দিদি পারে।
অর্থাৎ পারে না, কিন্তু কবুল করবে না কিছুতেই। ভাঙবি তবু মচকাবি না! বটে!
সিনহাসাহেব, পেঁপে আলু পেঁয়াজ টোম্যাটো ফুলকপি সব ড্যাব ড্যাবা করে কাটেন ছুরি দিয়ে। গ্যাস জ্বালেন। প্যান বসিয়ে তাতে ডেলা ডেলা মাখন গলান তারপর আনাজের টুকরোগুলো দিয়ে নাড়েন চাড়েন, নুন দেন, জল দেন, মরিচ দেন, একটু ময়দা গুলে দেন দুধে। ফ্রিজ থেকে বার করে দুধ গরম করেন। টোস্টারে টোস্ট বসান।
ছেলে হাঁ করে দেখে পপ পপ করে তৈরি টোস্ট বেরিয়ে আসছে।
ওর মধ্যে কী আছে?—সে আঙুল দিয়ে টোস্টারটা দেখায়।
দানো আছে।—সিনহা হাসেন।
ছেলেটা বোঝে ঘন্টা। কিন্তু হাসে, সে-ও হাসে।
টেবিলে ম্যাট পেতে, দুটি প্লেট, দুটি বাটি, দুটি চামচ, দুটি গেলাস সাজান সিনহা, বলেন, দেখছিস?
ঘাড় মস্ত করে হেলিয়ে ঝড় নীরবে জবাব দেয়। সে দেখছে।
শিখছিস?
হ্যাঁ—অ্যা—অ্যা।
কাল টেবিল সাজাতে বললে পারবি?
হ্যাঁ-আ-আ।
আম্বা তো খু-উ-ব। হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা। দেখা যাক কী পারিস আর কী না পারিস। কী কী রান্না করলি আজকে?
পাঁউরুটি টোস, দুধ, ঝোল।
বাস বাস বাস। খুব বেঁধেছিস। এখন খেতে বোস।
ঝড় দু হাতে দুধের গেলাস ধরে খায়, ঠকঠক করে। ঠোঁটে দুধ লেগে যায়। তারপর দু হাতে কামড়ে কামড়ে টোস্ট খায়। সবশেষে স্টু খায়। একটা চমক লেগে থাকে তার দু চোখে।
ভালো বেঁধেছিস?
ফুলকপির ফুলের দিকটা কামড়ে ধরে, ঘাড় হেলিয়ে জবাব দেয় সে, ভালো। খাসা?
খাসা।
কালকে পারবি?
হুঁ-উ।
জগদীশের ঘরটায় রাত্তিরে ছেলেটাকে নিয়ে যান সিনহাসাহেব। ঠিক হবে কি বুঝতে পারেন না। তক্তপোশটা দেখান।—এইখানে শুবি রাত্তিরে, পারবি?
হ্যাঁ।
এবার হ্যাঁ-টা অত লম্বা নয় লক্ষ করেন সিনহা। জগদীশের কম্বল খুলে ছেলেটার গায়ে জড়িয়ে দেন।
ঠিক আছে?
হ্যাঁ।
শীত করছে না?
না।
তবে আমি যাই?
হুঁ-উ!
কিন্তু রাত্তিরবেলা ঘুমের খুব ব্যাঘাত হল সিনহাসাহেবের। মাঝে মাঝেই মনে হতে লাগল ছেলেটা ভয়ে কাঁদছে। তিনি উঠে উঠে দেখে এলেন। সে এক হাঙ্গামা। ঘর থেকে ঘর, তারপর দালান, তারপর খাবার জায়গা, তার ওপাশে জগদীশের ঘর। সুইচ জ্বালতে জ্বালতে যাওয়া, নেবাতে নেবাতে আসা। দু বার উঠেছিলেন, দু বারই দেখলেন অগাধে ঘুমোচ্ছে কুকুরকুণ্ডলী হয়ে। গোল গোল হাত পাগুলো সব লম্বাটে হতে আরম্ভ করেছে, কী মসৃণ! হাত বুলিয়ে দিলেন তিনি। বুকের ওপর কান পেতে ধুকপুক শুনলেন। তব ঘুম ভাঙল না ছেলেটার। ছেলেমানুষের ঘুম! ন্যাতা হয়ে গেছে একেবারে। কিন্তু আরও একবার কান্না শুনলেন তিনি। ঘুমের ভেতর। স্বপ্নের কান্না। স্বপ্নে শুনলেন, স্বপ্নেই সমাধান করলেন। সকালবেলা আর সেসব বৃত্তান্ত মনে রইল না।
পরদিন সকাল থেকেই ঝড় নিজের মতামত, ইচ্ছে-অনিচ্ছে বেশ জোরের সঙ্গে প্রকাশ করতে লাগল। যেমন ভোরবেলা উঠে সে তাঁর বারান্দার আমচেয়ারে শুয়ে দ্বিতীয়বার ঘুমিয়ে পড়ে। সিনহাসাহেবের ডাকে ঘুম ভেঙে চোখ কচলে প্রথমটা সে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। তারপর বেশ সপ্রতিভভাবে উঠে এসে ঘোষণা করে ঘরের মধ্যে গরম জলের কল খুলে সে চান করবে। সেইমতো চান করে পুঁটলির থেকে রঙচঙে জামা ইজেরটি সে পরে এবং সেই মুড়ির মোয়ার একটি সাহেবকে দিয়ে অন্যটি নিজে খেতে থাকে, সাহেব যখন বললেন তাঁর দাঁত নেই, সে টেবিলের ওপর থেকে ডেনচারের কৌটো নিয়ে আসে দৌড়ে। এটাই সম্ভবত সাহেবকে তার প্রথম সেবা। তা সত্ত্বেও যখন মোয়া সাহেব খেতে পারেন না, তখন সে সেই কামড়ানো এটোকাঁটা মোয়া অবলীলায় খেয়ে নেয়।
রাজির মা বেলায় এলে মুচকি হেসে সাহেব জিজ্ঞেস করেন, কোথা থেকে জোগাড় হল এত কাজের ছেলে?
রাজির মা অবাক। তারপর দেখেটেখে বলল, ও মা! এ কী কাজ করবে গো সায়েব, এ যে দুধের ছেলে?…এই। তোকে কে পেটিয়েছে?
ঝড় বারান্দার এক কোণ থেকে আর এক কোণে চাকা গড়াতে থাকে, কোনো জবাবই দেয় না।
কেউ আপনার অসুবিধের খবর পেয়ে পেটিয়েছে মনে হয়। এক হিসেবে ভালো হল। সঙ্গে থাকবে। দেখুন হয়তো বেয়ারাদাদুই পেটিয়ে দিয়েছে।
সে বাজার এনে দেয়। মুরগি, মাছ, পাঁউরুটি। রুটি গড়ে দিয়ে যায়। ঝড় বলে, ভাত খাব।
ওরে ছেলে! তোমার জন্যে এখন আমায় ভাত বসাতে হবে। বলে বটে, কিন্তু একবাটি ভাত সে করে রেখে যায়।
ঝড় বলে, ওপরে কী আছে? ওপরে যাব।
আমি আর ওপরে যেতে পারি না।
চলো না, আমি ধরে নিয়ে যাব।
অনেকদিন পরে সুতরাং দোতলায় ওঠেন সিনহাসাহেব। ঘরগুলো খোলেন একটার পর একটা। উঁচু উঁচু পালং। আলমারি। দেরাজ। টেবিল। সিন্দুক। সিঁড়ি বেয়ে পালঙ্কে উঠে যায় ঝড়, একটু শুয়ে নেয়। সাহেব অপেক্ষা করেন।
এর মধ্যে কী আছে?
জামাকাপড় … ফটো …
কার?
জেনির বোধহয়।
দেখব।
অগত্যা তিনি আলমারি খোলেন। থরে থরে শাড়ি, জামা, ন্যাপথলিনের ওষুধ ওষুধ গন্ধ ছাড়ছে। ফটো অ্যালবাম খুলে ছবি সব দেখাতে হয় ঝড়কে। দেরাজের দিকে আঙুল দেখায় ঝড়।
ওতে?
দরকারি কাগজপত্র, দলিল, দস্তাবেজ…
দেখব—
একটা ড্রয়ার খুলে কাগজের পাহাড় দেখান সাহেব। দেয়ালে-টাঙানেনা ছবির দিকে তাকায় ঝড়। ওরা কে?
ওটা বুদ্ধদেব।
হাঁসটাকে আদর করছে কেন?
লেগেছে, তির ছুড়েছে কেউ।
ওটা কে?
ওটা রামকৃষ্ণ ঠাকুর।
হাত অমন করছে কেন?
ধ্যান করছেন, ধ্যানে অমন হয়।
