ইদানীং যে সমস্ত পেশাদার নাটক চারদিকে হচ্ছে তাদের মধ্যে এটাই নাকি শ্রেষ্ঠ। কলকাতা রঙ্গমঞ্চের সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। নবযৌবন হলে রেকর্ড করা বা রেকর্ড ভাঙা উৎকর্ষের মাপকাঠি নয় জাতীয় ক্লিশে নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করতাম। কিন্তু এখন বহুজননন্দিত বস্তু মাত্রই বৈজ্ঞানিক কৌতূহল জাগায়। কী সেই সংজ্ঞাতীত রহস্যময় উপাদান যা জনগণেশ নামক অস্থিরমতি পাঁচমিশালি ব্যাপারটিকে দীর্ঘমেয়াদি সম্মোহনে রাখবার ক্ষমতা ধরে!
বিদেশি গাড়ির বিলাস-আসনে সাদরে বসিয়ে কিং সাইজ বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে মি. মান্না অর্থাৎ আমার মক্কেলটি বললেন, এ আপনার সো কলড এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারের আঁতলামো নয়, খাঁটি বনেদি জিনিস। শিশির ভাদুড়ি, ছবি বিশ্বেস ঘরানার। সহস্র রজনি তো কবেই পার হয়েছে। আরও কত রজনি রান করবে তার ঠিক নেই। দুর্দান্ত অভিনয় শুনছি।
থিয়েটার হলের সামনে পৌঁছে জনপ্রিয়তার লক্ষণ দৃষ্ট হল। প্রাগৈতিহাসিক মেরুদণ্ডী প্রাণীর কশেরুকা-শ্রেণির মতো গাড়ির সারি। হাউসফুল-বোর্ড টাঙানো হয়ে গেছে। অ্যাডভান্স বুকিং কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন। টিকিট ব্ল্যাক হচ্ছে। দেয়ালের গায়ে অতিকায় প্রাচীরচিত্র। তবে দামি নামের প্রধান কুশীলবদের নয়, এক ক্যাবারে নর্তকীর। খুব কসরতের ছবি। মুখের ডিটেল বাদ দিয়ে শুধু অবয়বহীন, লোভনীয় লাস্য-ভঙ্গি। মিস শর্বরী। তৎক্ষণাৎ সহস্র রজনি, শিশির ভাদুড়ি ঘরানা, দুর্দান্ত অভিনয় এই সমস্ত সম্প্রসারিত ভাবের সারমর্ম নির্ভুল উপলব্ধ হল। মনে মনে খুব এক চোট হেসে নিয়ে সামনের সারিতে মি. মান্নার মেদলগ্ন হয়ে বসা গেল। আসলে আইনের আড়াই চালে ভদ্রলোককে অনিবার্য ব্যাবসায়িক ভরাডুবি থেকে বাঁচানো গেছে, ভবিষ্যতের একটা পাকাঁপাকি বন্দোবস্তের ভরসাও করছেন, তাই কৃতজ্ঞতার চিহ্নস্বরূপ ভদ্রলোক রৌপ্য রেকাবিতে সোনালি তবক মোড়া যৌন উত্তেজনার নির্দোষ সুড়সুড়ি যখন-তখন উপহার দিতে চাইছেন। বিচক্ষণ লোক। কোন ক্ষেত্রে কোথায় থামতে হয় জানেন। শুধু ফি-তে কি আর এসব কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ হয়?
কাহিনিটাই একটা হোটেল নিয়ে। ক্যাবারে-পর্ব প্রায় সমস্ত নাটক জুড়ে। তবে এ নটী নায়িকা, উপনায়িকা এমনকি ভ্যাম্পও নয়, এর কাজ শুধু কারুকাজ। আবহসংগীতের মতো আবহনৃত্য। পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে মৌলিক এবং সাহসী। সর্বোপরি, মেয়েটির ভাইট্যাল স্ট্যাটিসটিক্স অবাক করবার মতো। একেবারে মন্দিরগাত্র থেকে কেটে তুলে আনা। ওই সাইজের ক্ষীণ কটিদেশ যে কি কায়দায় দু-প্রান্তের চমকপ্রদ পৃথুলত্ব ব্যালান্স করে রেখেছে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। এ রমণীর স্রষ্টাকে নির্ঘাৎ ফিজিক্সের অঙ্ক কষতে হয়েছে। মি. মান্নাও ব্যাপারটা লক্ষ করেছেন, সংক্ষেপে বললেন, ফাটাফাটি। আড়চোখে দেখলুম, নীচের ঠোঁটটা ঝুলে পড়েছে, চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। তবে অভিনয় সম্পর্কে উনি খুব একটা অতিশয়োক্তি করেননি। কাহিনিবিন্যাস, সংলাপ, অভিনয়, আলোকসম্পাত এবং আধুনিক মঞ্চের টেকনিক্যাল স্টান্ট সহযোগে সামগ্রিক যোগফল প্রশংসনীয়। পাকা হাতের কাজ। মঞ্চে যান্ত্রিক কলাকৌশল প্রয়োগকে যাঁরা অনাটকীয় মনে করেন এবং অভিনয়শিল্পকে পূর্ণ সুযোগ দেবার জন্য মঞ্চকে শেকসপিয়রীয় যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান, যখন অরণ্য লেখা নোটিশ ঝুলিয়েই দৃশ্য-পরিকল্পনার দায় চুকিয়ে দেওয়া হত আমি তাঁদের সঙ্গে একমত হতে পারি না। ইনটেলেকচুয়ালরা যা-ই-ই বলুন আমার ভালো লাগল।
শেষ অঙ্কের আগে যবনিকাঁপাত হয়েছে। মি. মান্না আমার হাতে ঠান্ডা পানীয়ের বোতল দ্বিতীয় দফা ধরিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণের জন্যে অদৃশ্য হয়েছেন এমন সময় জনৈক মঞ্চকর্মী আমার হাতে একটা চিরকুট দিয়ে গেল। সাজঘরের মধ্যে থেকে কেউ আমাকে সমাপ্তির পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যেতে বলছেন। সনির্বন্ধ অনুরোধ। যদি একলা এসে না থাকি সঙ্গী-টি অথবা-দের বিদায় করে যেন অবশ্যই এই কর্মীর সঙ্গে ভেতরে যাই।
নাটক শেষ হলে মি. মান্নাকে ব্যাপারটা খুলে বললাম। উনি বললেন, হুম। নাটকের মধ্যে নাটক। ডাকছে যখন, যাবেন বইকি! তা কিছু গেস করতে পারলেন না কি লেডিস না জেন্টস? আমি হেসে বললাম, না।
কৌতূহল হচ্ছে কিন্তু স্যার যাই বলুন, গাড়ি রেখে যাচ্ছি, নইলে ফেরবার সময় আপনি বিপদে পড়বেন। শোফারকে বলে যাচ্ছি, যখন যেখানে যেতে চান পৌছে দেবে। বাঁ চোখটা সামান্য টিপলেন মান্না, আমি একটা ট্যাকসি ধরে চলে যাচ্ছি। প্রচুর আপত্তিতেও ফল হল না। মি. মান্না আমাকে বাধিত করবেনই।
আইনজীবীর বৃত্তিতে মন্দ দিন কাটল না। এখন কৌতূহল উদগ্রতার স্ফুটনাঙ্ক স্পর্শ করে না। মানসিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলবার শিক্ষা আরও কয়েকটি স্বাধীন বৃত্তির মতো এ-বৃত্তিরও অন্যতম শর্ত। খেলার মধ্যে যে-কোনো রকম আবেগকে প্রশ্রয় দিলে ভরাডুবির শঙ্কা জেনে স্থির মস্তিষ্কে খেলা শুরু এবং শেষ করতে হয়। কিন্তু যবনিকার অন্তরালে সাজঘর কমপ্লেক্সের একটি একান্ত উইং-এ যখন পৃথিবীতে এত ব্যক্তি থাকতে সংহিতা দত্তগুপ্তর সঙ্গে সাক্ষাৎকার হল তখন বিস্মিত হলাম বললে কমিয়ে বলা হবে। হতভম্ব হয়ে গেলাম।
