খুব ভোরে বরফ-ঠান্ডা পাতকোর জলে চান সেরে নেয় লাবণ্য। ধোপাবাড়ির কাচা কস্তাপেড়ে শাড়িখানা ঘরের কলে জলকাচা করে কুঁচিয়ে আলনায় রাখা থাকে। ভিজে কাপড়ে শানের মেঝেতে গোটা গোটা পায়ের জলছাপ ফেলতে ফেলতে ঘরে গিয়ে সেই শাড়িখান আদুল গায়ে জড়ায়, পুব আকাশে রঙছোপ লাগাবার আগেই ফুলতোলাটি সারতে হবে নইলে ফুলের ওপর শিশির শুকিয়ে যাবে, আকাশের জলে ধোয়া ফুল ব্যাভার না করা মানে আধোয়া, অশুদ্ধ ফুলে পুজো করা। অমন পুজো কি না কল্লেই নয়? তা ছাড়া মোটাসোটা লাটিমের মতো এক ন্যাশ বাচ্চা আছে। উঠলেই খলখলিয়ে গাছ ছোঁবে, ফুল ছোঁবে। লাবণ্যর কাপড়চোপড় হাত-পা, হাড়-চামড়া, বাগানের মাটি, ঘরের শান, সবসুদ্ধ এড়া বাসি হয়ে যাবে। তাই এই পাখ ডাকার আগে উষা ভোরে ফুল ক-টি পেতলের সাজিতে তুলে ফেলা। লাবণ্যর পুজোর সময় ঠাকুরঘরের আগল দেওয়া থাকে। সারা বাড়ি তোলপাড় করে এই সময়ে জাম্বো, এত্তখানি বাচ্চাটা। করে-টরে ঠাকুরঘরের দরজায় কান পেতে হাসে। এত শয়তান! মা শোনো, বাবা শোনো, ঠাকুমা পুজো করছে না হাতি করছে। কার সঙ্গে ঝগড়া করছে দ্যাখো। বউটি বকে। বকে-টকে কুল না পেলে শেষে কুতূহলী হয়, দরজায় কান পেতে সেও দাঁড়িয়ে পড়ে। বাস্তবিক! কথা স্পষ্ট বোঝা যায় না। কিন্তু যে লাবণ্যর সারাদিন মুখে রা থাকে না ঠাকুরঘরের মাঝ-মধ্যিখানে সে যেন কার-না-কার সঙ্গে ধুন্ধুমার ঝগড়া লাগিয়েছে। এ তো আর সেকাল নয় যে, বউ বিশ্বাস করে বসবে যে ঠাকুরঘরের বালগোপাল কি রক্ষেকালী জ্যান্ত হয়েছেন, আর তাঁরই সঙ্গে মানুষটির ভাবের বচসা!
পরন্তপ! পরন্তপ! ফল-বাতাসা নিতে সরু গলায় ডাক দেয় লাবণ্য সারাদিনের মধ্যে এই একটিবার। ভেতরবাড়ি থেকে বারবাড়িতে সে ডাক পোঁছুতে সময় লাগে। রাঁধতে রাঁধতে বউটি এসে দাঁড়ায়। জাম্বো এসে চট করে পা ছুঁতে যায়। ছুঁসনে, ছুঁসনে, যাঃ। ছুঁলি তো? কি বেয়াড়া ছেলের রীত বাবা, বাসি হেগো মানবে না, চোপর দিন আগাড়ে-ভাগাড়ে ঘুরছে। গজগজানি ক্রমে বেড়ে যেতে থাকলে বউটি বলবে, আপনার পুজো তো সারাই মা, চান করে ছুঁয়েছে বই তো নয়, আর ছোঁয়াও তো নয়, পেসাদ খেয়ে পেন্নাম। ওরও তো সাধ যায়!
লাবণ্য রাগের গলায় বলে, চান করা তো কি! বাসি কাপড়ে আলনা থেকে জামা-কাপড় নিয়ে কলঘরে যায়নি?
বউ বলে, না তো মা, আমিই তো কাচা-কাপড়ে দিয়ে এলুম।
তোমার ঘরে বিছানা পাতা আছে না? যে ঘরে চোপর দিন বাসি বিছানা, ছাড়া কাপড়, সিগ্রেটের এঁটো ছাইদান সে ঘরের কাচা কাপড় কি আদপেই কাচা কাপড় বউমা! সে যাক। ছুঁয়েছে তো ছুঁয়েছে এখন আর পেসাদ খাব না।
বউটি বলে, কোন ভোরে উঠেছেন মা, এখুনি তো আবার রুগি নিয়ে পড়তে হবে। কিছু মুখে দেবেন না? ছি, ছি জাম্বো, কি করলি বলতো?
উদাস গলায় লাবণ্য বলে, বকো না, ছেলেমানুষ। একটা দিন একটু বেলা করে খেলে আমার পেট ক্ষয়ে যাবে না। যাও, কাজে যাও।
বললে পেত্যয় যাবে না। রোগা হাড়ে ওই অতখানি রুগীটিকে লাবণ্য একলা সামলায়। মানুষটি রোগে ভোগে এখন ঝরে গেছে, সেকথা ঠিক। কিন্তু হাড়ের কাঠামোখানা যাবে কোথায়? আড়েদিঘে সে তো পেল্লাই? তার ওপর অঙ্গ পড়ে গিয়ে কবজায় কবজায় জং ধরে গেছে। অঙ্গগুলির মধ্যে সাড়া যেমন নেই তেমন প্রাণটিও তো নেই! মরা হাত-পায়ের ওজন কি কম? লোকটির মা এই ক-বছর আগেও বেঁচেছিল। ডাক্তারের ঘরের মেয়ে, লাবণ্যকে বুঝ দিত, ভয় কি বউ? বাঁ অঙ্গ গেলে বাঁচে না, পইতে কাটার মতো বাঁয়ে ডাইনে পড়লে ক-ঘন্টাতেই রুগি সাবাড়, কিন্তু ডান অঙ্গ পড়লে তোমার রুগি টিকবে বছরের পর বছর, বছরের পর বছর। কত পুণ্যি করবে, করো না।
তা সেই পুণ্যিই আজ এগারো বচ্ছর করছে লাবণ্য। পুজোটি সেরে রুগির ঘরে ঢোকে। এককালের তাপের দাপের মানুষটি তখন হাঁ করে বাঁ কাতে ঘুমোচ্ছে, মুখের দু কষ বেয়ে লাল গড়িয়ে গড়িয়ে বালিশ আধভিজে। তার ওপর ভিন ভিন করছে পুঁয়ো মাছি। বেডপ্যান, চান করার গামলা, গরম জলের বালতি, বোরিকের পাউডার, ফতুয়া, লুঙ্গি-সব জোগাড়-যন্তর সারা হলে লাবণ্য গলা খাঁকারি দেয়। তারপর মানুষটিকে চাগিয়ে ধরে কাজকর্ম সারে। এ সময়ে তার মুখের ভাব পাথরের ঠাকুরের মতো হয়ে যায়।
সাতকোশ আটকোশ রিকশা চালিয়ে এসে গরমের দিনে গামছাখানা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছে রামধনিয়া।
বহু, এ বহু, রুটি গড়বি নাই? ডাল পাকাবি নাই?
জানকি তখন মনের সুখে ঘঁটে দেওয়া শেষ করে গুল দিচ্ছে। আশপাশের বাড়ির অর্ডারি গুল। কয়লার ঘেঁস, পড়ো জমির মাটি, ঘন থকথকে ফ্যান, মেখে মেখে ছোট্ট ছোট্ট গুল। ধাঁই ধাঁই করে আঁচ উঠবে, শাঁইশাঁই করে রুটি ফুলবে। হাজার গুলে পাঁচ টাকা রেট। জানকির খানা-পাকানোয় মন নেই। যত গুল দেবে তত টাকা, যত খুঁটে দেবে তত টাকা, তত খাড়, তত ছাপের কাপড়, তত কাচের চুড়ি। দেশে ঘরে জোওয়ার আছে, ডহর আছে, মকাই আছে, খাও না। রামধনিয়া বেশি গালিগালাজ করলে এক সময় জানকি বোম্বাই ফজলির মতো মুখখানা ঘুরিয়ে হাতের কয়লা, গোবর পাছ-কাপড়ে মুছে টিউকলে হাত পোয়, মুখ ধোয়, চুলের খাঁজ থেকে চারটি উকুন বার করে টিপ করে ধরে মারে। তারপর কানা-উঁচু কলাইয়ের সানকিতে ছাতু মাখতে বসে।
