সুস্মিতার দেওর বিস্ময়ের প্রথম ধা কাটা কাটিয়ে উঠে চ্যাচামেচি করে বলল, মনে রেখো এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে আর কোনোদিন ঢুকতে পারবে না— বাড়ির অংশ দাবি করতে এলে দেখিয়ে দেব মজা।
সুস্মিতা ইতস্তত করছিল। এতটুকু একটা ছেলের কথায় নিশ্চিন্ত না হোক নিশ্চিত আশ্রয় ছেড়ে যাওয়া! বাচ্চু তখন এগিয়ে এসে কঠিন হাতে তার হাত ধরল। বলল—কই, রেডি।
হও! সুস্মিতার মনে হল বাচ্চু তার হাত মুচড়ে দেবে তার কথা না শুনলে। বাছুর তখন ঠিক চোদ্দো বছর বয়স।
তারা যেখানে এসে উঠল, সেটা মফসসল। বাছুর এক বন্ধুর মামারবাড়ির একতলা। নতুন বাড়ি। সবকিছুই আলাদা। সদর দরজা পর্যন্ত। বাচ্চু বলল, আমরা দিল্লিতে, বরোদায়, কানসভালে ঠিক যেভাবে ছিলাম সেইভাবে বাড়িটাকে সাজাও মা। সে শুধু বলেই ক্ষান্ত হল না। নিজেও হাত লাগাল। বন্ধুবান্ধবের দল নিয়ে কদিনের মধ্যেই বাড়িটাকে ছিমছাম করে ফেলল। যেখানে ছবি থাকবার ছবি রইল, যেখানে ফুলদান গাছদান থাকবার ফুলদান গাছদান বসাল, টেবিলের ওপর ফোটোফ্রেমে বাবা-মা-বাছুর ছবি শোভা পেতে লাগল।
রাতে হা ক্লান্ত হয়ে শুতে যাবার আগে বাচ্চু বলল, মা, তোমার টাকাপয়সা কোথায় কী আছে, কত আছে, কীভাবে আছে একটু বোঝাও তো!
যতক্ষণ না বুঝল সে কিছুতেই ছাড়ল না। তারপর হিসেব করতে বসল। করে দেখিয়ে দিল বাড়িভাড়া দিয়ে, সংসারখরচ করে, তার পড়াশোনার জন্য ব্যয় হয়েও তাদের ঠিক কত থাকবে। সমস্ত করে-টরে সে মাকে বলল, গোয়াবাগানের একতলার খাটালের-গন্ধ-আসা মশা-অলা ঘরটার চেয়ে এখানেই তো আমরা ভালো থাকব। তা ছাড়া গালাগাল, খারাপ কথা, গোলমাল এসবের কোনোটাই আমার ভালো লাগে না।
সুস্মিতারা চলে আসায় গোয়াবাগানের বাড়িতে এবং পাড়ায় একটা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। জনমত সুস্মিতাদের পক্ষে। মা বেঁচে থাকতে বিধবা বউটাকে, নাতিটাকে বাড়ি ছাড়া করল গা, এমন ইতর চামারও তো দেখিনি! ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই প্রতিক্রিয়ার ধাক্কাতেই হোক, অনুশোচনাতেই হোক ধীরে ধীরে সুস্মিতার শ্বশুরবাড়ির কেউ-কেউ তার নতুন বাড়িতে আসতে লাগল, পুজো এবং জন্মদিনে বিশেষ করে বাচ্চুর জন্য উপহারাদি নিয়ে। সুস্মিতা বেশ পুলকিত। হাজার হলেও নিজের দেওর, জা, ননদ, শাশুড়ি। হয়তো মনে মনে শ্বশুরবাড়ির ন্যায্য ভাগ। পাওয়ার আশাও তার মনে জেগে থাকবে। সে সুগন্ধি চা, জলখাবার ইত্যাদি তৈরি করে তাঁদের আপ্যায়িত করে। এভাবে পুজো গেল, জন্মদিন এল। তাঁরা আবার এসেছেন। হাতে বাচ্চুর জন্য শার্টপ্যান্টের প্যাকেট। বাচ্চু সেদিন বাড়ি ছিল। সে ঢুকে গত পুজোর দেওয়া জামাকাপড়গুলো টেবিলের ওপর রাখল, শান্তভাবে বলল, যেগুলো এনেছ সেগুলো এবং এগুলো নিয়ে যেয়ো। চা-টা খাও, তারপর এগুলো নিয়ে চলে যেও। আর এসো না। আমার অসুবিধে হয়। তার বয়স পনেরো পূর্ণ হয়েছে। তার ঠাকুমা, জ্যাঠা ও জেঠিমা দেখলেন তাঁদের সামনে যেন ছোটো অলকেশ দাঁড়িয়ে রয়েছে। অবিকল!
অপমানের চেয়ে বেশি যেন আতঙ্ক নিয়ে ওঁরা চলে গেলেন। অলকেশই কি ছেলের মধ্যে দিয়ে এসে তাঁদের ভৎসনা করে গেল? সুস্মিতা বাচ্চুকে বকতে ভয় পায়। বাচ্চু যেন তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়ো। সে কিন্তু-কিন্তু করে বলল, বাচ্চু, তোর চেয়ে আমি তো কম ভুগিনি, আমিও জানি কে কী রকম, তবুও আপনজন, নিজে থেকে যখন আসছে আসুক না। ক্ষতি তো কিছু নেই!
বাচ্চু সংক্ষেপে বলল, আপনজন চিনতে শেখো।
আস্তে আস্তে বাচ্চুর যেমন নিজস্ব বন্ধুর বৃত্ত গড়ে উঠেছিল, সুস্মিতারও তেমনি অনেক নতুন বন্ধু হল। প্রতিবেশিনী, বাছুর বন্ধুদের মায়েরা। সুস্মিতা ভুলে যেতে থাকল তার নিঃসঙ্গতা, আত্মীয়ের অভাব। তার অনেক গুণ। সে ভালো গাইতে পারে, অভিনয় করতে পারে, রান্নাবান্নায় সে দ্রৌপদীবিশেষ। তাকে ঘিরে আপনা আপনিই একটা সাংস্কৃতিক ক্লাব গড়ে উঠল। সুস্মিতা গান গাইছে, গান শেখাচ্ছে, রান্নার বই লিখছে। সরস্বতীপুজো উপলক্ষ্যে ফাংশন করাচ্ছে। একে একে তিনটে কুকুর হয়েছে। সুস্মিতার ভাবনা-চিন্তা করবারই বা অবসর কই? সর্বক্ষণ সুস্মিতা। সুস্মিতাদি! সুস্মিতা মাসি।
বাচ্চু হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করল, সাংঘাতিক ভালো ভালো মার্কস পেয়ে। সে যাদবপুরে ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যাচ্ছে। কিন্তু থাকে শ্রীরামপুরে, যেতে হবে যাদবপুর। হস্টেলেও আপাতত সিট পাওয়া যাচ্ছে না। কী হবে?
এই সময়ে সুস্মিতার এক জাঠতুতো বোন, তার ছেলেবেলার সখী, বলল, আমি থাকতে ভাবছিস কেন? হস্টেলে সিট পেলেও বাচ্চর সেখানে থাকার প্রশ্ন উঠছে না। আমি থাকি ম্যান্ডেভিল গার্ডনস-এ। সেখান থেকে যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কতদূর? আমি থাকতে আমার বোনের ছেলে যাবে হস্টেলে?
বাচ্চুকে অগত্যা রাজি হতে হল। তার মাসিরা বিশাল ধনী। তাদের প্রাসাদোপম বাড়ি। মাসি মেসো, বিশেষ করে মেসো, বেশিরভাগই ব্যাবসা উপলক্ষ্যে লন্ডনে থাকেন। মাসির দুই ছেলে-মেয়ে বিরাট বাড়িতে একা। দুজনেই লেখাপড়ায় যথেষ্ট ভালো। বাচ্চুর আলাদা ঘর, সঙ্গে ডব্ল সি। মাইক্রোওয়েভ আভেনে ঘন্টাখানেকের মধ্যে রান্না হয়ে যায়। সকালে, বিকেলে, দুপুরে, রাতে মাসির লোজন বিশেষভাবে দেখাশোনা করে বাচ্চুকে। সকালে যে জামাকাপড় ছেড়ে সে কলেজে যায়, ফিরে সে সেগুলো খুঁজে পায় না। বেশি খুঁজতে থাকলে মাসির লোক এসে বলে, কাচা, আয়রন করা সব ক্যাবিনেটে সাজানো আছে। মাসি বলে, যা ছাড়বি সঙ্গে সঙ্গে ওয়াশিং মেশিনে চলে যাবে। ভাবিস কেন? তিনটে ওয়াশিং মেশিন কাজ করছে। ছাড়া জিনিস ভদ্রলোক পরে আর?
