সকালে ব্রেকফাস্ট এনে দেয় বেয়ারা। এত ব্রেকফাস্ট যে দুপুরে খাওয়ার জন্যে পেটে জায়গা থাকে না। এ বাড়িতে কেউ সেভাবে লাঞ্চ বোধহয় খায়ও না। শেষ দুপুরের দিকে খিদে পায়, তখন বাচ্চু কলেজ-ক্যানটিনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে মারতে কিছু খেয়ে নেয়।
সন্ধেবেলায় তাড়াতাড়ি খাওয়া। টেবিলে এসে বসে বাচ্চু। মাসির মেয়ে তনিকা, সে বাচ্চুর সমবয়সি, এসে একটা দুটো জিনিস হাতে তুলে নেয়, কামড় দিতে দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে থাকে। বাচ্চু ডাক দিয়ে বলে, তনি, বসে খাও না। গল্প করব। তার এখন আড্ডার মেজাজ। এই সময়েই তার মায়ের সঙ্গে গল্প জমত।
সময় কোথায়? তনিকা হেসে চলে যায়। তার নিজের ঘরে ক্যাসেট চালিয়ে এসেছে। কিংবা ভিডিয়ো। সে ঘরে ঢুকে প্রথমে পর্দাটা টেনে দেয়। তারপর দরজাটা বন্ধই করে দেয়।
ছেলেটি বাছুর থেকে ছোটো। সে খেতে খেতে বই পড়ে। বাচ্চু জিজ্ঞেস করে, কী পড়ছ?
মলাট উলটে দেখায় রোহণ, কাফকা। প্রস্ত।
বাচ্চু এসব লেখকের নামও শোনেনি। কিন্তু সে খুব কৌতূহলী, সাহিত্য বিষয়েও। সে বলল, আমাকে পড়তে দিও। আলোচনা করব।
কী দরকার। ফিরে হেসে রোহণ বলে।
বেশিরভাগ দিনই সন্ধেবেলায় রোহণ বেরিয়ে যায় গাড়িতে। তনিকা ট্রামে বাসে। কোথায় যাচ্ছে জিজ্ঞেস করলে হাসে-উত্তর দেয় না। বাচ্চুর জন্যও সকালে-বিকালে গাড়ি প্রস্তুত থাকে। মাসি বলে, খবর্দার, তনির মতো ট্রামে বাসে যাস না বাচ্চু! কত জার্ম, কত নোংরা, তনিটা
পাগলি! মাসি নিজেও সন্ধেবেলায় বাড়ি থাকে না। কিন্তু বাচ্চুর সন্ধেবেলাটাই বাড়ি থাকার সময়।
মাস তিনেকের মাথায় বাচ্চু ফিরে গেল। মাসি প্রথমটা বুঝতেই পারেনি। দু দিন তিনদিন পর ড্রাইভার বলল, বাচ্চুবাবু তো গাড়িতে কলেজ যায় না। গাড়ি তো গ্যারেজে তুলে দিই। বেয়ারা তখন বলল, বাচ্চুবাবু তো ব্রেকফাস্ট খায় না, ট্রে নিয়ে ফিরে আসি। মাসি তখন ঘরে ঢুকে দেখল নিভাঁজ শয্যা পড়ে আছে, ওয়ার্ডরোবের কপাট খুলে দেখল বাচ্চুর টি শার্ট, জিনস এসব ঝুলছে না, টেবিলের ওপর বাচ্চুর বইখাতা নেই। মাসি মেয়েকে জিজ্ঞেস করল, তনি, বাচ্চু কোথায় গেল?
বাঞ্ছ? হাউ ডু আই নো?
মাসি ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, রোহণ বাচ্চু কোথায়?
বাচ্চুদাই জানে। আমি কারো পার্সন্যাল ব্যাপারে থাকিনে মা।
গাড়ি নিয়ে মাসি সোজা শ্রীরামপুরে চলে গেল। ভীষণ উল্কণ্ঠিত। পরের ছেলে। সুস্মিতা দরজা খুলে দিয়েই জড়োসড়ো হয়ে গেল।
কীরে সুস্মিতা, বাচ্চু এসেছে নাকি?
হ্যাঁ রে। এই তো তিনদিন আগে, বিষ্ণুত্বর। কলেজ থেকে চলে এল সোজা। তোকে বলে আসেনি, না?
সে কথার উত্তর না দিয়ে মাসি বল, এল কেন? মায়ের জন্যে হঠাৎ মন কেমন করে উঠল, না কী?
সুস্মিতা হেসে ফেলল, বলল, হবে হয়তো। তোকে বলে আসেনি, বোধহয় তুই আটকাবি বলে। কী পাজি দ্যাখ! তা ছাড়া তোকে পায়ও নি বোধহয় হাতের কাছে।
এসব কথা হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর মতো করে উড়িয়ে দিয়ে মাসি বলল, সুস্মিতা, ওর কীসের অসুবিধে? কোনো অনাদর করেছি। দ্যাখ, আমি নিজের হাতে না করলেও ওর সবকিছুরু ওপর নজর রেখেছি…
আরে দূর! তুই তো নজর রেখেছিসই। কমাসেই চেহারা পালটে দিয়েছিস।
তবে? ওর অভিমানটা কীসের? ও ফিরে এল কেন?
অভিমান-টান নয়। ও বড়ো খেয়ালি। কিছু মনে করিস না। নে, এখন চা খা। তো! বাবা-মরা ছেলে, মাফ করে দিস ভাই।
তা যেন হল। কিন্তু ও ফিরে এল কেন?
জানি না, বলছি না খেয়ালি!
বাছুর মাসি কোনোমতে চায়ে দুটো চুমুক দিয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। তার ভেতরটা আসলে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে আছে। তার এমন আতিথ্য, এমন শৃঙ্খলা, হাতে-মুখে এমন সেবা, বাজারের শ্রেষ্ঠ খাবারদাবার। এর আগেও দু তিনটি ছেলেমেয়ে যে তার বাড়িতে থেকে মানুষ হয়নি, তা নয়। কেউ তো এভাবে ফিরে যায়নি! বাচ্ছ কেন ফিরে এল? কোনো কিছুকে খুব গুরুত্ব দেবার অভ্যেস মাসির নেই। কিন্তু এ প্রশ্নটা তাকে ভাবাচ্ছে। বাচ্চু কেন…।
সুস্মিতা বোনকে বলতে বাধ্য হল, সে জানে না। কিন্তু আসলে সে জানে। অর্থাৎ জানে না, বোঝেনি সঠিক। কিন্তু বাচ্চু তাকে বলেছে সে কেন ফিরে এসেছে।
শীতের কুয়াশা-ভরা রাত আটটা নাগাদ তার বড়ো কালো ব্যাগটা নিয়ে বাচ্চু ফিরে এল। কমাসেই তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে। চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে। দরজা খুলে সুস্মিতা অবাক। আহ্লাদে আটখানা। তারপরই খেয়াল হল, শনি-রবি তো নয়! বিষুবার! তা ছাড়া এই ব্যাগ নিয়েও সে আসে না। বাড়িতে তার একপ্রস্ত জামাকাপড় থাকে। অসুবিধে হয় না। সে বলল, কী রে, আজ এখন চলে এলি?—কাল কলেজ নেই?
কেন থাকবে না?
যাবি না?
কেন যাব না?
তা হলে আজ এলি?
আমি চলে এলাম, ব্যাগটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বাচ্চু বলল।
চলে এলাম মানে?
চলে এলাম মানে চলে এলাম। আর যাব না।
সে কী? কী হল? কী অসুবিধে…
কিছু না।
কেউ কিছু বলেছে?
না তো!
তা হলে? বাচ্চু, এক এক বাড়ির লাইফ-স্টাইল একেক রকম। তুই… মানে। তোর কত অসুবিধে হবে বল তো? এখানে থেকে কলেজ করতে হলে?
বাচ্চু চুপচাপ নিজের ব্যাগের জিনিসপত্র যথাস্থানে রাখতে লাগল মন দিয়ে। তার মা তখনও দরজার কাছে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে।
গোছগাছ শেষ করে নিয়ে বাচ্চু হঠাৎ ফিরে দাঁড়াল। সে এগিয়ে এসে মায়ের কাঁধ দুটো ধরল। এখন সে মায়ের থেকে পুরো এক হাত লম্বা। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলল, বলব। কিন্তু তুমি কী বুঝবে?
