সযত্নে মেক-আপ তুলে ফেলেছে। ক্রিমমাখা তেলতেলে মুখ। খোলা চুল। গেরুয়া রঙের শাড়ি আর লাল ব্লাউজ। সংহিতা আমার দেখে উঠে এল। কপালে সিঁদুরের তিলক আর হাতে একটা ত্রিশূল ধরিয়ে দিলে উপন্যাসে পড়া সুন্দরী ভৈরবীর বাস্তব সংস্করণ মনে হতে পারত। বিশাল বিশাল চোখ মেলে সত্যিকারের অবাক দৃষ্টিতে দারুভূত আমার দিকে তাকিয়ে সংহিতা বলল, সার, আপনি এখানে?
সামান্য রাগ হল। এটা শুড়িখানা না বেশ্যালয়? যে আমাকে এখানে দেখে এমন বড়ো বড়ো চোখ করবে সংহিতা! পরক্ষণেই অবশ্য বুঝলাম এখানে উপস্থিত থাকাটা গর্হিত এমন ইঙ্গিত করে আমাকে লজ্জা দিতে বেচারা চাইছে না। বহুদিন পর দেখা হলে পরিচিতজনকে তো আমরা প্রথম প্রশ্ন এই-ই করে থাকি। তুমি এখানে? কাজেই ইংরেজি হাউ ডু য়ু ডু-র মতো ওর প্রশ্নটা ওকে ফিরিয়ে দিয়েই আমি জবাব দিই। উত্তরের অপেক্ষা করছিলাম না। প্রশ্নটা নেহাত করার জন্যই করা। কারণ এতক্ষণে আমি বুঝেই গেছি নাটকের আবহরচনাকারী সেই কারুকুশলিনী ক্যাবারে নর্তকীটি সংহিতাই। বুঝেছি এবং বুঝে মর্মাহত হয়েছি।
সংহিতা বলল, কফি বলি? মান্নাসাহেবকে বাধিত করতে দু-বার চা দু-বার ঠান্ডা পানীয় হয়েছে, আবার কফি? সামাজিকতা দেখছি আজ আমার স্বাস্থ্য শিকার করেই ছাড়বে না। কিন্তু সামনে কোনো গরম পানীয় না থাকলে আলাপ জমা তো দূরের কথা, আরম্ভই যে হতে চায় না! অগত্যা বললাম, বলো।
আপনার কী খবর সার?
ভালো।
বউদি আছেন?
হ্যাঁ।
ছেলে-মেয়ে?
হ্যাঁ।
ক-জন?
একা।
প্রোফেশন চেঞ্জ করলেন যে?
এমনি।
ভালো লাগছে?
হ্যাঁ।
আমায় কিছু জিজ্ঞেস করবেন না?
অবশেষে সংহিতা হতাশ গলায় বলল, আমায় কি ঘেন্না করছেন সার?
না।
ঘেন্না করবার মতো কিছু কি আমি করেছি?
সংহিতা কারণ ছাড়াই উত্তপ্ত। বলে ওঠে, সকলেই তো কিছু না কিছু বিক্রি করে। আপনারা বিদ্যা বিক্রি করেন না? বুদ্ধি বিক্রি করেন না? ঈশ্বর যদি আমাকে শো-বিজনেসের মূলধন ছাড়া আর কিছু না দিয়ে থাকেন তাই দিয়েই তো সম্মানের অন্ন আমার জোগাড় করতে হবে?
সংহিতা তার পেশার সপক্ষে দীর্ঘ বক্তৃতা ভাঙা ভাঙা বাক্যে দিতে থাকল যেমন করে একদিন ও যুক্তিজালে ওথেলোর মহত্ত্ব ধূলিসাৎ করত, দ্বিতীয় এডোয়ার্ড-এ রানি ইসাবেলার সমস্ত দুষ্কৃতি পরিস্থিতির বিচারে ক্ষমার যোগ্য বলে ঘোষণা করত। অবিকল সেই ভঙ্গিতে। কিন্তু আমি তখন বহুদূর মনস্ক। স্মৃতি ট্রেকিং করছে আরোহ, অবরোহ, হিমবাহ সংকুল অতীতবত্মে, সেই সময়ে যখন আদর্শের জন্য মানবিক ক্ষুধা, সৃজনের রাসায়নিক তাগিদ, দিবারাত্রের জাগর স্বপ্ন প্রায়শই ঘনীভূত হয় নারীবিগ্রহে। যখন অন্বিষ্ট ছিল সংহিতা।
হ্যাঁ, সংহিতা আমার ছাত্রীই ছিল। উজ্জ্বল ছাত্রী। উজ্জ্বল বুদ্ধিতে। উজ্জ্বল ব্যবহারে। আর আকৃতি? এখন যে কোনারকের দেবনর্তকী, খাজুরাহোর যক্ষিণী তখন সে তার নবীন বয়সে অধ্যাপকের নবীন চোখে কী ছিল? অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে স্বীকার করছি, ক্লাসে ঢোকবার সঙ্গে সঙ্গে সংহিতা সম্মোহন চৌম্বক-স্পর্শে আমায় গ্রাস করত, আমার সকল গান তখন শুধু তাকেই লক্ষ করে, আবিষ্টের মতো শেষ করতাম বক্তৃতা, স্বপ্নচালিতের মতো স্টাফরুমে ফিরতাম। হাইড্রোজেন পরমাণুর একমেব ইলেকট্রনের মতো সংহিতা নিউক্লিয়াসের চারদিকে অমোঘ আকর্ষণে পরিক্রমা করত মন। আমায় জীবনের সবচেয়ে গোপন, সবচেয়ে সোচ্চার সেই সংহিতা-যুগ। গোপন, কারণ স্পর্শভীরু, মর্যাদাসচেতন অধ্যাপক ঘুণাক্ষরেও এ কথা কারও কাছে হাবে-ভাবে, বাক্যে-ব্যবহারে প্রকাশ করেনি, সোচ্চার কারণ নিজের কাছে ওই আকর্ষণের চেয়ে স্পষ্ট এবং জোরালো তার আর কিছু ছিল না। এইসব অনুভূতির কথা স্বীকার করতে ত্রাস হয় যখন বুঝি হিসেবি জজিয়তির পুরোনো অধ্যায়ের ব্যক্তিগত ছেড়া পাতা কত অর্থহীন দেখায়, কিন্তু যতই ওরা এসব দিয়ে মুদির দোকানের মুড়ির ঠোঙা বানাক, এই ছেড়া পাতাই যে আমাদের সাধারণ জীবনের অসাধারণ ছিন্নপত্র!
যাক, গোপন করার শত চেষ্টাও কিন্তু মহিলাদের প্রতিভার কাছে বিফল হয়ে যেতে বাধ্য। বিফল হয়ে যায় এটাই সুখ। সংহিতা বুঝতে পারত বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু কারও কাছে প্রকাশ না করে আমার বাঁচিয়েছিল, নইলে ক্লাসে নির্ঘাত প্রতিক্রিয়া দেখতাম। সংহিতার সঙ্গে আমার এই অপ্রকাশিত গোপন চুক্তি ছিল বড়ো আরামের। এ যেন একটা সুখের বল দিয়ে গৃহকোণে দ্বিপাক্ষিক খেলা। দুজনে দুজনের দিকে নিঃশব্দে বল গড়িয়ে দিই। বল তেমনি নিঃশব্দে ফিরে আসে। এটুকুকেই আমি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য ভূমিকা মনে করতাম এবং করে নিশ্চিন্ত থাকতাম। কারণ অধ্যাপক-ছাত্রীর সম্পর্কটাকে চট করে রোমিও-জুলিয়েট পর্যায়ে নিয়ে যেতে আমার মানসিক বাধা ছিল। অধ্যাপক মহলে, ছাত্র মহলে বেশ একটা দীর্ঘস্থায়ী, মুখরোচক কেচ্ছায় পরিণত হবার কোনো সাধ আমার ছিল না।
কানে আসত মেয়েটির গোপন নাম না কি ভ্যাট-সিক্সটি নাইন। সার্থকনাম্লী বটে। কিন্তু সে মত্ততা সংহিতা অমন অবলীলায় সঞ্চারিত করত তার দায়িত্ব তার স্বভাবে আদৌ ছিল না। বড্ড সৎ, আন্তরিক প্রকৃতির মেয়ে বলে মনে হত। সপ্রতিভ, প্রাণোচ্ছল, সচেতন কিন্তু প্রগলভ নয়। রূপের জন্য জীবনের কাছ থেকে বিশেষ কোনো অধিকার দাবি করত বলেও মনে হত না। ফস্টিনস্টির পাত্রীই নয়। ফস্টিনস্টিকারী কোনো এক এক যুবককে পায়ের চটি খুলে মারার অপরাধে একবার ছাত্র ইউনিয়নের দাবিতে তাকে এক মাস সাসপেন্ড করা হয়। এক মাস পরে কলেজে যোগ দিয়ে সংহিতা প্রথমে প্রিন্সিপ্যালকে তারপর ক্লাসরুমের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সহপাঠীদের জানায় যে শাস্তি সে গ্রহণ করেছে এবং আবার যদি কেউ তার সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করতে আসে সে ওই একই দাওয়াই-এর পুনরাবৃত্তি করবে।
