হতে পারে আমার এই টাউনে যাকে বলে ভাবের বিয়ে, তাই এমনি অভিজ্ঞতা। বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলা রেজিস্ট্রি করে লোকাল ট্রেনে চেপে আমি শ্বশুরবাড়ি এলুম। সুশান্তর পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝোলা। পায়ে চটি। আমার পরনে গোলাপি আর হলুদ চেক-চেক দক্ষিণী সিল্ক। কানে মাকড়ি, গলায় সরু সোনার হার, হাতে একগাছি বালা, আর ঘড়ি। পাতলা সুটকেস হাতে নিয়ে যখন সুশান্তর সঙ্গে ভেতর-উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালুম, কোনো পুরুষ মানুষকে ত্রিসীমায় দেখিনি। সিঁড়ির নানান ধাপে, এ ওকে ধরে কিছু কৌতূহলী নারী জনতা আমাকে অবাক হয়ে দেখছিল। শাশুড়ি গম্ভীর মুখে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে একটা সোনা-বাঁধানো লোহা পরিয়ে দিয়েছিলেন। একটু রাতে দালানে খেতে বসতে বিরাট কাঁসার বগি থালায় অনেক রকম পদ দেখেছিলুম, দিদিশাশুড়ি কাঁসার ফুলবাটিতে রুইমাছের ল্যাজা আর মুড়ো এগিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, খেতে হয় মা, খেয়ে নাও। সে সময়েও গয়নার ঝমঝম, ঘোমটা, খোঁপা, আলতা-পরা পা, আর চোখ ভরতি কৌতূহল আমার আশেপাশে ঘোরাফেরা করেছিল। কিন্তু কেউ আলাপ করতে, বন্ধুত্ব করতে এগিয়ে আসেনি। কে জানে একে ভাবের বিয়ে, তায় বেজাতের মেয়ে, এইসব ভয় বোধহয় দুর্জয় মেয়েলি কৌতূহলের মুখেও কুলুপ এঁটে দিয়েছিল।
পরে আমার নিজের জায়ের মুখে শুনেছি। অমন অনাসৃষ্টির বউ-বরণ নাকি তারা জন্মেও দেখেনি। সে এসেছিল বেনারসী দলমলিয়ে, গয়না ঝলমলিয়ে, দুধে আলতায় পা রেখে। চতুর্দিকে উলু উথলে ছিল। শাঁখের আওয়াজে আর সব আওয়াজ ডুবে গিয়েছিল। হাতের মুঠোয় ছটফটে মাছ, কপালে বরণডালা। গালে দিদিশাশুড়ির চুমো, আর সারা বিকেল, সারা সন্ধে, রাত, পরের দিন সকাল, বিকেল, সন্ধে রাত, খালি জমকালো পোশাকের আসা-যাওয়া আর উপহার, চিবুক ধরে আদর আর আহা চমৎকার বউ হয়েছে।
সুশান্তটা একদম বোকা। আশ্বাস দিয়েছিল, আদর না পাও, খাতির পাবে। পল্লে বাড়ির তিনকুলে কেউ ডক্টরেটওয়ালা কলেজ প্রফেসার বউ দেখেনি। শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পর দিন থেকেই আমি যথানিয়মে ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করে কলেজে চাকরি করতে যাচ্ছি। সুশান্তর থিসিস শেষ হয়নি। সে ফিল্ড ওয়ার্কের জন্যে তখন বাঁকুড়া চষে ফেলছে। কদিন ছুটি নিয়ে যে মধুচন্দ্রিমা না হোক মিছরি চন্দ্রিমাও করব সে গুড়ে বালি। দিন পাঁচেক পরে আমার নিজস্ব শাশুড়ি ডেকে বললেন, নতুন বউমা, আমাদের যৌথ পরিবার, মোটা ভাত-কাপড়টা এখনও এস্টেট থেকেই হয়। সবাইকেই কিছু কিছু কাজ করতে হয়। তুমি যদি তোমার ভাগের কাজটুকু না করো আমার মাথা কাটা যাবে।
আমি বললুম, বেশ তো, কী করতে হবে বলুন না, নিশ্চয়ই করব।
সকালটা তো ইস্কুলে বেরোও, বিকেলবেলা জল খাবারের নুচি, রাতে যেটুকু রুটি হয়, তার ময়দাগুলো তুমি মেখে, বেলো।
চারটে, কোনোদিন পাঁচটায় বাড়ি ফিরে, গা ধুয়ে, চুল বেঁধে,—সুতরাং তাল তাল ময়দা মাখি, বেলি। শেষ হতে হতে রাত আটটা তো বটেই। যদি কোনোদিন সন্ধে সাতটা পেরিয়ে যায় ফিরতে, ট্রেনের গণ্ডগোল বা কলেজে মিটিং থাকলে এরকম হয়েই থাকে, শাশুড়ি বলে যান, কাল সকালে একটু ভোর-ভোর উঠো। আজ তোমার ময়দার পালা ন-বউমা সেরে দিয়েছে, ওর সকালের চা-জলখাবারটা তোমায় করে দিতে হবে। পরদিন আমার দশটা পঁয়তাল্লিশে ক্লাস। সাড়ে নটার ট্রেনে যেতে না পারলে সেটা হয়ে গেল। রাতে বা ভোরে কোনো পড়াশোনা নিয়ে বসলে, হঠাৎ যদি কোনো কাজ পড়ে, কেউ কেউ বলেন, এত পড়ে-শুনেও তাহলে তেমন কিছু শিখে উঠতে পারেনি, এখনও ইস্কুলের পড়া করতে হয়! তো এই আমার খাতির।
তখন ভাদ্রমাস। প্রচণ্ড গুমোট, রুটি বেলতে বেলতে সাড়ে আটটা বাজল। কোমর ভেঙে যাচ্ছে। দোতলায় নিজের ঘরে গিয়ে জানলার ধারে দাঁড়ালুম। ঘামে ভিজে শপ শপ করছি। কিন্তু বিকেলে এক বার গা ধুয়েছি, এখন আবার কলঘরে চানের জল পাওয়া যাবে না। জানলা দিয়ে হু হু করে হাওয়া আসছে। দূর দিয়ে একটা নৌকো চলে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। রাতের গঙ্গা। যেন হালকা কালি মেড়ে দিয়েছে কে নদী আর আকাশের গায়ে। একটা বাঁকা ডালে দেখলুম তিন চারটে শকুন বসে আছে, অন্ধকারে তাদের সাদা গলা ফুটে আছে। কেমন মন খারাপ হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি জানলার ধার থেকে চলে এসে বিছানার একপাশে বসে পড়লুম। সুশান্ত টেবিলে কাগজপত্র মেলে লিখছিল। বলল, কী হল?
কী হবে? কিছু না।
একটু পরে ও হাতের কলম নামিয়ে রেখে বলল, তোমার এখানে ভালো লাগছে না, না?
আমি কিছু বললুম না। কী হবে, বলে? ও বলল, কতকগুলো অসুবিধে আছে ঠিকই। কিন্তু ভেবে দেখো, সুবিধের পরিমাণ কিন্তু তুলনায় অনেক বেশি। কিছু কিছু কাজ করে দিতে হয়, কিন্তু দায়িত্ব নেই। অসুখবিসুখ করলে আপনা থেকে ডাক্তার আসবে, ওষুধ আসবে। মুখের গোড়ায় ভাত, যত দেরিতে আস, ঠিক পাবে। বেড়াতে যেতে চাও, ঘর ফেলে চলে যাও, সেফ। যদি নিজেদের এত সব করতে হত, ভাবতে হত তবে কি আর এত নিশ্চিন্তে থিসিসটা শেষ করতে পারতুম। না, নাটকগুলোই লিখতে পারতুম। তারপরে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, একবার থিসিসটা জমা দিতে দাও না, দেখবে যাযাবরের মতো বেরিয়ে পড়ব দুজনে।
মাঝে মাঝে যাযাবরের মতো বেরিয়ে পড়লেই যে আমার সমস্যার কোনো সমাধান হবে না একথা ওকে বুঝিয়ে লাভ নেই। মানুষ একচক্ষু। যে দিকটা দেখতে, ভাবতে অভ্যস্ত সেদিকটাই দেখে, ভাবে। অন্য দিকে চোখ ঘোরাতে পারে না। আমার এত অভিমানই বা কীসের? বাপে-তাড়ানো মায়ে-খেদানো বই তো নই, বাবা অবশ্য অনেক আগেই গত হয়েছেন। কিন্তু মা-দাদারা কেউ এ-বিয়ে মেনে নিলেন না বলেই তো এত অসম্মানের মধ্যে দিয়ে আমার শ্বশুরবাড়ি আসতে হল। সুশান্ত ভেবেছিল পি. এইচ. ডি. ডিগ্রি আছে বলে, কলেজে পড়াই বলে আমার খাতির হবে। ও জানে না মেয়েদের সম্মান তাদের চাকরি, শিক্ষা, ডিগ্রি এসব দিয়ে হয় না। সমাজের এমন স্তর এখনও অনেক আছে যেখানে এগুলো বরং মেয়েদের অসম্মান বাড়ায়। চাকরি করে?—এ মা। কলেজ? ওই হল। মাস্টারনি। পি. এইচ. ডি.? এম, এ.-র পরেও আরও পড়েছে? বয়সের কী গাছপাথর নেই গা? মেয়েদের সম্মান হয় তাদের রূপে, তাদের বাবা, স্বামী এদের পদমর্যাদায়, আর যৌতুকে। আমার রূপ? নেই। বাবা? চলে গেছেন। স্বামীর পদমর্যাদা? এখনও তৈরি হয়নি। আর যৌতুক? ভাঁড়ে মা ভবানী।
