সেই আমি চাকরি ছাড়লাম। আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি তখন থেকেই। সিভিল প্র্যাকটিস করি। আদালত আমার বিবেককে মোটামুটি একটা সহনীয় আশ্রয় দিয়েছে। সুখী নই। সন্ত এবং মূঢ় ছাড়া এ পৃথিবীতে সুখী কে? কিন্তু ন্যূনতম শাস্তির জন্য জীবনের সঙ্গে একটা রফায় পৌঁছোনো দরকার। হাজার হাজার বছরে পুঞ্জিত সভ্যতার সম্পদকে লাথি মেরে ওরা নখদন্তে বর্বর আরণ্যক আইনের কাছে ফিরে যাবে, নপুংসকের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব-এ মর্মাহ থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম।
গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম গ্র্যান্ডের তলায়। সংহিতা এল। ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। ও একটু একটু ভিজেছে। চুলে বৃষ্টির কুচি। চোখের বড়ো বড়ো পাপড়িতেও দু-একটা পোখরাজের দানার মতো আটকে আছে। আঁচলে মুখটা মুছে নিল সংহিতা। থিয়েটারের চড়া মেক-আপ ব্যবহারে ওর মুখের চামড়ার খয়েরি খয়েরি মেছেতার মতো দাগ। আগের বার বিজলিবাতির তলায় বুঝতে পারিনি। শ্রমসাধ্য জীবিকার কালি চোখে মুখে। সব রূপসি নারীই তা হলে ইন্দ্রাণীর সিংহাসনে সখীপরিবৃতা হয়ে বিরাজ করে না! ভুবনজুড়ে অলক্ষ্য ফাঁদ বিসর্পিত, মহাকবির ভাষায় কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে। যে যেখানে যাবে বলে বেরিয়েছিল, যাওয়া হয় না। ভুল স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে ট্রেন চলে যায়। মুখ যেমন মনের আয়না নয়, সকাল যেমন নয় পরিণত দিনের অভিজ্ঞান তেমনি কার কর্মফল কাকে কোন চক্রনেমিতে বেঁধে মহাকালের পথ পরিক্রমা করবে কারও জানা নেই।
ঠিকানা পূর্ব কলকাতার। সংহিতার নির্দেশে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে যাচ্ছি। চোখ উইন্ডস্ক্রিনে। রক্ষণশীল মেজাজের লোক। পরকীয়াতত্ত্বকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে পারি না। একদম অপ্রাসঙ্গিক ভাবে সংহিতা বলে উঠল—আমি কিন্তু অন্য চাকরি খুঁজেছিলাম, সার।
বুঝলাম গতদিনের সাক্ষাৎকার এখনও ওর বুকে হুল ফুটিয়ে রেখেছে। বড়ো কষ্ট হল, বললাম—কি হল, পেলে না?
আমার তো সেই থেকে বি, এটা কমপ্লিটই হল না! ও যখন নিরুদ্দেশ চেষ্টচরিত্র করে স্টেনোগ্রাফি শিখে নিয়েছিলাম। ও চাকরি করেছিলাম কিছুদিন। কিন্তু অত সামান্য টাকায় এখনকার খরচ আর চালাতে পারি না।
কত টাকার দরকার তোমার, সংহিতা!
অনেক অনেক সার। সে আপনি না-ই শুনলেন। ডাক্তারদের ফি-এর কথা তো আপনি জানেনই। সবাইকে নিয়মিত বাড়িতে ডাকতে হয়। প্যাথলজিক্যাল টেস্ট রেগুলার। শুশ্রুষা এবং আনুষঙ্গিক আরও। শরীরে ওর কিছু নেই। সাইকিয়াট্রির কী প্রচন্ড খরচা আপনি কল্পনা করতে পারবেন না সার, প্রতি সপ্তাহে অ্যানালিসিস, এক একটা সিটিং পঞ্চাশ। পুরো দেড় বছর এই জিনিসও চালাতে হয়েছে।
তোমার পেশাটা বিপজ্জনক, সংহিতা—সন্তর্পণে উচ্চারণ করি।
যতটা ভাবছেন ততটা নয় সার, স্টেনোগ্রাফারের চাকরিটা এর চেয়ে হাজারগুণ বিপজ্জনক ছিল। সেখানে বিপদ কোনদিক থেকে কীভাবে আসবে বোঝা যেত না। এখানে বুঝি। আওয়ার্স কম। টাকা বেশি। অমিতেশকে সময় দিতে পারি।
এদিকে যখন এলেই ফিলমে-টিলমে গেলেও তো পারতে। তোমার টাকার ব্যাপারটা ফর গুড সলভড হয়ে যেত!
অত সোজা ভাববেন না সার, তেমন যোগাযোগও আমার ভাগ্যে ঘটে ওঠেনি। তা ছাড়া আপনি বোধহয় সিনেমা দেখেন না, আমার চেহারায় একজন নামকরা স্টারের ভীষণ সাদৃশ্য আছে। ওই জন্যেই ও লাইনে আমার কোনোদিন কিছু হওয়া শক্ত। তৃতীয় সারিতে থেকে যাওয়ারই কপাল!
নাচই যখন বেছে নিলে, সত্যিকার নৃত্যশিল্পীও তো হতে পারতে!
আপনি এখনও আগের মতোই ছেলেমানুষ আছেন সার, সংহিতা বলল, আমি কি কোনোদিন নাচের জন্যে তৈরি হয়েছি, নাকি? তা ছাড়া উপযুক্ত গুরু, শিক্ষার সুযোগ, প্রতিভা কিছুই কি আমার ছিল? পড়ে গেলাম তো ঘূর্ণিঝড়ে! আমার ফিগারে ক্ল্যাসিক্যাল ডান্স হওয়াও শক্ত। আপনার মনে নেই উওম্যান অফ রোম-এ আদ্রিয়ানাকে ব্যালে-স্কুল থেকে কেন ফিরিয়ে দিয়েছিল?
বলেই সংহিতা অপ্রস্তুত হয়ে ঠোঁট কামড়াল। ওর মনে হয়ে থাকবে তুলনাটা বেফাঁশ হয়ে গেল। বাকি সময়টা ও কাঠ হয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কাটিয়ে দিল, আর একবারও মুখ ফেরাবার সাহস সঞ্চয় করতে পারল না।
আশ্চর্য হয়ে দেখলাম অমিতেশকে সংহিতা খুব সুখে রেখেছে। আমি বেলেঘাটার বস্তি-টস্তি আশঙ্কা করেছিলাম। মোটেই না। দু-কামরার ছোটো ফ্ল্যাট। দোতলায়। নতুন চুনকাম। আসবাব কম কিন্তু অতি পরিচ্ছন্ন। প্রচুর আলো হাওয়া, বাতাসে চন্দন ধূপের গন্ধ। কিন্তু অমিতেশকে চেনা যে-কোনও লোকের পক্ষে শক্ত ছিল। কূঢ়োরস্ক বৃষস্কন্ধ সেই বীরভূম ঘরানার কৃষক সন্তান, যার পিতৃপুরুষ শুধু কাঁধের জোরে জোড়া বলদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত শ্বেতির তাপ্পি। স্বাভাবিক গ্রামবাংলার নির্ভেজাল কৃষ্ণবর্ণের সঙ্গে শ্বেতির এই বৈপরীত্য এক কথায় বীভৎস। লোহার ফ্রেমের মধ্যে শরীরটা আটকানো। পাঁজরা বাঁকা। অনেক রকম রোগ, অনেক রকম চিকিৎসা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সব সেরে যাতে এসে দাঁড়িয়েছে তার নাম স্পাইন্যাল টিউবারকুলোসিস। সংহিতা আশ্বস্ত করল রোগটা ছোঁয়াচে নয়। হাতের আঙুলগুলো ব্যবহার করতে পারে না। প্রত্যেকটি আঙুলের গাঁটে পুলিশ কি কায়দা করেছে যার জন্য আঙুলগুলো অকেজো হয়ে গেছে। ফিজিওথেরাপি চলছে। দূর ভবিষ্যতে নিজের হাতে খাওয়া-দাওয়া করার ক্ষমতা ফিরে পেলেও পেতে পারে। অন্তত সংহিতার তাই আশা।
