লিমকার বোতল, হুইস্কির বোতল ভেঙে গড়াচ্ছে পানীয়ের তরল মিশেছে তার সঙ্গে; ঘরময় তীব্র অ্যালকোহলের গন্ধ। সকাল, কিন্তু টিউব লাইটটা দগদগে ঘায়ের মতে জ্বলছে।
সিনহাসাহেব কোনোমতে নিজেকে টানতে টানতে বারান্দায় দরজায় এনে ফেললেন, দরজা খুললেন। রাজির মা।
মাথায় কাপড় টেনে, কোমরে কাপড় গুঁজে রাজির মা অবাক চোখে সায়েবের দিকে তাকিয়ে ঢুকে এল।
সিনহাসাহেব দেখলেন—তাঁর অঙ্গে থ্রি পিস স্যুট, জুতো মোজা…কোটময় বিশ্রী সব দাগ। মুখের অবস্থাও নিশ্চয়ই তথৈবচ। রাজির মা ঘরের খোলা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। তাড়াতাড়ি বালতি আনল। ভাঙা কাচ, আধ ভাঙা বোতল তুলছে, ঝাড়ছে ঘর, পুঁছছে। বিছানাটা নিভাঁজ নিপাট হরেই আছে, তবু একবার টেনেটুনে দিল। তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, বেয়ারাদাদু কোথায় গেল আবার?
কে জানে কোথায় বেরিয়েছে!
খিড়কির দোরে তালা মেরে বেইরেচে দেখচি।
চমকালেন সিনহাসাহেব।
রাজির মা বলল, আপনি চানে যান, আমি দেখছি।
অনেকক্ষণ ধরে চান করে, ওয়ার্ডরোব খুলে ধবধবে পাজামা, গরম পাঞ্জাবি বার করে পরলেন সিনহাসাহেব। পরতে পরতে মনে হল স্বপ্নটা স্টালিনগ্রাড, ফেয়ারওয়েল টু আর্মস, ব্রিজ অন দা রিভার কোয়াই—এইসব ছবির তালগোল জগাখিচুড়ি। কী যে দেখেছিলেন। কেন দেখেছিলেন কে জানে! জেনি জেনি বলে চেঁচাচ্ছিলেনই বা কেন? কেউ যদি শুনে ফেলত! জেনি বলে কাউকে তিনি বাস্তবিকই চেনেন না।
গায়ে কুলুর যাপার জড়িয়ে, চুল আঁচড়ে ভদ্রলোক হয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখেন রাজির মা ভীত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
বেয়ারাদাদু চলে গেছে গো সায়েব।
মানে?
ওর ঘরে, বাক্স-টাক্স কিছু নি। দেয়ালের হুকে নুঙি, গামছা ঝুলত, সব ফাঁকা, ফর্সা। আপনাকে কিছু বলেনি?
মাথাটা শুধু নাড়ালেন সিনহাসাহেব। তিনি বারান্দার আরামচেয়ারে বসলেন। সামনের দরজা খোলা। অকেজো লন মোয়ারটা পড়ে আছে।
রাজির মা টোস্ট দিল, চা দিল, দুধ দিল। দুপুরবেলা দুধ পাঁউরুটির ব্যবস্থা করে দিল। বাড়ি থেকে ছুটে ছুটে এসে বিকেলের চা দিয়ে গেল। রাত্তিরেও দুধপাঁউরুটি ঢাকা রেখে দিল। সিনহাসাহেব নিজে ওষুধ বার করে করে খেলেন।
রাজির মা বলল, দেখি একটা লোক জোগাড় করতে পারি কি না ঢ্যাঙা বাড়িগুলোর মাথায় রোদ টলটল করছে, লনে ছায়া। যদ্দূর পারে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে রাজির মা চলে গেল।
দুদিন কি তিনদিনের মাথায়, তখন প্রথম শীতের অকাল গোধূলি। সিনহাসাহেব বারান্দায় বসে বসে দেখলেন গোধূলি মাখানো পথটি মাড়িয়ে মাড়িয়ে একটি শিশু আসছে। শিশু? না বালক? বালকই, কিন্তু সিনহাসাহেবের কাছে শিশুই। শিশু তেমন করে তিনি জীবনে দেখেননি। শিশুতে বালকে তফাত তাঁর বৃদ্ধ মগজের গলিঘুজির মধ্যে হারিয়ে গেছে।
তিনি দেখলেন, গোধূলির জমাট অংশটি দিয়েই নিটোল হাত-পাগুলি গড়া। জলের মতো চোখ, ঘাসের মতো চুল, মোয়ার দিয়ে ছাঁটা ঘাস। দু-চার গুছি অবাধ্য দুবেবাঘাসের মতো গিঁটগ্রস্ত হয়ে কপালের দিকে বেড়ে এসেছে। হাতে পুঁটুলি, গোধূলি শিশুটি বারান্দায় উঠে এল।
তুই কে?–যেন স্বপ্নের ঘোরে জিজ্ঞেস করলেন সাহেব।
আমি ঝড়।
কোত্থেকে এসেছিস?
ওই তো—একটা দিক সে দেখাল ঠিকই, কিন্তু সেটা কোনদিক, কোনো বসতি নির্দেশ করছে কি না, সিনহাসাহেব ভালো বুঝলেন না। তাঁর মনে হল শিশুটি বুঝি ওপর দিকে আঙুল দেখাল। এখন, তার কী মানে হতে পারে, তিনি জানেন না, গ্রাহ্য করেন না।
তোর পুঁটুলিতে কী আছে?
পুঁটলির গিঁট খুলে ফেলল সে। ভেতরে একটি রংচঙে জামা, একটি লংক্লথের দড়ি পরানো ইজের, একটি লাটু-লেত্তি, একটি চাকা এবং দুটি মুড়ির মোয়া।
তোকে কি রাজির মা পাঠিয়েছে?
হাঁ করে চেয়ে রইল।
দুর হাবলা ছেলে, কাজ করবি কী করে?
এটা কী?-ঝড় হাত সোজা করে সামনে বাড়িয়ে আঙুল দেখিয়ে বলল।
পিয়ানো। একে কটেজ পিয়ানো বলে। এই দেখো।
সামনের টুলে বসে চাবি টিপলেন সিনহাসাহেব। দু হাতে।
ঝড় অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
থরো থরো অনভ্যাসের আঙুল থেকে ক্রমে শীত ঝরে যায়। বসন্ত আসে। ভুলে যাওয়া সুরগুলো মগজ থেকে হৃদয় পেরিয়ে আঙুল বেয়ে ঢুকে যায়, পিয়ানোর চাবি থেকে অবিশ্বাস্য স্থৈর্য আর মিষ্টত্ব নিয়ে বেরিয়ে আসে।
মোজার্ট-বল মোজার্ট…
মোদজাট-ঝড়ু বলে, জলের চোখে তাকায়।
ওটা কী?–
ঝড়র আঙুল এখন ওপর দিকে।
শ্যান্ডেলিয়র। ঝাড়বাতি।
বাতি? জ্বলে না।
বালব নেই সব। দেখি। সুইচ টেপেন সাহেব। কয়েকটা বাতি জ্বলে ওঠে। যথেষ্ট ঝলমল করতে থাকে। ঝড় মুখ উঁচু করে তাকিয়ে থাকে।
দেরাজের ওপর ফটো। সে দিকে তাকিয়ে ঝড় বলে, ওটা কে?
ওটা জেনি-মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বলেন সিনহাসাহেব। তিলোত্তমা সিনহার ছবিটাও তাঁর দিকে তাকিয়ে যেন হাসিটা ফিরিয়ে দেয়।
কী বোঝে ঝড় কে জানে, কিন্তু একবার সাহেবের দিকে তাকায়, একবার তিলোত্তমার ছবির দিকে তাকায়। সে-ও হাসে। জলের মতো হাসি।
রান্না করতে পারিস?
হ্যাঁ—আ-আ।
অ্যাত্তোবড় করে মাথাটা হেলায় ঝড়।
কী রান্না করবি?
ছেলেটাকে নিয়ে রান্নাঘরে যান তিনি। আনাজপাতি কিছু কিনে রেখে গেছে রাজির মা। বলেন আমি কেটে দিচ্ছি, গ্যাস জ্বেলে দিচ্ছি-তরকারি করতে পারবি তো?
এইবার ছেলে বলে, মা পারে।
মা পারে, তুই পারিস না?
