রংগুলো মাড়িয়ে মাড়িয়ে, বুড়ো বয়সের পাতলা চামড়ায় মেখেজুকে ঘরে গেলেন সিনহাসাহেব। একতলার ঘর বলে আঁধার লাগে, না বাইরের আলো থেকে এসেছেন বলে, বুঝতে পারেন না সিনহাসাহেব। বড্ড যেন ঘোর লাগছে। নইলে নাতি তাঁরও আছে। মুসৌরি থেকে সোজা স্কলারশিপ নিয়ে ক্লার্কে পড়তে গেল, সেখান থেকে জার্মানি। ছোটো ছেলেটা কোনোদিন আর মা-বাবার কাছে ফিরে আসেনি। ছোটো ছেলের ঘরের ছোটো নাতিটি পাহাড়ে চড়ে। এটাই নাকি তার পেশা। এভারেস্ট চড়তে বছর কয়েক আগে এসেছিল। সে সময়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যায়। নিজের নাতি বলে কোনো টানই অনুভব করেননি সিনহাসাহেব। চিনতেই পারেননি। পুরোদস্তুর জার্মান সাহেব একটি। কিন্তু যতই হোক তাঁর নাতিই তো! নাতি-নাতনি তাঁরও আছে। ওই বারান্দার মেঝেতে রঙিন আলোর কুচির মতো, ধরতে গেলেই ফসকে যায়।
কষকষে গরম জলে চান করেও, এই দুপুরের দিক থেকে শীত শীত লাগতে থাকে সিনহাসাহেবের। ঘরদুয়োর আটকাঠ বন্ধ তবু যে কোত্থেকে ঠান্ডাটা আসছে ধরতে পারেন না তিনি। দুপুরের খাওয়া খেতে কোনোরকমে রান্নাঘরের সামনে পাতা টেবিলে যান। গরম গরম মুশুর ডালের সুপ, বরাদ্দের দু খানা রুটি, দু পিস মাছ খেতে থাকেন। একবার কড়া গলায় জিজ্ঞেস করেন, কী রে কুক কাম বেয়ারা, বুড়ো চোর, নিজের জন্যেও কি এই পিণ্ডিই রান্না করেছিস?
আমার তো আর চিনি নেই রক্তে, আমি কেন পিণ্ডি খেতে যাব শুধুমুদু?
তবে? কী করেছিস নিজের জন্যে? বিরিয়ানি, কালিয়া? কোফতা কাবাব?
বিরিয়ানি-মানি মুখে রোচেই না…নিস্পৃহ মুখে জবাব দিল জগদীশ।
তবে?
একবাটি ডাল আর ডুমুরের ঘ্যাঁট সাহেবের পাতের পাশে নামিয়ে রাখল জগদীশ। বলল, এই তো।
এঃ। বাগানের সেই ডুমুরঘন্ট! বারো মাস ছত্রিশ দিন এই-এ রান্না করবি?
হপ্তায় এক দিন তো বাজার যাই, কত দিন থাকে সবজি? ছ-দিন হল, আবার কালকে যাব। বাঁধাকপি আনবখন।
কেন ফুলকপি কি করেছে?
প্রেশার চড়ে কেন?
ধ্যাত্তেরি তোর প্রেশার। মাছের চপ করতে বলছিলুম যে!
সন্ধেবেলায় দেব।
সন্ধেবেলাও খাব, এখনও খাব।
এখন খাবার মতো নেই।
কেন? করলি তো অনেক, কত খাবি একা, ব্যাটা বুড়ো ভাম?
নাতিটা এয়েছিল, গোটা কতক দিয়েচি…
অ, নিজে খাবি, নাতিকে দিয়ে সাবড়াবি, তারপর পাত কুড়োনো যা থাকে কোনোরকমে আমাকে দিবি?
বাঁকা কোমরে যথাসম্ভব তড়বড় করে কিচিনে ঢুকে যায় জগদীশ, দুটো নারকোল দু হাতে ধরে টেবিলের সামনে এনে রাখে। সংক্ষেপে বলে, এনেচে।
আড়চোখে সেদিকে চেয়ে সাহেব বলে, বা বা বা। আমার রক্তে চিনির ছুতোয় নারকোলগুলো তো তোর গবভেই যাবে। মাঝখান থেকে আমার চপগুলো হাওয়া হয়ে গেল।
জগদীশ ফুঁসছে। জোরে জোরে তার নিশ্বাস পড়ছে খেয়াল করে, হাসিটা লুকিয়ে ফেলেন সিনহাসাহেব। ফোঁস ব্যাটা ফোঁস। ফোঁস, ফোঁস, ফোঁস।
দিনের বেলায় যেমন তেমন। সুযি ডোবার পর থেকেই সিনহাসাহেবের মেজাজ অন্যরকম হতে থাকে। থ্রি পিস স্যুট ওঠে অঙ্গে। কড়কড়ে শার্ট। জববর একাখানা টাই। চকচকে মকরমুখো ছড়িটা নিয়ে জুতো মোজা পরে মসমস করে সাহেব বারান্দায় বেড়াতে থাকেন।
কে রে? কে ওখানে?
গম্ভীর গলায় হাঁকডাক।
ঘরে টিউব লাইট জ্বলে। একহারা ইংলিশ খাটটিতে ধবধবে বিছানার ওপর ফুলকাটা সুজনি পাতা, পুরোনো আসবাবগুলি ঝেড়ে পুঁছে ঝকঝক করছে। দেরাজের ওপর কাটাপ্পাসের ফুলদানিতে বাগানের লিলি। ঘরের দরজা খোলা, বারন্দায় টবের গাছগুলি দেখা যেতে থাকে।
টেবিলের ওপর সোনালি পানীয়, লিমকার বোতল, অনেক যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখা কাচের পানপাত্র, প্লেটে গরম গরম মাছের চপ। জগদীশ চুল ক-গাছি আঁচড়ে, ধবধবে উর্দি ওপর-গায়ে, মাদ্রাজি লুঙ্গি বাঁকা কোমরে তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে। হাতে ছোট্ট ট্রেতে এক গেলাস জল। একটা ওষুধ খাবেন সাহেব।
ওষুধটা খেলেন। জল খেলেন এক ঢোঁক। তারপরেই মেজাজটা কী রকম তিরিক্ষি গোছের হয়ে গেল। বাকি জলটা জগদীশের উর্দি লক্ষ্য করে ছুড়ে দিলেন। ফোঁস ব্যাটা, ফোঁস, ফোঁস।
এ কী? এ কী? কী করছেন?
যা যাঃ, নাতির কাছে যা…
মুখের লালচে রঙটা আরও ঘোর। বোতল গেলাস ঘেরা, স্যুট-টাই পরা যেন একটা শয়তান বসে আছে।
দূর। দূর এ বুড়ো যমের কাচে কাজ করা ঝকমারি বিড়বিড় করতে করতে উর্দির বুকের কাছটা উঁচু করে ধরে ঘর থেকে ছিটকে গেল জগদীশ।
কী বললি? কী বললি?
বলচি—এই বুড়ো যমের ভীমরতি হয়েছে—এখানে থাকা ঝকমারি,–চেঁচিয়ে খিচিয়ে উঠল জগদীশ।
যা যা তবে … নাতির কাছে যা … ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচাতে লাগলেন সিনহাসাহেব। নিজের ঘরে গিয়ে উর্দি ছাড়তে ছাড়তে রাগে গরগর করতে লাগল জগদীশ। বেতো শরীরে শীতের সন্দেয় জল, আবার এঁটো জল। সে সাঙ্ঘাতিক চটে গেছে। মদো বুড়োর লালা মাখা জল। ছি ছি ছি। ঘেন্নায় গা শিরশির করছে তার। মরো এখন সন্ধের ঝোঁকে চান করে। মরি বাঁচি করে সে গায়ে জল ঢালতে থাকে। জল ঢালতে থাকে, জল ঢালতে থাকে।
মাঝরাত্তিরে একবার সিনহাসাহেবের মনে হয়েছিল তিনি জেনারেল মানেকশ, যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে আছেন। আশেপাশে বোমার সপ্লিন্টার। লাশের গাদায় তিনি পড়ে আছেন। তাঁকে মৃত ভেবে চলে গেছে সব। প্রাণপণে একটা নিরাপদ জায়গায় যাবার চেষ্টা করেন তিনি সে সময়ে। পা দুটো যাচ্ছেতাই ভারী। মাথাটা তুলতে পারছেন না। তবু, বীরপুরুষ তো। এক সময়ে তাঁকে নিয়ে তাঁদের নিয়েই কাব্য লেখা হত, ছবি আঁকা হত। শত্রশিবিরের সীমানা থেকে আহত শরীর নিয়ে পালিয়ে আসতে থাকেন তিনি। দৈত্যের চোখের মতো আলো জলছে একখানা। তার সামনে নিয়ে পালানো চাট্টিখানা কথা নয়। তবু তিনি পালান। কিন্তু শেষরক্ষা সম্ভবত হল না। কারণ যতই এগোন, সেই একই কাঁটাতারের বেড়া, একই দানোচোখো আলো। একই বোমার সপ্লিন্টার চারদিকে ছাড়িয়ে থাকে। অবশেষে প্রবল আওয়াজ করে শত্রুপক্ষের জিপগুলো তাঁর দিকে গড়িয়ে আসতে থাকলে জেনি জেনি বলে চিৎকার করতে করতে তাঁর ঘুম ভাঙে। তিনি বুঝতে পারেন কেউ প্রাণপণে বাইরের দরজা ধাক্কাচ্ছে।
