না, তোলা থাকে, পুজো-টুজোর সময়ে বার করে পরি, ময়লা হলে কাচি।
আমি বললুম—এটার কিন্তু কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। পবিত্র মানে যা একেবারে পরিষ্কার। সাবান দিয়ে কাচা কাপড় যত শুদ্ধ, তুলে রাখা সিল্ক কাপড় কি তত শুদ্ধ হতে পারে? কাকিমা বললেন, নাও এবার কী জবাব দেবে দাও। সরস্বতীর সওয়াল এ। শক্ত ঠাঁই। কাকাবাবু বললেন, সুতিবস্ত্রে যত সহজে ময়লা লাগে, তসরে তত সহজে লাগে না মা। অবশ্য তুমি ঠিকই বলেছ, ব্যাকটেরিয়ার কথা ভাবতে গেলে পরিষ্কার সাবান-গরম জলে কাচা বস্ত্রই শুদ্ধ। তবে কি জানো মা, শাস্ত্রের অনেক বিধানের পিছনেই কিন্তু যুক্তি আছে। যুক্তিগুলো কালের প্রভাবে হারিয়ে গেছে। আমরা অন্ধের মতো আচার বলে পালন করে যাই সবাই। যেমন তুলসী গাছকে পবিত্র বলা হয়ে থাকে। বাড়িতে তুলসী রাখার নিয়ম। আমি শুনেছি তুলসীর অক্সিজেন উৎপাদন করার ক্ষমতা অন্য গাছের থেকে বেশি। তা ছাড়াও তুলসী ওষধি। বহু রোগের নিরাময়ের উপায় আছে তুলসীর পত্রে, ছালে। বাড়িতে সব সময়ে যদি একটি ওষধিবৃক্ষ থাকে গৃহস্থের কত সুবিধে বলো তো?
আমি হেসে বললুম, বুঝলুম। নিশ্চয়ই তুলসী-ভক্তির পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে। কিন্তু আমি যদি চান করে পরিষ্কার শাড়ি পরে, না হয় তসরই পরলুম, আপনাকে বেঁধে দিই আপনার না খাওয়ার কোনো শাস্ত্রীয় বা বৈজ্ঞানিক কারণ থাকে কী?
চোখ বুজিয়ে কাকাবাবু স্মিত মুখে বললেন, যা দেবী সর্বভূতেষু অন্নরূপেণ সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ। আমি কারও হাতে খাই না মা, শাস্ত্রীয় অন্ধতাই হবে হয়তো, কিন্তু অভ্যাস হয়ে গেছে, তবে তুমি আমার মা, তোমার যখন এত আগ্রহ নিশ্চয়ই খাব।
আমার মনের ভেতরটা আলোয় আলো হয়ে গেল। চান করে, বাড়িতে থোয়া সাদা কাপড় পরে বেঁধে দিলুম, খেতে বসে আমার দিকে চেয়ে বললেন, তোমার খুব আনন্দ হচ্ছে, না মা?
আমি শুধু হাসলাম। উনি বললেন, আনন্দরূপং যদ্বিভাতি… আনন্দই ঈশ্বর। আমাকে খাইয়ে যদি তুমি আনন্দ পাও মা, তো সেও একরকম ঈশ্বরকেই পাওয়া। তোমার সেই পাওয়ার উপলক্ষ্য হতে পেরেছি বলে আমি ধন্য।
মনে মনে ভাবি আমিও ধন্য, এমন একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণের দেখা পেলুম যিনি আবেগের বশেই অব্রাহ্মণ-কন্যাকে মানুষের অধিক সম্মান দেননি, মনেপ্রাণে যিনি আচারবিচারের ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে, সত্যিকারের শ্রেয় লাভ হলেই মানুষ এমন হয়। বিজ্ঞানশিক্ষার বাইরেও হয়।
কাকাবাবুর মধ্যে আমি আমার বাবাকে ফিরে পেলুম, কাকিমার মধ্যে মাকে। ওঁরাও আমাকে মেয়ে বলে মনে করেন। কাকিমার অসুখ করলে আমি ওঁদের বাড়ি গিয়ে যতদূর পারি সেবা-শুশ্রুষা করে আসি। ওঁরা আমার কাছ থেকে সেবা নিতে কোনোরকম কুণ্ঠা করেন না।
শীতকালটাতে কাকাবাবুর হাঁপানি বাড়ে। খুব কষ্ট পান। কলকাতা থেকে আমার এক সহকর্মিণীর চেনা ভালো ডাক্তারকে সেবার আনলুম। তাঁর চিকিৎসায় থেকে উনি খুব আরাম পেলেন। কিন্তু ডাক্তারবাবু আমাকে আড়ালে ডেকে বলে গেলেন, এতদিন ফেলে রেখেছেন, চিকিৎসা করাননি কেন? এ তো কার্ডিয়াক অ্যাজমা। হার্টের অবস্থা মোটেই ভালো নয়, যে কোনোদিন খারাপ টার্ন নিতে পারে। ওষুধপত্রর ব্যবস্থা হল, খাওয়াদাওয়ার নিয়ম হল। শিশুর মতো উনি আমার সব কথা মেনে নিলেন। ওঁদের ছেলে নেই। তিনটি মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। বড়োজন ছাড়া বাকি দুজন খুবই দূরে দূরে থাকে। হার্টের কথা কী করে ওঁদের বলি! মনটা খারাপ হয়ে গেল। তবে কাকাবাবু প্রেসক্রিপশনটা হাতে করে ভালো করে দু-তিনবার পড়লেন। কিছু বললেন না।
আগস্ট মাসের সন্ধেবেলা। সারাদিন মেঘ করে আছে। ভীষণ গুমোট। বিকেলের দিকে ঠিক বেরোবার মুখে ঝমঝম করে বৃষ্টি এল। গরম কমল না। মাঝখান থেকে রাস্তাগুলো কাদায় কাদা হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে সবে গা ধুয়ে বেরিয়েছি, বিজলি চলে গেল। গঙ্গার দিকের জানালাগুলো খুলে দিয়ে একটু দাঁড়িয়েছি, আমার এক ভাসুরের মেয়ে বলে গেল, ও বাড়ির বামুনমা তোমায় সকাল থেকে খোঁজাখুঁজি করছেন কাকিমা।
কেন রে?
কী জানি! বোধহয় বামুনকর্তার শরীর ভালো নেই।
মনের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সুশান্তকে বললুম, চলো তো আমার সঙ্গে।
অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে ওঁদের দোতলায় উঠতে কাকিমার গলা পেলুম, এখন কেমন বোধ করছ? কথা বলছ না কেন?
উত্তর নেই। তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকে টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোয় দেখলুম কাকাবাবুর মারাত্মক টান উঠেছে। চোখ বেরিয়ে আসছে একেকবারের টানে। সুশান্ত সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার আনতে চলে গেল। কাকিমাকে জিজ্ঞেস করলুম, কখন থেকে এমন হয়েছে?
কাঁদো-কাঁদো গলায় উনি জানালেন, কাল রাত থেকে জ্বর, সকালে প্রায় কিছুই খাননি। খালি দুধ। শেষ দুপুর থেকেই টান উঠেছে। কাকিমা ওঁর বুকে মালিশ করে দিচ্ছিলেন। বারণ করলুম, হার্টের ব্যাপার! দেখতে দেখতে টানটা প্রচণ্ড বেড়ে গেল। ওষুধপত্র যা খাওয়ার ছিল খাওয়ালুম, জিজ্ঞেস করলুম, কাকাবাবু, কষ্ট হচ্ছে খুব? একটু ধৈর্য ধরুন, এক্ষুনি ডাক্তার এসে পড়বেন। বললে কী হবে, দেখছি বুকটা ওঁর হাপরের মতো ওঠানামা করছে। অনেক কষ্টে বললেন, জল, একটু জল। কাকিমা তাড়াতাড়ি গ্লাসে করে জল নিয়ে এলেন। তাঁর হাত কাঁপছে, বললেন, আমার বড্ড ভয় করছে শান্তা, তুমিই খাইয়ে দাও। আমি ফিডিং ক্যাপে জলটা ঢেলে ওঁর গলায় একটুখানি ঢেলেছি কি না ঢেলেছি, হঠাৎ উনি প্রাণপণ শক্তিতে কাপটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন। বুকে ভর দিয়ে উঠে বসেছেন। যন্ত্রণায় চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। তারপর খানিকটা জল গলায় ঢেলে দিয়েই বিছানার ওপর কাত হয়ে পড়ে গেলেন। চোখ আধখোলা, নিশ্চল।
