কাকিমা কেঁদে উঠলেন, কী হল? কী হল? শান্তা এ কী ওঁর পা এমন ঠান্ডা কেন? অজ্ঞান হয়ে গেলেন, না কী? কী হল, বুঝতে পারলুম, কিন্তু কোন প্রাণে বলি? ওঁকে সান্ত্বনা দিতে নিজের চোখের জল সামলে ঠান্ডা সাদা পা ঘষে ঘষে গরম করবার চেষ্টা করতে লাগলুম। সুশান্ত ডাক্তার এবং অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ফিরল। ডাক্তার ওঁর ডান হাতখানা একবার তুলে ধরেই নামিয়ে রাখলেন।
এমনি করেই শেষ হয়ে গেল কয়েক বছরের সুন্দর সম্পর্কের গল্প। বেচারি কাকিমা! খালি বলেন, জল খাবার জন্যে অমন তেড়েফুঁড়ে উঠতে গেল বলেই বোধহয় প্রাণটা বেরিয়ে গেল, না? জলটা বোধহয় গলায় আটকে গিয়েছিল। না? কীভাবে শোকার্ত মানুষটিকে বোঝাই যে বিশাল হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, তার থেকে পরিত্রাণ পাবার কোনো আশাই ছিল না কাকাবাবুর।
শ্রাদ্ধ-শান্তি হয়ে গেছে। কাকিমা একদম একা। ওঁর বড়ো মেয়ে কলকাতায় থাকেন, তিনিই আপাতত ওঁকে নিয়ে যাবেন। বাড়ির বিলিব্যবস্থা হচ্ছে। ওঁর অন্য দুই মেয়েও উপস্থিত। সবাই মিলে গোছগাছ চলছে। আমিও রোজ সন্ধ্যেয় বাড়ি ফিরেই যাই। যতদূর সম্ভব সাহায্য করি। দিন কয়েক পর। পরদিনই কাকিমা চলে যাবেন, মনটা বিহ্বল হয়ে রয়েছে, কাকিমার বড়ো মেয়ে একটা সুন্দর লালপাড় শাড়ি আমার হাতে তুলে দিলেন, কাকিমা বললেন, শেষ সময়ে মুখে জল দিলে একটা শাড়ি দিতে হয় মা আমাদের, নাও। শেষ সময়ে? মুখে জল? সহসা শেষ দিনের শেষ দৃশ্যটা নির্মমভাবে ঝলসে উঠল আমার চোখের সামনে। বাকরোধ হয়ে গেছে, চোখ ঠিকরে আসছে, কাকাবাবু তাহলে ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন মহাকাল সামনে। বিদ্যুচ্চমকের মতো এক লহমায় আমি সমস্তটা বুঝতে পারলুম। গলা বুজে আসছে, শাড়িটা ফেরত দিয়ে বললুম, আপনি ভুল দেখেছেন কাকিমা, শেষ জল দেবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। জলটা উনি নিজে নিজেই খেয়েছিলেন।
পরলোকের আধখোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গতি সম্পর্কে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন আজীবন শক্তির পূজারি। শূদ্রাণীর হাতের জল পান করবার ঝুঁকিটা কিছুতেই নিতে পারেননি।
মড়া
বড়ো কৌটোর মধ্যে মেজো কৌটো, তার মধ্যে সেজো কৌটো, তার মধ্যে ন, তারও মধ্যে কোণে সেই একরকমের এক ম্যাজিক চিনে-কৌটো আছে না? খুলতে খুলতে খুলতে খুলতে শেষমেশ এক ফোঁটা এক কৌটো বেরোয় তার ঢাকনি খোলে কি খোলে না, যদি বা খোলে তার মধ্যে কিছু আছে কি নেই, শুধু চোখে ঠাহর হয় না। ঠিক তেমনি কাসুন্দের মাঠ, মাঠের মধ্যে বাগান, বাগানের মধ্যে বাড়ি, বাড়ির মধ্যে ঘর, ঘরের মধ্যে লাবণ্য, লাবণ্যর বুকের মধ্যে কুঠরি। কুঠরির মধ্যে সত্যিকার লাবণ্য থাকে কি থাকে না লাবণ্য নিজেই জানে না। দরকার মতো ভেতর থেকে মরা সোনার জোড়াচুড়ি পরা নীল শিরা ওঠা সাদা সাদা দু-খানা হাত বেরিয়ে আসে। কাজ সারা হলে হাত দু-খানি গুটিয়ে-সুটিয়ে আবার কুঠরি-সই। হয়।
বাইরের দিক দিয়ে একটি ছেলে একটি বউ আর এতখানিক এক বাচ্চা আসা যাওয়া যাওয়া-আসা করে। ছেলেটিকে আপিসের ভাত দেয় বউ, দিয়ে নিজে খায়, বাচ্চাটিকে খাওয়ায়। তারপর ওইদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। সাইকেল রিকশায় বাচ্চাকে স্কুলে নামিয়ে উভয়ে ইস্টিশানের পথ ধরে, অনেকখানি রাস্তা।
দিনমান শুনসান। মাঠের মধ্যে কত্তকালের বাগানবাড়ি। জন নেই, মনিষ্যি নেই, কে-ই বা আসবে আর কেনই বা আসবে? কারোই তো এদানি দরকার পড়ে না বিয়েতে ছিরি গড়বার কি পিঁড়ে আলপনা দেবার, মচ্ছবের লাফরা রাঁধবার কি ষোড়শের দান সাজাবার! নেই কাজ তো খই ভাজ এহেন লোকই বা কই যে কেউ একজন যে-কেউ একমুখ আহ্লাদে হাসি হেসে ভেতর দালানে এসে উঠবে, লৌকিকতার সন্দেশটি খেয়ে গেলাসের জল নিজ হাতে গড়িয়ে নিতে হবে, এঁটো রেকাবি গেলাস দাওয়ার তলায় নিজ হাতে নামিয়ে রাখতে হবে একথা জেনেও? লাবণ্য তো এঁটোকাঁটা কুঁজোয় হাত দেবে না, লৌকিকতার থালা গেলাসগুলি চুলেও অবেলায় চান করে মরতে হবে। সুতরাং দিনমান শনশনে হাওয়ায় দরজা নড়ে, জানলা নড়ে, পুরোনো কবজায় তেল না দেওয়া গোরুর গাড়ির চাকার আওয়াজ ওঠে। গরমের দিনে মাঠের বুক থেকে ভাপ ওঠে, ধুলোর ঝড় ওঠে, কুঠরির চারপাশে পেতনির কান্নার মতো শব্দ করে করে ঘোরে। শীতের দিনে রুখুরুখু উত্তুরে বাতাস দেয়। বাড়ির ঝনকাঠটার সুষ্ঠু চোখ শুকোয়, মুখ শুকোয়, ঠোঁট ফাটে, বুক ফাটে। আওয়াজে ভয় পেয়ে কোণের ঘর থেকে একটি রুগিমানুষ জড়ানো গলায় ডাক পাড়তে থাকে, ডাকতে ডাকতে গাল পাড়ে। গালিগালাজে জীবনভর অভ্যেস, গালিতে এযাত্রা আর কুলুবে না বুঝে শেষে গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদে। ঘরের মধ্যে থেকে একচোখ ঠান্ডা চাউনি দিয়ে লাবণ্য রুগির শয্যাটুকু দেখে। হাত বাড়িয়ে উত্তরে জানলাগুলি বন্ধ করে দেয়। দেওয়া হলে হাত দুটি গুটিয়ে-সুটিয়ে আবার যেখানকার জিনিস সেখানে।
মাঠের এপারে যদি বাড়ি তো ওপারে পেছন বাগে দেখো এক পড়ো পাঁচিল। পাঁচিলের ওধারে কাদের জমি। দেখেও না, শোনেও না, আসা-আসির তত্ত্বতালাশির বালাই নেই। জমি ভরে শনশনিয়ে চিরণ গাছ, গাব গাছ, মহানিম, কদম্ব, পুটুস ঝাড়। শেয়ালকাঁটা, পাথরকুচি। গাছে গাছে, লতায় পাতায় গাছে আগাছায় জড়াজড়ি। রাজ্যির আবর্জনা সাতখানা পাড়ার লোক এইখানে বেওয়ারিশ জমি পেয়ে ফেলে যায়। ফুটো হাঁড়ি, মেটে কলশি, ডেও-ঢাকনা, ল্যাজামুড়ো ভাঙা কল। উলুরিধুলুরি কাঁথা মাদুর, কহতব্য নয় এত জঞ্জাল। সব জঞ্জালই শেষে মাটিতে টেনে নেয়। নিয়ে তার ওপরে এটা ওটা সেটার চারা বানায়। কীসের চারা? দেশঘরের লোকজন দু-বেলা তাদের নিয়ে ঘর করলেও নামধাম জানে না, ধার ধারে না। উদ্ভিদবিদ্যার লোক পাতা দেখে, ফুল ছিঁড়ে, ফল চিরে, বিদঘুঁটে এক বিদেশি নামের নামতা হাঁকতে পারে, তাতে কার দরকার? ভাঙা পাঁচিলের একধারে রিকশা ভাগাড়, আর একদিকে গুটিকয় গোটা রিকশার আস্তাবল। খান দু-চার হোগলার ঘর গেরস্তি। নি-মালিক ভাঙা পাঁচিলে বছরভর ঘুঁটে ভটভট করে। গোবরের সঙ্গে মাটি, তার সঙ্গে বিচালি মিশিয়ে খাস্তা খাস্তা নানখাটাই সদৃশ ঘুঁটে গড়ে পাঁচ আঙুলের ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া থাবায় রামধনিয়ার বউ জানকি বাই। আপাতত জানকিও নেই। বাইও নেই। ঘুঁটেউলি। এক পা গোবর, এক হাত খাড়, লাল-নীল-বেগুনি-সবুজ ছাপের কাপড় খালি গায়ে জড়িয়ে, গলায় ইয়া মোটা রুপোর হাঁসুলি, বহু সেই ডাকেই বহুত খুশ আছে। হাঁ! তার রুখুসুখু লাল চুলের খাঁজে খাঁজে ধুলো, মোটাসোটা মুখের ভাঁজে হাসি ধরে না।
