তাই এঁদের বাড়ির সব বউয়ের গুণ আছে, খালি নতুন বউমার কোনো গুণ নেই। বড়ো বউয়ের চোখ ঝলসানো রূপ। সেজো বউটি কেমন সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, টিপটপ, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। মেজো বউমা ছুঁচের কাজে এক্সপার্ট, বড়ো বড়ো শাড়ি, বেডকভার ফুলে লতাপাতায় ভরিয়ে ফেলছে, অবাক মানতে হয়। ন বউমা তো সাক্ষাৎ ষষ্ঠীদেবী, মমতাময়ী জননী, কোলে কাঁখে দেবশিশুর দল। কনে বউমা! হিসেব জ্ঞান টনটনে। কোথাও এতটুক অপচো করো তো। কনে বউমার চোখে না পড়ে পারে না। নতুন বউমা? সব চুপ।
শাশুড়ি একদিন একগোছা সোনার চুড়ি আর একটা মটর দানা দিয়ে বললেন, এগুলো পরো বউমা। ন্যাড়া গায়ে ঘোরো ফেরো, আমার বড়ো লজ্জা করে।
আমি বললুম, ট্রেনে, বাসে যাতায়াত করি, এসব তো ডাকাতি হয়ে যাবে মা।
তো বাড়িতে ফিরে এসে পরো। এইভাবে আমার কিছু গহনা বা সম্মান লাভ হল। আদর করে উপহার দেওয়া নয়, দায়ে পড়ে নিতান্ত ব্যাজার হয়ে হাত উপুড়। তা তা-ই সই। সঙ্গগুণে আমারও কেমন একটা হীনম্মন্যতা জন্মে গেছে। গয়নাগুলো পরে মনে হল জাতে উঠলুম।
জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন দুপুরবেলা দিদিশাশুড়ি বললেন, ভাই ভাত-পাতে আগে ঠাকুরের প্রসাদটুকু খেয়ে তারপর অন্যসব খেও। খিচুড়ি আর পায়েস, একমুঠো। খেয়ে চমৎকৃত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, এ প্রসাদ কোথাকার দিদি?।
ও মা, জানো না? বামুন বাড়ির! বামুনকর্তা বারোমাস সমস্ত শক্তি পুজো নিজের হাতে করেন যে। বামুনমা নিজের হাতে ভোগ রাঁধেন।
বড়ো জাকে জিজ্ঞেস করে জানলুম বামুনবাড়ি আমাদের পেছনেই। নাম তারানাথ ভট্টাচার্য। পেশায় পুরোহিত বা পণ্ডিত কিছু নন, কোনো মার্চেন্ট অফিসে কাজ করেন। কিন্তু অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। ভক্তিমান। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই। তাই আজ সারাদিন ধরেই খুব শঙ্খ ঘন্টা কাঁসর ইত্যাদির আওয়াজ পাচ্ছি। এ বাড়ি থেকেও ঠাকুরের পুজো বাবদ শাড়ি, মিষ্টি ইত্যাদি কীসব গেল। দিদিশাশুড়ি জোড় হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, পুজো তো কতই হয় কিন্তু বামুনকর্তার পুজো একেবারে সাক্ষাৎ ঠাকুরের আবাহন করে এনে প্রতিমার মধ্যে বসিয়ে দেওয়া। এমন জায়গায় পুজো পাঠাতে পারাও অনেক পুণ্যি, অনেক ভাগ্যির কথা।
ফরসা মতো ছোটোখাটো একজন লালপেড়ে শাড়ি পরা মহিলা আমাকে আশীর্বাদ করতে এসেছিলেন বটে এ বাড়ি আসার পর। শুনলুম তিনিই বামুনমা। আর তারানাথবাবুকে আমি মাঝে মধ্যেই ট্রেনে দেখি। যাওয়ার সময়েই বেশি। আসবার সময়েও কখনও কখনও। ফরসা দোহারা চেহারা, চমৎকার প্রশান্ত মুখ। চুলগুলো বেশিরভাগই সাদা হওয়ায় খুব সৌম্য লাগে। শার্ট-প্যান্ট পরে প্রৌঢ় মানুষ ভিড় ট্রেনে ওঠানামা করেন, সৌম্যদর্শন হওয়া সত্ত্বেও কোনোদিন আঁচ করতে পারিনি তিনি এত ভক্তিমান, কিংবা নিজের হাতে সব মাতৃপুজো করবার মতো শক্তি ধরেন।
খুব কৌতূহল হল। পুজো অর্চনার আমি বিশেষ কিছুই জানি না। আমার বাপের বাড়িতে খুব একটা রেওয়াজ ছিল না। কিন্তু আমার ওই ধূপ-ধুনো, শঙ্খ-ঘন্টা, মন্ত্র পাঠ ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যে আবহাওয়া তৈরি হয় সেটা ভীষণ ভালো লাগে। স্কুল কলেজে পড়তে সরস্বতী পুজোয় আলপনা দেওয়া, ফল-কাটা, প্রসাদ-বিতরণ, অঞ্জলি বা আরতির সময়ে জোড়হাতে দাঁড়িয়ে থাকা—এসব আমার ভালো লাগত।
সরস্বতী পুজোর দিন শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলুম, ভটচার্য বাড়ির পুজো দেখতে যাব কি না। এ বাড়িতে আবার বড়োদের অনুমতি না নিয়ে পাড়ার কোনও বাড়ি যাবার নিয়ম নেই। উনি সানন্দেই সম্মতি দিলেন। যখন পৌঁছেলুম তখন তারানাথবাবু আরতি করছেন, বিচিত্রভাবে পঞ্চপ্রদীপ নাচিয়ে নাচিয়ে। বামুনমা শাঁখে ফু পাড়ছেন। কাঁসর বাজাচ্ছে ওঁদের নাতি, বড় মেয়ের ছেলে, আরও দু চারজন নাতিনাতনি দাঁড়িয়ে আছে। বড়ো মেয়েও রয়েছেন। কিন্তু পরিবেশ সত্যিই অপূর্ব।
শুধু ধূপ-ধুনোর পবিত্র ভাবদ্যোতক গন্ধই নয়, মঙ্গলবাদ্যই নয়, গাঁদা ফুলের মালায় সজ্জিত ছোট্ট সরস্বতী বিগ্রহের দেবীভাব, উপস্থিত সকলের মগ্নতা, তারানাথ ভট্টাচার্য মশাইয়ের বাহ্যজ্ঞানশূন্য তদগত তন্ময় পুজোর ভঙ্গি সব মিলিয়ে আমাকে মুগ্ধ করে দিল।
উপুড় হয়ে প্রণামের মন্ত্র উচ্চারণ করে, পুজো শেষ করে এদিকে ফিরলেন ভট্টাচার্যৰ্মশাই। আমাকে দেখবামাত্র ওঁর মুখে আনন্দের আভা ছড়িয়ে গেল। কেমন একটা উল্লাসের সঙ্গে বললেন, জানতুম, আমি জানতুম, মা আমার ডাক শুনেছেন, সশরীরে এসে নিজেই নিজের পুজো নিচ্ছেন সন্তানের হাত থেকে, আমাকে জোড় হাতে নমস্কার করলেন উনি।
এগুলো বয়স্ক মানুষের অভ্যস্ত কথার কথা বলেও ধরে নেওয়া যেতে পারত, যদি না তাঁর মুখের সেই দ্বিধাহীন প্রত্যয়ের ভঙ্গিটা থাকত। বামুনমা বলে উঠলেন, উনি ঠিকই বলেছেন মা, তুমি যে একাধারে লক্ষ্মী-সরস্বতী। তোমার সব কথা শুনেছি মা আমরা, ঠিক চিনেছি তোমাকে।
আমার চোখ-ভরতি করে জল এসেছিল, মুখ নীচু করে কোনোমতে বললুম, কী যে বলেন কাকিমা, কবে থেকে ভাবছি আপনাদের পুজো দেখব, আজ এসে এত ভালো লাগল।
ওঁরা তিনজনে স্বামী-স্ত্রী ও কন্যা আমাকে যত্ন করে বসিয়ে প্ৰসাদ না খাইয়ে ছাড়লেন না। খিচুড়ি, বাঁধাকপির ডালনা, বেগুনি, কুলের অম্বল, পায়েস। কী অসাধারণ যে সেই প্রসাদের স্বাদ! আমি বললুম, এমন রান্না আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে। কাকিমা বললেন, নিশ্চয়ই দেব মা। তুমি আবার এসো, তুমি এলে আমরা ভাগ্যি মানব।
