বাড়ি ফিরে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে আমি কেঁদে ফেললুম। জীবনে অনেক দিন পর, কিংবা বোধহয় এই প্রথম কেউ আমার বড়ো সমাদর করল, বড়ো সম্মান! আমার সব কথা শুনেছেন ওঁরা? কোন কথা? অসবর্ণবিবাহ, পিতৃকুল শ্বশুরকুল উভয়েরই অসম্মতি, তৎসত্ত্বেও জোর করে কাগজের বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে ঢুকে পড়া, স-ব? চিনেছেন আমাকে? কী চিনেছেন? কী দেখলেন যে অত আদর! আমার এতদিনের মুখের স্লানিমা, চোখের জল, অন্তরের গ্লানি সব যে একেবারে ধুয়ে গেল। কোনকালে বাবাকে হারিয়েছি। মায়ের মুখখানা দেখিনি কতদিন হয়ে গেল। বাপের বাড়ির কারুর সঙ্গে রাস্তাঘাটে দেখা হলে চোখ-ফিরিয়ে নেয়। এখানে আমি আছি যেন অনাহুত অতিথির মতো। আর এই রক্ষণশীল, ভক্তিমান দম্পতি কি না অনায়াসে বলে দিলেন, তোমাকে ঠিক চিনেছি। তুমি একাধারে লক্ষ্মী-সরস্বতী। অন্য কিছু না, কত বড়ো মন, কত স্নেহ-গড়া অন্তর হলে তবে কেউ একথা বলতে পারে!
এতদিন পরে আমার বোধহয় একটা জুড়োবার জায়গা হল। মাঝে মাঝেই যাই। ভট্টাচার্য দম্পতিকে কাকাবাবু কাকিমা ডাকি। গল্প করি। আমি আর কী গল্প করব, আমার জগতের লোকই নন ওঁরা। আমি শুধু শুনি। কাকিমার বাপের বাড়ির গল্প। শ্বশুরবাড়ির দেশের গল্প। একটা কোনো সূত্র পেলেই হল, সেটাকে উপলক্ষ্য করে উনি অনর্গল কথা বলে যেতে পারেন, সব কথা বুঝতে পারি না, তাড়াতাড়ি বলেন, তার ওপর ঢাকাই টান, কিন্তু স্নেহ আর আন্তরিকতা বুঝতে কোনো অসুবিধে হয় না। একেকদিন কাকাবাবু এসে বসেন, হেসে বলেন, কাকিমা তোমার কানের পোকা বার করে দিচ্ছেন, না? কাকিমা তখন বলেন, সত্যি! তুমি কত বিদুষী। তোমার কাছে আমি মূখ বকবক করে মরি। কিছু মনে করো না তো মা। আমি বলি, বিদুষী-টিদুষী বলে আমায় লজ্জা দেবেন না কাকিমা। আন্তরিকভাবেই বলি। বিদ্যার মূল্য কতটুকু? তা যদি ভাব দিতে না পারে?
কাকিমা একদিন বললেন, তোমায় প্রথমদিন দেখেই লক্ষ্মীঠাকরুন বলে বুঝতে পেরেছিলাম মা। উঠোনে এসে দাঁড়ালে মুখ নীচু করে কিন্তু কেমন সোজা, কোথাও কোনো মিথ্যে সংকোচ নেই। লক্ষ্মী যে! নিজের সিংহাসনে দাঁড়াতে কি মায়ের মনে সংকোচ আসে? আমি আর থাকতে পারলুম না। আস্তে আস্তে বললুম, কিন্তু কাকিমা আমাকে তো কেউ লক্ষ্মী ভাবে না। আমি তো উড়ে এসে জুড়ে বসা একটা আপদ,
লক্ষ্মী যখন কাউকে দয়া করেন, তখন সব সময়ে তাঁকে চিনতে পারবে, এত সৌভাগ্য মানুষের হয় না মা। দেখি কাকাবাবু এসে দাঁড়িয়েছেন। বললেন, লক্ষ্মী কে? লক্ষণ কী? শ্ৰী-সম্পদ যখন কল্যাণের সঙ্গে, সংযমের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই লক্ষ্মীর আবির্ভাব হয় মা। তোমার শ্বশুরগৃহে সম্পদ ছিল মা, শ্রী ছিল না, কল্যাণ ছিল না, সংযমও ছিল না। এবার হল। আমি মায়ের পূজা করি, টের পাই কখন তাঁর অকারণ কৃপা প্রকাশিত হয়। তোমার মধ্যে দিয়ে সেই কৃপা প্রকাশ পেয়েছে। বিদ্যার সঙ্গে সংযম, বিনয়, সম্পদের সঙ্গে মঙ্গল। তাই বলেছিলাম তোমাকে চিনেছি। তুমি নিজে চেনো না মা নিজেকে। মেয়েদের মধ্যে যখন শক্তির প্রকাশ হয় তাঁরা কি নিজেদের চিনে কাজ করেন?
কাকিমা আসবার সময়ে বললেন, তোমার কাকাবাবু যে তোমাকে কী চোখে দেখেছেন মা! আমাকে সবসময়ে বলেন তোমাকে যেন বিশেষ যত্ন করি।
আমি হেসে বলি, আপনাকে কি যত্ন করা শেখাতে হয় কাকিমা?
তা নয়, কিছুই তো পারি না। উনি বললেন, কিন্তু তোমাকে বড়ো ভালো লাগে।
ধীরে ধীরে ভটচায্যি বাড়ির বিশেষ আদরের হাওয়া আমার শ্বশুরঘরেও লাগল। প্রথমদিককার সেই বিরূপতা, উদাসীনতা, অশ্রদ্ধা এখন যেন আর নেই। বরং জায়েরা মাঝে মাঝে আমার পরামর্শ নিয়ে যান, শাশুডিও আমার মতামত উপেক্ষা করেন না। দিদিশাশুড়ি কথায় কথায় বলেন, বাববা, বামুনকর্তা স্বয়ং তোমাকে যা মান্যি করেন নাতবউমা! বুঝতে পারি ওঁদের মতামতই এ বাড়ির হাওয়া পালটে দিচ্ছে।
কাকা-কাকিমার স্নেহ যে অকৃত্রিম, যে-কোনো কারণেই হোক আমাকে যে তাঁরা শ্রদ্ধার চোখে দেখেছেন, এ বিষয়েও কোনো সংশয় নেই। খালি একটা কথা আমার মনে বার বার উঠতে থাকে। ওঁরা যেমনি ভক্তিমান, শাস্ত্রজ্ঞ তেমনি কিন্তু নিষ্ঠাবানও বটে। অর্থাৎ আচার-বিচার মানেন। খুব বেশি রকম। অতিরিক্ত আচারপরায়ণতা থেকেই তো মনুষ্যত্বের যত অপমান! আমাকে ওঁরা মা বলছেন, আমার মধ্যে শক্তির প্রকাশ দেখতে পেয়েছেন। অব্রাহ্মণ বলে আমার আত্মার অপমান ওঁরা করেননি। ঠিক কথা। এই সহনশীলতা, মমতা, অন্তদৃষ্টি যদি ওঁরা ভক্তি থেকে পেয়ে থাকেন তো ওঁরা সত্যিই অসামান্য। কিন্তু আমার পরীক্ষা করে দেখতে খুব ইচ্ছে হয় কতটা উদারতা ওঁদের আছে। আমি যে যুক্তিবাদী। পরীক্ষানিরীক্ষা আর গবেষণাই আমার স্বভাব! তাই একদিন বললুম, কাকিমা, আমাকে তো আপনারা যখন-তখন খাওয়ান। আমারও কিন্তু নিজের হাতে আপনাদের খাওয়াতে ইচ্ছে করে।
কাকাবাবু হাসি-হাসি মুখে বললেন, আমি যে স্বপাক ভিন্ন খাই না মা, নেহাত অসুখে-বিসুখে অপারগ হলে তোমার কাকিমা বেঁধে দ্যান।
কাকিমা বললেন, সে-ও কি কম হাঙ্গামা! তসর পরতে হবে। সদ্য চান করে তবে রাঁধতে হবে। রান্নার সময়ে কথা বলতে পারব না।
আমি বললুম, রান্নার সময়ে কথা না বলা, খুবই বৈজ্ঞানিক নিয়ম। কিন্তু তসর কেন কাকিমা? তসরের শাড়ি কি কেচে নিয়ে পরেন?
