তুমিও করো ধ্যান, করো, করো।
সিনহাসাহেবকে দাঁড়িয়ে চোখ আধবোজা করতে হয়, ডিঙি মেরে মেরে তাঁর হাতের মুদ্রা ঠিক করে দেবার চেষ্টা করে দিতে থাকে ঝড়। দোতলায় বারান্দায় পৌঁছে তার আহ্বাদের সীমা থাকে না। দুরে বড়ো রাস্তার যানবাহনের ছবি একটুকরো দেখা যায় এ-বাড়ি ও-বাড়ি পাঁচিল টপকে টপকে। ঝড় ঘোষণা করে, বিলেত দেখা যাচ্ছে।
মোয়ারটা এবার চলছে। একটু মোবিল দরকার ছিল। দিতেই সরসর করে চলছে। দুজনে মিলে লনটা পরিষ্কার করে ফেললেন। যতক্ষণ না রোদ বুকে ওঠে ততক্ষণ একখানা বই কিংবা ম্যাগাজিন নিয়ে এখন লনে বসে থাকা যাবে। ঝড়টা ততক্ষণ করুক না হুটোপাটি। চাকা নিয়ে, বল নিয়ে, কিংবা নিছক নিজেকে নিয়ে, একটা ছানা বেড়ালের মতো!
এবং এ ভাবেই তাঁকে দেখে, অবাকতর অবাকতম হয়ে আবিষ্কার করে জগদীশ বেয়ারা। হাতে বাকসো, পরনে হেঁটো ধুতি, পিরান, আর ঘুঘু রঙের গরম চাদর, জগদীশ ফিরে আসছে। গলিতে ঢুকতেই অন্ধ গলির শেষে গেট দেখা যায়। গেটের ফাঁক দিয়ে দিয়ে উপছে পড়ে লনের সবুজ, সেগুন কাঠের পাট পাট দরজা। মাথায় রঙিন কাচের আলপনা। জগদীশ দেখে ছাঁটা ঘাসের ওপর ক্যাম্প চেয়ার পাতা, ঢোলা পাজামা, গরম পাঞ্জাবি পরে, কাশ্মীরি শাল লুটিয়ে, মুখে সিগারেট, বইয়ের পাতা উলটোচ্ছেন সিনহাসাহেব। পাকা চুলের কেশর, ঘাড় অবধি পড়ে কুঁকড়ে উঠেছে, কিন্তু ক্ষৌরি করেছেন। বেশ জলুসঅলা বুড়ো। পাকা আমটির মতো হয়তো নয়, তবে পাকা পেয়ারাটির মতো নিয্যস। গেট খুলে ভেতলে ঢুকে এল জগদীশ।
কেমন আছেন?
যেমন দেখছিস। দেশঘরের যত্ন আত্তি খাওয়া হল?
তা হল, পায়ের কাছটিতে বাকসো আর থলে নামিয়ে বসে পড়ে জগদীশ, কুক-কাম-বেয়ারা-কাম-মালি। বুড়ো, কিন্তু চালিয়ে যাচ্ছে এখনও।
ফিরলি যে?
ও মা যাব কোতায়? আর মন টেকে? লনের ঘাস কে ছাঁটল?—অবাক অবাক, খুশি-খুশি গলা।
এদিক ওদিক তাকালেন সিনহাসাহেব।
ঝড় আর আমি।
কে ডাকল, রাজির মা?
কাকে?
ওই ঝড় মিস্তরিকে? দূ
র—মিস্তিরি-ফিস্তিরি নয়, ও একটা ছোট্ট ছেলে, আমার কাছে থাকে। এই তো, ঝড়-উ, ঝড়ো-ও কোথায় গেলি?
এদিক ওদিক তাকিয়ে ঝড়কে তিনি দেখতে পেলেন না।
এই তো এখানে খেলছিল। দেখ দিকিনি, দেখ। এগিয়ে গিয়ে দেখ।
কিছুক্ষণ পর জগদীশ ফিরে এল।
সারা বাড়ি ঘুরে দেখে এলুম। ছোটো ছেলে-ফেলে কোথাও নেই।
বলিস কি রে?
ছড়িটি পাশে শোয়ানো। তুলে নিয়ে হাঁটতে থাকেন সিনহাসাহেব।
ঝড়-উ-উ। ঝড়ো-ও-ও-ও।
বাগানের এক কোণে তার জামা ইজের শুকোচ্ছিল, নেই। চাকা গড়িয়ে খেলছিল বারান্দায়, দাগটুকুও যেন কে সযত্নে পুঁছে নিয়েছে।
জগদীশকে সঙ্গে করে দোতলার আনাচকানাচও খুঁজে এলেন সিনহাসাহেব। সব ঘর খুলে খাটের তলা, আলমারির পেছন দেখে এলেন।
ঝড় একটা সাবানের বলের মতো উবে গেছে।
জগদীশ ক্রমেই গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। বললে, স্বপন দেখেছেন।
ভীষণ দুশ্চিন্তায় ভালো করে রাগ করতেও ভুলে যান সাহেব, ভাবিত গলায় বলেন, তোকে দেখে ভয় পেয়েছে, ব্যাটা বুড়ো ভাম…
তারপর আবার দুশ্চিন্তা তাঁকে পেয়ে বসে রাস্তায় বেরিয়ে যায়নি তো? গাড়ি ঘোড়ার রাস্তা…
ভীষণ সন্দিগ্ধ চোখ সাহেবের দিকে চেয়ে থাকে জগদীশ। চেয়েই থাকে। কিন্তু রাজির মা এসে যখন সাহেবের কথায় সায় দেয়?
দুধের ছেলে গা। পুঁটুলি নিয়ে এয়েছিল, কেমন সাজানা পুঁটুলি গা! যেন মা নিজে সাজিয়ে দিয়েছে। ভাত খেতে চাইলে, আমি বেঁধে দিই। সায়েব তাকে নিয়ে কত খেলা খেলেন, কত বাজনা শোনান, এটা কী ওটা কেন, ওমা! ক-দিন ঘরদোর মাত করে রেখেছিল যে! স্বপ্ন হবে কেন?
জগদীশ ভালো করে সব শুনল, বলল, তা হলে ভূত। ভূতে পেয়েছিল তোদের।
ওমা কী অলুক্ষুণে কথা!–রাজির মা তাড়াতাড়ি কাজ সেরে চলে গেল।
তখন জগদীশ দোতলার বারান্দার গ্রিল, সিঁড়ির, খিড়কির কোল্যাপসিবল সব লাগায়, তালা টেনে-টুনে দেখে। রোদ চড়তে না চড়তে সে উদভ্রান্ত সাহেবকে বারান্দায় তোলে, সব বন্ধ ছন্দ করে দেয় বেলাবেলি। বিমূঢ় সাহেবের দিকে চেয়ে বলে, খুব সময়ে এসে পড়েছি যা হোক।
ক্রমে বেলা গড়ায়, মেঝের কাচ-ঠিকরোনো আলোর ছায়া নাচে, চান হয়, লাঞ্চ হয়, দুপুরের এক টিপ ঘুম তাও হয়ে যায়। সন্ধেবেলা বোতল গেলাস সব সাজসরঞ্জাম রোজ দিনের মতো বার করতে যায় জগদীশ বেয়ারা। হাত নেড়ে না করেন সাহেব। পিয়ানোয় গিয়ে বসেন। অপটু হাতে পিয়ানোয় বিঠোফনের ঝড় তোলেন। অবশেষে নিত্যকার পাঁউরুটি-দুধের ডায়াবিটিক বরাদ্দ গলাধঃকরণ করবার পর শুতে যাবার সময় হয়। অনেকক্ষণ এ-পাশ ওপাশ করবার পর বৃষ্টি আসার মতো ঘুম আসতে থাকে ঝরকে ঝরকে। কোথাও কি কেউ কাঁদছে? ছোটো ছেলের কান্নার আওয়াজ শুনে মাঝ ঘুমে উঠে বসেন সিনহাসাহেব। উপবৃত্তাকার সব দালান বারান্দা পার হয়ে যান কান্নার খোঁজে। প্যাঁচানো প্যাঁচানো সিঁড়ি ওঠেন নামেন, মাঠের মতো অন্ধকার ছাদ, আগাছায় ছাওয়া বাগান সব পার হয়ে যান। কিছুতেই দিক ঠিক করে উঠতে পারেন না। শেষে না পেরেটেরে স্বপ্নের মধ্যে গুমরে গুমরে কাঁদেন। ছেলেমানুষের জন্যে বুড়ো মানুষের কান্না।
বেহুলার ভেলা
দীর্ঘ পনেরো বছর পর এক কৃতজ্ঞ মক্কেলের নিবন্ধাতিশয্যে বিখ্যাত পেশাদার রঙ্গমঞ্চে থিয়েটার দেখতে গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে সংহিতা দত্তগুপ্তর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। যাত্রা-থিয়েটার গানের আসর ইত্যাদি সাংস্কৃতিক চিত্তবিনোদনের অবসর বা সুযোগ কোনোটাই আমার আজকাল আর হয়ে ওঠে না। প্রত্যেকটি অনুপল বিপল ব্রিফ দিয়ে ঠাসা। কারণ শুধু অন্নচিন্তা নয়, অর্থলালসাকেও। পুরোপুরি দায়ী করা যায় না। আসলে, সব দায়িত্বশীল বৃত্তিরই আমিষাশী উদ্ভিদের মতো কতকগুলো আঠালো আকর্ষ থাকে যাদের সাহায্যে বৃত্তিজীবীকে ধীরে ধীরে তারা নিজস্ব পরিপাকযন্ত্রের কেন্দ্রে টেনে নেয়। উদ্ধারের আশা কম। কোর্ট অর্থাৎ মলে অর্থাৎ কেস অর্থাৎ সাফল্য অর্থাৎ আরও মক্কেল-কর্মের চক্রবৎ আবর্তন। এই ছাঁচে চলতে থাকে। কাজেই নেহাত ভালো ছবি-টবি এলে একে-ওকে-তাকে ধরে টিকিটের ব্যবস্থা যদি বা করে উঠতে পারি, থিয়েটার দেখা বহুকাল ছেড়ে দিয়েছি। তাই ক্লায়েন্ট ভদ্রলোক যখন অযাচিতভাবে সমস্ত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করে একেবারে রথ এবং সারথি নিয়ে উপস্থিত হলেন, না করিনি। থিয়েটার তো এককালে আমারও মগজে ঘুরঘুরে পোকার মতো ঘুরে বেড়িয়েছে।
