বুঝি না বুঝি, বাচ্চু, তুই বল অন্তত। আমাকে তো কৈফিয়ত দিতে হবে!
কৈফিয়ত? আমার কথা থেকে বোধহয় তুমি কোনও কৈফিয়ত তৈরি করতে পারবে না!
তবু বল।
মা, একটা মানুষ বেঁচে আছে, অথচ বেঁচে নেই, এমন অবস্থা দেখেছ? মনে পড়ে?
সুস্মিতা শিউরে উঠল। তার চোখে এখন আর জল আসে না। শুধু একটু শুষ্ক দুঃখ আর ভয় বিকীর্ণ হতে থাকে। সেদিকে নিবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে বাচ্চু বলল, এই ভয়ঙ্কর কোমা দেখে আমি জীবন শুরু করেছি মা। একটা মানুষ হাত-মুখ খিচোচ্ছে, তোমার দিকে চেয়ে আছে অথচ সে জানে না সে কী করছে। কোমা যখন একটা দুর্ঘটনার ফল হয় তখন কারও কিছু করার থাকে না। ব্যাপারটা সইতেই হয়। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই যখন মানুষ কোমার ভেতরে ঢুকে যেতে থাকে, খাচ্ছে-দাচ্ছে, মলমূত্র ত্যাগ করছে, অথচ অচৈতন্য, হাত-পা খিচোচ্ছে ওই গোয়াবাগানের মতো, কিংবা সাড়া দিতে পারছে না ঠিকঠাক, ধরো ম্যান্ডেভিলের
মতো, ক্লিনিক্যালি অ্যালাইভ, বাট ডেড… ডেড ফর অল প্র্যাকটিক্যাল পার্পাসেস… তখন আমি সেই ভয়াবহ কোমা সইতে পারি না। এর জন্য যদি পৃথিবীর দূরতম বিন্দু থেকেও আমাকে কলেজ যাতায়াত করতে হয়, আমি রাজি আছি।
বাচ্চু তাই ফিরে এসেছে।
বুড়ো মানুষ
বাড়ির সামনে চৌকোনা জেন্টস রুমালের মতো একটুখানি লন। দুদিক থেকে ঢ্যাঙঢেঙে লম্বা তিন ঠেঙে বাড়িগুলো জিরাফের গলা বাড়িয়ে আছে। যেন সুবিধে পেলেই লনখানাকে খুবলে খেয়ে নেবে। মোয়ারটা পড়ে আছে এক দিকে অনড় অচল হয়ে। কেউই সেটাকে আর চালাতে পারছে না। কেউ বলতে অবশ্য সিনহাসাহেব তিরাশি, এবং তাঁর কুক-কাম-বেয়ারা-কাম-মালি জগদীশ—সাতাত্তর। সিনহাসাহেব, এক্স আই. সি. এস.-এর যত্নের খাওয়া-মাখা শরীর, বংশগতির কৃপাধন্য শরীরের কাঠামো, রঙের মরা-হাতি-লাখ টাকা জেল্লা, সাদা বাবরি চুলে হেয়ার-ক্রিমের অপিচ্ছিল ঝিলিক। শীতের সকালে-বিকালে ঢোলা পাতলুন আর। জোববা কিংবা শার্ট-প্যান্ট-পুলোভার পরা থাকলে বেশ জলুসদার বুড়োই মনে হয়। পাশে সাতাত্তর বছরের জগদীশ বেয়ারা কোমর-বাঁকা, পায়ের ব্যথায় প্রায় ডিঙি মেরে হাঁটনদার। চুল বলতে তিন গাছি, দাঁত বলতে এক পাটি, কিন্তু চাষি বংশের জিনের ঐতিহ্যে জগদীশের স্ট্যামিনা এখনও তিনটে সিনহাসাহেবকে কাত করতে পারে। সুতরাং জগদীশ সিনহাসাহেবের কুক-কাম-বেয়ারা-কাম-মালি, খুঁড়িয়ে হলেও চালিয়ে যাচ্ছে। পঁচিশ বছরের নোকর। রজতজয়ন্তীরই বছর এটা।
শেয়ালকাঁটা, পাথরকুচি আর দুবেবা ঘাসের বুনটে জংলা হয়ে আছে লনটা। অতএব ডেকচেয়ার পেতে লনে বসার বিকেল-বিলাস, তারও কাল হয়ে এল। সকালের পুবেল রোদ দ্বাদশীর চাঁদ একতলার বারন্দাতে পড়ে। সাজানো, সাফসুতরো এই বারান্দাখানই ইদানীং সবচেয়ে বেশি। আন্দামানি বেতের খানকয়েক শৌখিন চেয়ার, তাতে ঝকঝকে রঙের ভেলভেটের কুশন। তবে এসব চেয়ারে সিনহাসাহেব আর আরাম পান না। তাঁর জন্যে বরাদ্দ আছে ঠাকুরদার আমলের সেগুন কাঠের আরাম চেয়ার। খাঁজ কাটা পেছন দিকে। ইচ্ছেমতো ধাপ কে-ধাপ হেলানো যায়।
বসেছেন সিনহাসাহেব। এখন ছোটো হাজারি করবেন। পিঠটা নিম সোজা। পাশে ছোটো তেপাইতে ডেনচারের কৌটো। সাহাবের গায়ে ভারী সাটিনের জোববা। ভেতরে দু-তিন দফা পোশাক-আশাক আছে। শীত জানান দিচ্ছে। যাযাবর হাঁসের মতো ট্রাঙ্কো-বাকস থেকে বেরিয়ে পড়েছে—উলিকট, ড্রয়ার, সার্জের শার্ট, স্যুট, টাই, স্লিপোভার, পুলোভার, কাশ্মীরি শাল। মায় কুলুর গরম যাপার। মাসখানেক কি দেড়েক সব সিনহাসাহেবের শীতকাতুরে আদুড় গায়ে ঝুপঝাপ নামবে, বাসা বাঁধবে, ওম দেবে নেবে। তারপর হুশশ। জগদীশ বেয়ারারই হয় ঝঞ্ঝাট। কাচাও রে, রোদে দাও রে, তোলো রে, চোদ্দোবার করে ঝাড়ো, ভাঁজ করো, সোজা হাঙ্গামা নাকি? তবে করবেই বা কে? মেমসাহেব গত হয়েছেন তা আজ বছর দশ না বাবো? বারোই হল বোধ হয়। তা সেই তিনিই সকল কাজের কূটকচালি হাতে ধরে জগদীশকে শিখিয়ে চিনিয়ে গেছেন। শিখিয়েছেন, পাখি পড়া করে পড়িয়েছেন। কেক-পুডিং-শুক্তো-দমপোক্ত-সুপ-ইস্টু রোস্ট, রুপো পেতল ঝকঝকে করার কায়দা, কাঁচ চিনেমাটি সাফ করার কল, খাট-আলামারি-টেবিল-দেরাজ, পাথর-কাঠ-ধাতু তিন-চার-পুরুষ ধরে টুকে টুকে জমে-ওঠা জিনিসপত্তরের দেখভালের যাবতীয় করণকৌশল।
কাশ্মীরি কাঠের ব্রেক ফাস্ট ট্রে-খানা দু হাতে ধরে নড়বড় নড়বড় করতে করতে জগদীশ কিচিন থেকে বেরিয়ে আসে। সায়েবের পাশ মুখ দেখা যাচ্ছে। চোখে পড়ার চশমা লাগানো, সোনালি চিড়িক মারছে। হাতের ওপর কাগজ, খুলে মেলে ধরেছে।
ব্রেক ফাস্টো—চেয়ারের কাঠের হাতলের ওপর মাপ করে ট্রে-টা বসিয়ে দেয় জগদীশ।
চিলিবিলি জোববার ঢোলা হাতার মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে পাকা লোমলা লোল হাত। শিরার রংগুলো পর্যন্ত ফিকে হয়ে গেছে। মাটিতে ঝরে পড়া শুকনো ডালপালার আঙুল দিয়ে সায়েব টোস্টে মার্মালেট মাখায়। একটা দুটো কামড় দেয়, তা পর প্লেটের ওপর আর কিছু আছে কিনা খোঁজে, হাতড়ায়, যেন জানে না আর কিছু থাকবে না। কী যে ঢং রোজ সায়েবের? ডাক্তার তো সিদিনকেও বলে গেল দটি টোস্ট আর চা, বাস। ছানা খেতে পারো। তার রোজ রোজ কাঁচা ছানা আ মিষ্টি আ-লুনো তেনার মুখে রুচলে তো? মামালেটটা অনেক কষ্টে পারমিট করানো গেছে। এদিকে আবার চড়া প্রেশার, ডিম-ফিমও চলবে না। তা নয়তো, মেম সাহেবের হুকুম ছিল সকালবেলা সাহবকে রোজ ডিম দেবে। কড়া করে সেদ্ধ করে। রোজ।
