আজ্ঞে আমার নাতিটা এয়েচে। বকুলতলায় দাঁড়িয়ে আচে।
যাও, তাড়াতাড়ি শুনে এসো, দেখো আবার ভেগে যেও না। ডেকে যেন পাই।
গজগজ করতে করতে বাগানে নেমে গেল জগদীশ। দূরপাল্লার বাসে চড়ে, সাত রাজ্যির ধুলো খেতে খেতে নাতিটা এল, হাতে বোঝা, তা নাকি তাড়াতাড়ি শুনে এসতে হবে। মরণ অমন সায়েবের! সে নিয্যস সময় নেবে। একটা কথা সাতবার শুধোবে। নিজের তো ভিটেয় পিদিম দেখাতেও কেউ নেই। সেবার মেমসায়েব মারা গেলেন তবু একবার কেউ এল না, একজন নাকি থাকে অস্ট্রেলিয়া আরেক জন জার্মানে। ছেলেপুলে, নাতিনাতনি বুড়ো সায়েবেরও কি আর নেই। কিন্তু সায়েবগুলোর সব থেকেও কেউ থাকে না। কেউ নেই বলেই, মেমসায়েবের কথা স্মরণ করে এই অখাদ্য বুড়োর সেবাযত্ন সে করে যাচ্ছে, আজ কত বচ্ছর! রক্তে চিনি, গাঁটে ব্যথা, আদ্দেক জিনিস খাওয়া বারণ, বুকের কষ্ট, প্রেশার, কী নেই। তবু সন্ধেকালে ক পাত্তর ঢুকু-টুকু না হলে বাবুর ঘুম হবে না। কাচের বাসনে ছাড়া খাবে না, রুপোর গেলাস, রুপোর পট নইলে চলবে না, বিছানাতে একটি কোঁচ থাকবে না। জামাকাপড় সব টিপ-টপ, যখনকার যেমন তখনকার তেমনি চাই। বুকের ভেতরটা খুঁচিয়ে সে টের পায় মায়াও পড়ে গেছে খানিক। যতই হোক। সাহেবটার সঙ্গে তার নিজের এখন কী-ই বা তফাত! দুজনেই বেতো খুঁতো বুড়ো। সাহেবের কিছু হলে যেমন সে দেখে, তার কিছু হলেও তেমনি সাহেবের হোমিয়োপ্যাথিকের গুলি আছে। বড়ো ডাক্তারের বাড়া হয়েছে এদান্তে সাহেব। এই তো, সকালের কাগজটি বাসি হতে-না-হতেই আতশ কাচ আর হোমিয়োপ্যাথিকের মোটা বইখানা নিয়ে বসবে। দুই বুড়োর দাঁত কনকন, কান কটকট, জ্বর-জ্বারি, কষা পেট, আলগা পেট, তেতো মুখ, ম্যাজম্যাজ, মাথা ধরা, সর্দি সব কিছুর দাওয়াই ওই মোটা বইয়ের পেট থেকে বেরোয়।
নাতির কথায় চৈতন্যে ফিরে আসে জগদীশ, মা বলছিল, একবার যদি হিমের শুরুতে যাও। রস খেতে যাবে তো সেই হিম পড়লে। নাতিটা ঘ্যানঘ্যান করে।
কেন রে? এদিকে যে আমি নইলে সংসার অচল। কীসের দরকার তোদের?
পুকুরের মাছ চুরি হয়ে যাচ্ছে, ফলপাকড় এনতার যে পাচ্ছে নিচ্ছে—মা বেধবা মানুষ! কেউ ভয়-ভীতি করতে চায় না।
অ, তা যাবখন। খুব ধমক দিয়ে আসব সব ছিচকে চোরগুলোকে ডেকে। নাকি রে?
জগদীশের মুখে খুশি খুশি হাসি। কৌতুকটুকু ধরতে পারে না নাতি। বলে, হ্যাঁ চোর-জোচ্চোর আবার ডেকে পাওয়া যায়। তুমিও যেমন ঠাকুর্দাদা!
পেছন দিক দিয়ে খিড়কির দিকে আয় দিকি একবার—জগদীশ বলে, আমি সদর দিয়ে যাই। গিয়ে হুড়কো খুলে দিই।
বারান্দায় উঠে জগদীশ দেখল সায়েব মুখে কাগজ-চাপা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। নাক ডাকাচ্ছে বিচ্ছিরি আওয়াজে। নইলে মনে হতে পারত মটকা মেরে আছে। বুড়ো পাজি তো কম নয়। জগদীশ যেন তার বেয়ারা নয়, বিয়ে-করা পরিবার। চক্ষে হারাচ্চে। এই জগদীশ আর সেই জগদীশ। জগদীশ কোথায় যাচ্চে, কতক্ষণে ফিরল—এসব লক্ষ রাখাই যেন তার জেবনের সবচেয়ে বড়ো, কিংবা একমাত্তর কাজ।
কিচিনের জানালা দিয়ে নাতিটাকে বাগানে ঘুরে বেড়াতে দেখল জগদীশ। ঘুরে ফিরে দেখচে। দেখার আর আছেটা কী! আসত মেমসায়েবের সময়ে! গোলাপে গোলাপে আলো বাগান দেখতে পেত। এখন ওই বকুল, একটা কলকে, কটা পাতাবাহার শত অযত্ন আছেদ্দাতেও মরে না, আর কিছু ফ্যাকাশে দোপাটি। বর্ষার পরেই শুয়ে পড়ে।
খিড়কি খুলে ইশারা করে সে। নাতিটা ঢুকে আসে। আহা ছেলেমানুষ মুখখানা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। সোজা পথ! ফ্রিজ থেকে অরেঞ্জ স্কোয়াশের শরবত করে দেয় সে। মাছের চপ গড়া আছে, বুড়ো সন্ধেবেলা পাত্তর চড়াবে, তখন লাগবে। তা তার হয়েও বেশি আছে। কখানা ভেজে দেয় সে নাতিকে।
বড্ড ভালো হয়েছে গো ঠাকুরদাদা, তুমি করেচো?
না তো কি ওই বুড়ো সাহেব করবে?–নাতি ঠাকুরদাদা হাসতে থাকে দুজনেই।
গাঁয়ে গিয়ে তুমি আমাদের এমনি চপ করে দেবে?
এমন মাছ কি সেখানে পাব ভাই?—জগদীশ আক্ষেপ করে। চুনোপুঁটি খয়রা-খলসে কুচো চিংড়ি দিয়ে তো আর চপ হয় না। পলিথিনের ব্যাগে চারখানা আরও মুড়ে দেয় জগদীশ।
যা ছোটোকাটার জন্যে নিয়ে যা।
পলি-প্যাক নিজের ঝোলায় পুরে নাতিটা ক্রমে চলে যায়। দু-তিনবার করে ফিরে ফিরে ঠাকুরদাদাকে দেখতে দেখতে যায়। আহা বড্ড মায়া ছোঁড়াটার। বয়সটা এখনই একটু ফাঁকা ফাঁকা আছে, এ সময়টাই বুড়োবুড়িদের একটু কাছ নেওটা হয় ছেলেপেলে। এ বয়সটা কেটে গেলে, সংসারের জোয়াল ঘাড়ে পড়লে আর চোখ-কানে দেখতে পাবে না। তখন…
রাজির মা ঘর-দোর ঝাড়তে পুঁছতে এয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে থেকে সব না করালে মাঝখান দিয়ে ন্যাতা টেনে চলে যাবে। পেছনে পেছনে দোতলায় উঠতে থাকে জগদীশ।
আমি করে নিচ্ছি, যাও না গো দাদু, নিজের কাজে যাও—রাজির মা মুখ ঘুরিয়ে বলে।
আমার ওপরে কাজ আচে—গম্ভীর মুখে জগদীশ ওপরে উঠতে থাকে। কে জানে আজকে আবার কিছু সরাবার মতলব নিয়ে এসেছে কি না! বড্ড যেন উৎসাহ! ফ্রিজে রাখা দুধগুলো তো খেয়ে খেয়ে সেরে দিলে।
জগদীশ! জগদীশ …সায়েব ডাকচে। ডাকুক, দরকারে তো ডাকছে না। ডাকচে স্বভাবে। এখন সে সাড়া দেবে না।
বারান্দার আরামচেয়ারে পড়ে থাকলে বেলা বারোটা নাগাদ রোদটা হাঁটি-হাঁটি করে উঠে এসে ঠিক কপালের মধ্যিখানে ছ্যাঁকা দেয়। এখন লাঠিটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে। বারান্দার দিকে সেগুন কাঠের পেল্লাই দরজা। এইটি তাঁকে এবার বন্ধ করতে হবে। লম্বা পেতলের ছিটকিনি। ওপরে, নীচে। নীচেরগুলো আর এখন লাগানো হয় না। দরজার কপাট বন্ধ করতে না-করতে ওপরে রঙিন কাচগুলো থেকে বর্ণিল ঝরনা কিলবিলিয়ে পড়তে থাকে বারন্দার কোলে। সাহেবের সাদা মাথায়, রঙিন জোববায়। নীল আলো, সবুজ আলো, হলুদ আলো।…সিনহা সাহেবের ছেলেরা। আর্মিতে ছিল একজন। প্লেন ক্রাশে মারা গেল। ফ্যামিলি এখন অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। চোখে দেখেননি, কিন্তু নাতি তাঁরও আছে। মেঝের ওপর হলুদ কাচের আলোর মতো। স্পষ্ট, তবু নাতি তো। ছবিতে চেনেন! গত বছর বিয়ে করল, ছবি পাঠিয়েছিল।
