্গে মিলেমিশে যায়, ঠিক যেন মাঝদুপুরে নি-হাওয়ার দেশ থেকে চিলের ডাক ঝাঁপ খেয়ে পড়ছে কাসুরে মাঠে। ক্রমেই জোরালো হচ্ছে, গাছপালায় ধাক্কা খেতে খেতে ছড়িয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ছড়িয়ে যাচ্ছে দূরে-দূরান্তরে। আনাচকানাচ সব ভরে যাচ্ছে। সোনবত্তিয়া … সোনাবাত্তি রে-এ-এ-। হাওয়ার সমুদ্র থেকে জলের সমুদ্র, বহু দুঃখের জল বা স্বপ্নের ফেরে বারংবার দেখা যায়, সেই জলের উথাল ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে একখানি ছোট্ট ডিঙি শেষ পর্যন্ত ডাঙায় এসে লাগে। ছোট্ট লাফ লাফিয়ে নামে একটি এক বুক আগ্রহ আকাঙক্ষা ও ভালোবাসার সন্তান।
