অমিতেশ ঠোঁট ছড়িয়ে হাসল। যাতে আর কোনোদিন ছুরি-ছোরা-রিভলভার ধরতে না পারি তার ব্যবস্থা করে দিয়েছে, রজতদা। জানে না আঙুলের গ্রন্থি আসল রিভলভারটা ধরে না।
সতেজ কণ্ঠ। সজীব চোখ। সজীব মস্তিষ্ক। বিধাতার কী আশ্বর্য সৃষ্টি এই বীর পুরুষরা
ধবধবে বিছানার প্রান্তে একটা অয়েল ক্লথ ভাঁজ করে পেতে দিল সংহিতা। বড়ো ট্রেতে খাবার নিয়ে এল। মুরগির স্টু, কাঁচা স্যালাড, সুগন্ধ ভাত, ছানার সন্দেশ। চামচ করে খাইয়ে দিল। তারপর সযত্নে ধুইয়ে মুছিয়ে অয়েল ক্লথ ট্রে তুলে নিয়ে গেল। আমাকে বলল, রোগীর ঘরে আপনাকে দোব না সার, আপনি বাইরে আসুন।
আমার তো খাওয়ার কথা ছিল না! লাঞ্চ সেরে বেরিয়েছি সংহিতা। সে কী! আমরা খাব, আর আপনি খাবেন না, তাই কি হয়? খেতেই হবে। বললাম, শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের যুগ চলে গেছে। জোর করে খাওয়ালে আজকালকার বাঙালি পুরুষ কিন্তু মোটেই খুশি হয় না। আমার খাওয়া-দাওয়ার সময়, পরিমাণ সব বাঁধা। যাবার সময় চা খেয়ে যাব, তুমি ব্যস্ত হয়ো না সংহিতা।
মুখটা ওর ম্লান হয়ে গেল। কিন্তু আর জোর করল না।
আমি অমিতেশের সঙ্গে কথা বলতে লাগলাম। অন্তরালে সংহিতা তার গৃহস্থালির লক্ষ কাজ সারতে লাগল। সম্ভবত রান্নাবান্না, ঝাড়পোছ, ধোয়াপাকলা, বাজারহাট, সর্বোপরি শয্যাগত পঙ্গু রোগীর সেবা, যে জলটা পর্যন্ত নিজে খেতে পারে না—এসবের জন্য ওর কোনো সাহায্যকারী নেই।
অনেকদিন পর কথা বলার লোক পেয়ে অমিতেশ খুব খুশি। সমাজ পরিত্যক্ত, নির্বান্ধব, রাহুগ্রস্ত এই যুগলের কাছে কে-ই বা আসে! কিন্তু কিছুক্ষণ কথাবার্তার পরই বুঝলাম পনেরো বছরেও অমিতেশ একটুও বাড়েনি। অতীত-বর্তমান ভবিষ্যৎ এই ত্রিকালের ত্রিমাত্রায় গড়া মানুষ সে নয়। সে একমাত্রিক। শুধু ভবিষ্যতের আয়তনে বিশ্বাসী। তার অনতি-অতীত জীবনের কথা আমি জানি না, অনুমান করতে পারি। কিন্তু অমিতেশ সে-ধার দিয়েই গেল না। সে যেন আরব্য উপন্যাসের সেই ধীবর। অতীতের দৈত্যটাকে কলশির মধ্যে পুরে কোনো মহাসমুদ্রের জলে ফেলে দিয়ে হাত ধুয়ে এসেছে। বলল, খুব ভালো আছি রজতদা, নেভার ফেল্ট বেটার। এই খাঁচাটা দেখছেন? বছরখানেক পর মনে হয় এটার আর দরকার হবে না। উঠে দাঁড়াতে পারব। আঙুলগুলোর কথা ভাবি না। শরীরটা আর বিপ্লবের কাজে লাগবে না। কিন্তু অমূল্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। সংগঠন তৈরির কাজে শিগগিরই হাত দেব। ফুল প্রুফ। বুলেট প্রুফ।
আমার হয়তো অনধিকার চর্চা। তবু কীসের তাগিদে বলে ফেললাম জানি না, বিপ্লবের প্রতি কর্তব্য ছাড়া আর কিছুর প্রতি কোনো কর্তব্যের কথা তোমার কখনও মনে হয় না অমিতেশ?।
আপনি কি সংহিতার কথা বলছেন?—অমিতেশ একদেশদর্শী হতে পারে, বোকা নয়।
খানিকটা।
একটা মহৎ স্বপ্ন সত্য করতে গেলে ওরকম অনেক মেয়ের আত্মত্যাগের দরকার হয় রজতদা। যারা কোম্পানি এগজিকিউটিভের বউ হয়ে শেষ দুপুরের কফি পার্টিতে সোশ্যাল ওয়ার্ক করতে যায় সেরকম শৌখিন মজদুরির ধাত সংহিতার নয়।
এ কথা আমি খুব জানি! তুলা রাশি, ধনু লগ্ন। জ্যোতিষে বিশ্বাস করি আর না ই করি, শুনেছি মানিয়ে নেবার অমানুষিক ক্ষমতা থাকে এসব জাতক-জাতিকার। বিশ্বস্ততা ও নিষ্ঠা তুলনাহীন। সংহিতার ভবিতব্যই তাকে হাত ধরে বিপ্লবের এই নাভিকেন্দ্রে পৌঁছে দিয়ে গেছে। কিন্তু এ-ও নিশ্চিত জানি সে ভবিতব্যের অন্য নাম ভালোবাসা, সেই পুরাণ কথিত বস্তু, যার জোরে মানুষ অসাধ্যসাধন করতে পারে। সংহিতার মুখে আমি সন্ত্রাসী বিপ্লব সম্পর্কে কোনো বিশ্বাসের কথা কোনোদিন শুনিনি। বিপ্লবের প্রয়োজনে সে সামান্য দৌত্যের কাজও কখনও করেছে বলে জানি না। দরজার দিকে সভয়ে তাকালাম। ধারে কাছে নেই তো? না থাকলেই ভালো। অমিতেশের ভাষায় তার দেওয়া-নেওয়ার হিসেব-নিকেশ সংহিতার পছন্দ হবে কি?
অমিতেশ আলাপে আগ্রহী। তার পরিকল্পনার রূপরেখা আমার মতো অবিশ্বাসী কাফেরকে সে বলবে কেন? কিন্তু স্বপ্নসৌধের সম্ভাব্যতার কথা আলোচনা করতে তো দোষ নেই। জ্বলজ্বলে চোখে, গমগমে গলায়। কিন্তু আমি এই আলোচনায় এই বিতর্কে একদিন এত বেশি যোগ দিয়েছি এবং শুধু প্রাণশক্তির প্রবল জোয়ারি চাপে বুদ্ধির সমস্ত শক্তিকে পরাভূত হতে দেখেছি যে এই নিষ্ফল বাদানুবাদের মধ্যে প্রবেশ করতে আমার এখন বড়ো ক্লান্তি! আমি শুধু মানবিক, বৌদ্ধিক আলাপচারিতে রাজি অমিতেশ।
বহুক্ষণ একতরফা উত্তেজিত বক্তৃতার পর তাই শ্লিষ্ট হাসি হেসে ও বলল, আসলে কী জানেন রজতদা, ব্রিটিশের তৈরি সাহিত্যগুলো আর ওই অপসংস্কৃতিতে ভরতি স্যানসক্রিট লিটারেচার-টারগুলো আপনারা বড্ড বেশি পড়েছেন। আপনাদের ধাতটা হয়ে গেছে কনসটিট্যুশন্যাল। ছকের বাইরে কিছুর কথা আপনারা কল্পনা করতে পারেন না। নীচ প্রবৃত্তিগুলোর সাবলিমেশনকে শিল্পের নামে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। আপনারা বোধহয় স্বপ্নও দেখেন বানান করে করে। ফ্রয়েড সাহেবের ফর্মুলা অ্যাপ্লাই করলে অ্যাভারেজ বাঙালির চিত্তবৃত্তি থেকে সাপ্রেশড় লিবিডো ছাড়া কিছুই বেরোবে না। আসলে আপনি চিরকাল সেই আদি অকৃত্রিম শোধনকারী বুর্জোয়াই রয়ে গেলেন।
সংহিতা বাইরের পোশাকে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখে গভীর ক্লান্তির কাজল। ওর মঞ্চে যাবার সময় হল। আমিও এবার উঠি, সৈনিকের তিরস্কার শিরোধার্য করে। বলার কিছু আছে কি? দৃষ্টিহীন সংকল্পে বেঁকে আছে বিদ্রোহীর কঠিন করতল। ওদিকে ঘাটে ঘাটে সাধ্বীত্বের কঠিনতর পরীক্ষা দিতে দিতে নাগিনীদষ্ট পূতিগন্ধময় শবদেহ নিয়ে ভেলা চলেছে। লম্পট সভায় ছিন্ন খঞ্জনার মতো নেচে নেচে বেহুলা নাচনি একদিন না একদিন আদায় করে আনবেই মুক্তিপণ। বিপ্লব জানতে চাইবে না কীসের মূল্যে মুক্তি খরিদ হল।
ব্রহ্মহৃদয়
অনেক আছে, তবু কিছু নেই। অনেক লোক তবু যেন খাঁ খাঁ করছে সব। দিনে রাতে কত কাজ তবু মন পাওয়া তো দূরস্থান কাউকে যেন ছুঁতেই পারি না। বুকের মধ্যেটা কেমন হু হু করে। অথচ বিয়ের আগে সুশান্ত তো সবই বলেছিল। বলত বেশ গর্বের সঙ্গে। একটি কথাও বেচারি মিথ্যে বলেনি। সমস্ত মিলিয়ে। নিয়েছি। মফসসল টাউনে বাড়ি হলে কি হবে, নাকি এককালের জমিদারবাড়ি, বিশাল বাড়ি। একশোবার ঠিক। দেউড়ি পেরোলে বিরাট উঠোন। চকমিলোনো। গাড়িবারান্দার কোলে কোলে উঁচু উঁচু ঘর। কিন্তু গঙ্গার ধারে বাড়ি তো! দোতলাতেও তাই নোনা লেগেছে। তারই ওপর নীলচে চুনকাম। ঘরে ঢুকলে কেমন মন খারাপ হয়ে যায়। সুশান্তর বাবারা সাত ভাই। ছ-জন জীবিত। তাঁদের সাত স্ত্রী বর্তমান। তারও আগের পুরুষের রয়েছেন এক পিসিঠাকুমা। সাত ভাইয়ের ছেলেমেয়ে, তাদের ছেলেমেয়ে সব মিলিয়ে সাকুল্যে কত জন হবে গুনতিতে, আমার ঠিক জানা নেই। সবার হদিস এখনও পাইনি। অর্থাৎ জমজমাট সংসার। অথচ সেরকম আড্ডা তো দেখি না, দেখি না জমিয়ে খাওয়াদাওয়া, পুজো-আচ্চা। হা হা হাসি। হাঁকডাক। ঘরগুলোতে মানুষ যেন চাক বেঁধে বেঁধে আছে। আড্ডার বদলে জটলা। অট্টহাস্যের বদলে গলাখাঁকারি, হাঁকডাকের বদলে ফিশির ফিশির।
