সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়া আমার মতে ছিল যৌবশক্তির মারাত্মক অপচয়। অপ্রস্তুত, অর্ধপ্রস্তুত, মন-বুদ্ধি-হৃদয়বৃত্তির উপকরণ নিয়ে রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে অসম টক্করে লড়তে যাওয়া এবং তার ফলশ্রুতি আত্মহত্যার শামিল বলে মনে করতাম। গবেষকের মেজাজ নিয়ে তথ্য তোমরা জোগাড় করো, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে, সাধ্যমতো সমাজকল্যাণের কাজে হাত পাকাও, প্রত্যেকটি মানুষই তো সেই একক যাদের পর পর গেঁথে তৈরি হয় সমাজের পাকা গাঁথনি! প্রত্যেকটি হঁটের গুণগত উৎকর্ষের ওপর কি ইমারতের সামগ্রিক উৎকর্ষ নির্ভর করে না? একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে ক্ষমতা দখলের ছদ্মবেশী লড়াই চলছে। তার ভেতরের ছবি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল না হয়ে স্রেফ অ্যাডভেঞ্চারের মোহে রাজনীতির নোংরা দাবার ছকে বড়ের চালে পর্যবসিত হওয়া টিন-এজার ভ্রষ্টতরী ছাড়া কি! মহাকুজ্বটিকায় যার ভেঁড়া পাল ভাঙা হাল, একূল-ওকূল যার চিরকালের মতো হারিয়ে গেছে!
আমার সমস্ত বাগবিস্তারের অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া ছিল—
জানি রজতদা, বিপ্লবকে, রক্তপাতকে আপনি ভয় করেন।
করি।
অথচ আপনার প্রিয় নেতা স্বাধীনতার জন্য রক্তের মূল্য চেয়েছিলেন!
স্বাধীনতা? সে তো তোরা পেয়ে গেছিস? পাসনি?
ফুঃ। এ জারজ স্বাধীনতা কে চেয়েছিল?
ইতিহাসকে তো উলটে দিতে পারিস না! যা পেয়েছিস তাকেই প্রাণপণে গড়ে তোলবার চেষ্টা করতে দোষ কি?
আমরা স্পার্টান আদর্শে বিশ্বাসী। আঠাশে শিশু প্রতিপালন করবার চেয়ে বরং ইতিহাসের ছক উলটে দেয়। দেওয়া যায়। আপনিও জানেন, আমরাও জানি।
ক্রমিক অসহযোগ কিংবা হঠকারী কু দিয়ে শাসনযন্ত্রের উৎসাদনের যে প্রচেষ্টা তাকে সার্থক করতে হলে প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, পৌরুষ এবং সর্বোপরি শুভবুদ্ধি থাকা দরকার। তার পুঁজি, তোদের কুষ্ঠগ্রস্ত নেতৃত্বে নেই, বিশ্বাস কর। এখনকার সব লড়াই শেষ পর্যন্ত গদির লড়াই। দল ভেঙে উপদলও আবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়, আদর্শের চুলচেরা পার্থক্যের খাতিরে নয়, স্বার্থের চুলচেরা হিসেবের জন্যে। যদি ভেবে থাকিস তোরা সেতুবন্ধের কাঠবেড়ালি, ভুল করবি, তোদের ভবিতব্য সেই হতভাগ্য মূষিকগুলোর মতো বাঁশিওলার মারণসুরের তালে তালে যারা নদীতে গিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিল।
ওদের তর্ক আবার উত্তাল হয়ে উঠত। সার বিশ্ব খুঁড়ে খুঁড়ে নিয়ে আসত উদাহরণ। বিপ্লব এবং বিপ্লব। এবং আশ্চর্য একই উদাহরণ থেকে আমরা কীরকম ভিন্ন এবং পরস্পরবিরোধী শিক্ষা গ্রহণ করে থাকি! অবশেষে ওরা ফিরে আসত স্বদেশের অগ্নিযুগে। ক্ষুদিরাম, কানাইলাল। অবোধ-কৈশোরের আনাড়ি হাতে মারণাস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে ফাঁসিমঞ্চে পাঠাবার দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নিয়ে গর্ব করার এই জাতীয় প্রবণতা স্মরণ করলে এক দুর্জয় আর্তক্রোধে আমার অন্তরাত্মা জ্বলে যেত। স্বরাজপূর্ব বালকবলির ট্র্যাডিশন স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে যে-সব মাস-হিপনটিস্ট আজও চালিয়ে যেতে চায় আমি তাদের সর্বান্তঃকরণে অভিশাপ দিই। কিন্তু ওদের সামনে এতটা উম্মা প্রকাশ করা কি সমীচীন?
বিপ্লব না হলে আপনাদের পচা সমাজের কাঠামো পালটাবে না।
ভবিষ্যৎ সমাজের ছকটা তোদের কাছে তা হলে পরিষ্কার!
ইয়েস, ব্লু-প্রিন্ট তৈরি।
তাই বুঝি? আমার ধারণা ছিল থিয়োরি একটা খসড়া করে দেয় মাত্র। তারপর দেশ-কাল-পাত্র অনুসারে তার অদলবদল না হওয়াটা অস্বাস্থ্যকর। জীবন যখন চলিষ্ণু, তত্ত্বকে তখন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, নইলে আবার তৈরি হবে অচলায়তন যাকে ভাঙতে আবার তোদর শাবল, গাঁইতি, গ্রেনেড, ডিনামাইটের দরকার হবে।
উপহাস করছেন রজতদা?
উঁহু। তোরা আমাদের বংশধর। তোদের হাতে সাধের বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে চলে যাব বলেই আমাদের দাঁড়িয়ে থাকা। তোদের ক্যানন ফডার হতে দেখে ভেতরটা জ্বলে যায়। যা মহাকাশযান হতে পারত তা আতশবাজিতেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। তোরা হলি ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সেই হতভাগা রেজিমেন্ট যারা ভুল কম্যান্ডে চোরাবালির অতলে গিয়েছিল।
তারা বীর ছিল রজতদা। আপনাদের মতো কাপুরুষ নয়। নিজেদের পিঠ বাঁচাতেই আপনাদের এই সমস্ত পুথিগত যুক্তির ভণ্ডামো!
নিঃশ্বাস ফেলে ব্রেখটের গ্যালিলিয়োর সেই উক্তি স্মরণ করতাম-হতভাগ্য সেই দেশ যে দেশে শুধু বীরপুরুষেরই প্রয়োজন হয়। সোল্লাস স্লোগান ভেসে আসত, চলছে, চলবে, লড়াকু ছাত্র লড়ছে, লড়বে। মনে মনে বললাম, লড়ছে, লড়বে, মরছে মরবে, আস্তিনের পেছনে যারা হাসবার তারাও হাসছে হাসবে। কত বিজ্ঞানী, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাষ্ট্রনায়ক, সমাজতাত্ত্বিক, চিকিৎসক, কত প্রতিভাধর এমনি করে বোকা বনে অপঘাত লুঠছে তার হিসেব তো তোরা চাস না! এইজন্য, এরই জন্য কি সৃষ্টির সূর্য জ্বলেছিল!
উনিশশো বাহাত্তর। তিন বিখ্যাত ছাত্র নির্মলেন্দু লাল, প্রদীপ জানা আর মনোজিৎ বাগচি বেপাত্তা হল। নির্মল, যার পেপার মাত্র সতেরো বছর বয়সে বিখ্যাত জার্মান জার্নালে প্রকাশিত হয়ে বিশ্ববন্দিত হয়েছিল সে আমার চোখের সামনে বৃদ্ধ প্রিন্সিপালকে রিঅ্যাকশনারি বাস্টার্ড বলে ঠাশ করে এক চড় কশাল। পাইপগান তাক করে মনোজিৎ বলল, রেজিগনেশন লেটারটা পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে সই করে না দিলে গরম সিসেগুলো নাকি সোজা ওঁর বস্তাপচা ব্রেনের মধ্যে সেঁদিয়ে যাবে। তখনকার মতো সমবেত প্রচেষ্টায় তাদের নিরস্ত করা গেল। কিন্তু পরে কলেজ ক্যাম্পাসে যখন তিনি খুন হলেন সকলেই অনুমান করল এ ওই ত্রয়ীর কাজ। আমি অনুমান করতে চাইনি। মনোজিৎ আমার সবচেয়ে গর্বের ছাত্র ছিল। মহাশক্তিধর কলম ছিল তার। অধ্যাপক মহলে প্রদীপের নাম ছিল হিউম্যান কম্পিউটার। শ্রদ্ধেয় প্রবীণ শিক্ষাগুরুদের শেষ প্রজন্মের সঙ্গে সঙ্গে নিহত হল বিজ্ঞানী শিল্পী গণিতবিদের প্রতিভাধর নব প্রজন্ম। বিপ্লবের হাতে।
