চা-টা ঢেলে দে, বিরক্ত গলায় বলে সাহেব।
কষ্টে কোমর নুইয়ে ফুলকাটা সোনালি বর্ডার বোন চায়নার মধ্যে দু চামচ দুধ ঢালে জগদীশ, তারপর রুপোর পট থেকে চা ঢালতে থাকে। ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে চায়ের লিকর ট্রে-ক্লথে। ভুরু কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে আছে সায়েব। চশমাটা পরা থাকায় ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছে না। জগদীশ একেবারেই দেখে না। তার এক চোখে ছানি।
এ কি? লুঙি পরেছিস কেন? হঠাৎ সায়েবের বিরক্তিটা ফেটে বেরিয়ে পড়ে,–ডিসগাস্টিং!!
জগদীশের ওপর-গায়ে উর্দি। অনেক দিনের পুরোনো, সুতো-ওঠা। তবু সাফ। কিন্তু কোমরে জড়ানো বাঁদিপোতার গামছার মতো নিখাদ লুঙ্গি। বাঁকা কোমরের উপর লুঙ্গি কষি টেনে বাঁধে জগদীশ।
পাতলুন আর পরতে পারিনে।
তা পারবি কেন? দিন দিন যেন… চায়ে আলগা চুমুক দেন সাহেব। জগদীশ জবাব দিল না।
ডিসগাস্টিং! বললেন সিনহাসাহেব, তারপর নাক কুঁচকে আবার চায়ে চুমুক দিলেন।
চিঠিপত্তর কিছু আছে?
উর্দির পকেট থেকে দুখানা অন্তর্দেশীয় পত্র, আর একটা পোস্টকার্ড বার করল জগদীশ।
এভাবে চিঠি দিতে কবে থেকে শুরু করলি? গেল কোথায় স্যালভারটা?
অত রুপো আর বার করতে সাহস পাইনে। যা চোরের উৎপাত?
বলি ভোগ করবে কে?-কুটি ক্রমেই ঘোর হচ্ছে সাহেবের।
জগদীশ চিঠিগুলো পাশ-টেবিলে রেখে ব্রেকফাস্ট-ট্রে নিয়ে পাতিহাঁসের মতো নড়বড় নড়বড় করতে করতে চলে গেল। সাহেবের চোখের আড়ালটুকু হওয়ার ওয়াস্তা। মুখ নেড়ে ভেংচে উঠল।
রুপো পালিশ করতে করতে গা-গতরে ব্যথা হয়ে গেল, তবু ছাড়বেনি, সায়েব তো নয় যম।
সাহেবের সম্পর্কে শ্রদ্ধা, সমীহ এই বছরখানেক হল যেন উবে যাচ্ছে জগদীশের। হবেই। সম্পর্কের রজতজয়ন্তী তো। একটা না একটা চেঞ্জ হবেই। তা নয়তো সাহেবের এমন চড়া গলা মেজাজ যেমন সে কল্পনা করতে পারে না, তেমনি আড়ালে হলেও সে সাহেবকে ভ্যাঙাচ্ছে এমন দিন আসবে তা তার ভাবা ছিল না। কত রাশভারী ছিল সাহেব! চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা যেত না।
ভুরু কুঁচকে একখানা অন্তর্দেশীয় পত্র তুলে নিলেন সিনহাসাহেব। চিঠি ঘেঁড়ার জন্যে পাতলা রুপোর পেপারকাটার আছে একটা, সেটাও বোধহয় সিন্দুকে উঠেছে। ফ্যাড়াং করে চিঠির মুখ ছিঁড়ে ফেললেন সিনহাসাহেব। একটা খামে চিঠি পাঠাতে কি এদের বড্ড বেশি পয়সা খরচা হয়ে যায়।
চিঠিটা একটা বিজ্ঞাপন। ছাপানো লেখা। কারা কাছাকাছি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর খুলছে। যা-যা মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজন হতে পারে স-ব পাওয়া যাবে। চাই শুধু সদাশয় মহাশয়ের শুভেচ্ছা ও সহযোগিতা।
ডিসগাস্টিং। দ্বিতীয় চিঠিটা অধৈর্য হাতে খুলে ফেললেন সিনহাসাহেব।
মহাশয় এই পত্রটি পাইবামাত্র জয় মা বালিকা ব্ৰহ্মচারিণী এই মন্ত্রটি দশবার লিখিয়া প্রত্যহ দশবার জপ করিবেন। অতঃপর তিন দিনের মধ্যে এই পত্রের ত্রিশটি কপি করিয়া ত্রিশজন স্নেহভাজনের কাছে পাঠাইবেন। জনৈক প্রভাতবাবু পত্র পাইয়া নির্দেশ পালন করিলে সপ্তাহান্তে চার লক্ষ টাকা প্রাপ্ত হয়েন। জনৈক অধরবাবু পত্র পাইয়া নিশ্চেষ্ট ছিলেন। তিন সপ্তাহের মধ্যে তাঁহার একমাত্র সন্তানের প্রাণবিয়োগ হয়। …
-রাবিশ!
পোস্টকার্ডটা সবুজ রঙের। হরাল দাসপুর থেকে পরাণ হালদার লিখছে।
সম্বৎসর ফসল ভালো হয় নাই। বাগান জমা দিয়াছি। সুবিধার দর অত্ৰত্য কেহই দিতে চায় না। মসুরি বুনিব। দুশোটি টাকা পাঠাইবা… ইত্যাদি ইত্যাদি।
সিনহাসাহেব হাত থেকে ধুলোবালি ঝাড়ার মতো করে পোস্টকার্ডটা ঝেড়ে ফেললেন। জমিজমা বাগান পুকুর সব খাচ্ছিস, আবার দুশোটি টাকা পাঠাইবা!
জগদীশ! জগদীশ! এগুলো সব ওয়েস্ট পেপার বাক্সেটে ফেলে দিগে যা…
এই পোস্টোকাটটাও?
আজ্ঞে, পোস্টোকাটটাও!
রোদটা ক্রমে হাঁটু বেয়ে কোলে উঠছে। শরীরে এতক্ষণে একটা আরামের ঝিমঝিমুনি। ঠান্ডা রক্ত কুসুম-কুসুম গরম হয়েছে বুঝি বা। কাগজখানা উলটেপালটে মেলে ধরলেন তিনি। শরীর গরম করার আরেক কল এই কাগজ। দিনদুপুরে এক ডজন লোক মিলে মহিলার কাপড় খুলে নিয়ে তাকে পেটাচ্ছে, সরু গলির মধ্যে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল ঢ্যাঙা বহুতল, ক্যাজুয়ালটি সাতাশ জন। সাতাশ? না সাতাশি? প্রোমোটার মন্ত্রীমশাইয়ের আঁচলের তলায় বসে আছে। আহা স্নেহশীলা জননীমূর্তি। একশো কেন, দুশো অপরাধও ক্ষমা করবেন স্নেহকরুণ মুখে। চৌত্রিশ বছর আগে অবসর নিয়েছেন সিনহাসাহেব তখনও এসব ভাবা যেত না। একটা সভ্য মানুষের দেশ, সভ্য মানুষের শহর ছিল এসব। বিদেশেই বা কী হচ্ছে? এই ক্লিন্টন-দম্পতিটি কী? খানদানি ঘরের ছেলে-মেয়ে? পলিটিক্স তোরা করবি না তো করবেটা কে? কিন্তু হোয়াইট হাউজের স্টাফ মারা যাচ্ছে সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে? কদিন আগে ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি! ছি ছি! ছি! হতেন মিসেস সিনহা, দেখিয়ে দিতে পারতেন ফার্স্ট লেডি কেমন হতে হয়। বিজয়লক্ষ্মীর মতো হেয়ার স্টাইল ছিল, লেডি রাণুর মতো ফিগার। নীচের তলার লোকেরা সমীহ করত, ভয় খেত, সমান মাপের লোকেদের থেকেও অতিরিক্ত সম্রম আদায় করে নিতেন।
জগদীশ পাশ দিয়ে সুট করে বেরিয়ে যাচ্ছে।
কোথায় যাচ্ছিস? কাগজের আড়াল থেকে গলাটা তাঁর চাপা গর্জনের মতো শোনাল।
এই একটু বাগানে।
কেন? মোয়ারটা দেখবি নাকি? দেখতে ইচ্ছে হয়েছে?
