হঠাৎ বহুদিন আগে দেখা এইরকম এক ঝাঁক স্কুল-গার্লের কথা মনে পড়ে যায়। তুলনাটা আজ এতদিন পর একটা বিদ্যুচ্চমকের মতো মনে এল। তখন মনে হয়নি। সিক লিভে বাড়িতে। প্রতিদিন এই রকম একটা ঝাঁক রাস্তা পার হত। প্রথমে মনে হত সবগুলো এক, আস্তে আস্তে আলাদা করতে পারলেন। কোনটা রোগা, কোনটা মোটা, কোনটা দোহারা, কোনটা বেঁটে, কোনটা মাঝারি, কোনটা লম্বা। কেউ দোদুল বেণি, কেউ বব-কার্ট, কেউ ফরসা, কেউ কালো, কেউ শ্যামলা। দেখতে দেখতে দেখতে দেখতে চোখ আটকে গেল। আর নড়তে চাইল না। অনবদ্য অনুপম।—অতসী, এই অতসী, তোর জোগ্রাফির খাতাটা আমায় একবার দিবি?
নে না! এতে আর বলবার কি আছে?
মুখার্জি আঙ্কল বকবেন না তো।
বকবেন কেন?
উনি কপি করা পছন্দ করেন না। শেষকালে যদি ভূগোলেতে গোল।
ধুত আমার বাবা, আমি বুঝব, তুই নে।
দু চারদিন বন্ধুদের স্কুল-ফিরতি হাস্যালাপ থেকে ধরে ফেলা গেল অতসী। মুখার্জি, মেয়ে স্কুলের ভূগোলের সার অমলেশ মুখার্জির মেয়ে। তখন মার কাছে গিয়ে হ্যাংলাপনা, দেখেছি পথে যেতে তুলনাহীনারে। মার চোখ ড্যাবড়েবে খুশিতে। সংলাপ আরম্ভ হয়।
অমলেশ মুখার্জি, দেখুন, অতসী আমার একমাত্র সন্তান।
মিসেস চ্যাটার্জি, শি ইজ দ্য বেস্ট স্টুডেন্ট, দিস স্কুল হ্যাজ এভার প্রোডিউসড।
অমলেশ মুখার্জি, মাতৃহীন সন্তান। প্রাণপণে মানুষ করছি। আমার ইচ্ছে ও ডাক্তার হয়। কিংবা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস। এখনই বিয়ে…
মিসেস চ্যাটার্জি, বেশ তো। ও স্কুলটা পাস করুক। আমাদের বাড়ি থেকেই পড়তে পারবে। মা নেই, মা পাবে। আপনিও ছেলে পাবেন।
সুবিখ্যাত চ্যাটার্জি বংশের গৃহিণী মিসেস চ্যাটার্জি কন্যা প্রার্থনা করছেন জোগ্রাফির টিচার অমলেশ মুখার্জির কাছে, যিনি স্ত্রীলোকহীন সংসারে সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, উচ্চাশী কিশোরী কন্যাকে নিয়ে ভেতরে ভেতরে ব্যতিব্যস্ত। নিজের বা মেয়ের বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলেই ঘর্মাক্ত হয়ে যান দুর্ভাবনায়, অসুখ করলে অসহায়। নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন। অনেক ভেবেছিলেন। মেয়ের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। অনেক কথা। যতই বুদ্ধিমতী হোক, যতই উচ্চাশী হোক, সপ্তদশী বই তো নয়। সুতরাং মিসেস চ্যাটার্জির জয়। কর্নেল চ্যাটার্জির জয়। অভিজাত, বনেদি পরিবারের জয়। বৈভব এবং আভিজাত্য ছিল বংশের, বুদ্ধিবৃত্তি এবং সত্যিকারের সৌন্দর্য যোগ হল। এতদিন বাড়িতে রমণীকুল বলতে সোনা এবং হিরেয় মোড়া আলুসেদ্ধ ছিল, এবার এল স্নিগ্ধ তন্বী দীপশিখা। বিয়েবাড়িতে হইচই পড়ে গেল। কর্নেল চ্যাটার্জির বুক ক্রমশই ফুলছে। উচ্চমাধ্যমিকে একগাদা লেটার। ন্যাশনাল স্কলারশিপ। জয়েন্টে দুটোতেই সুযোগ ডাক্তারি, এঞ্জিনিয়ারিং।—তুমি তো বরোদা চলে যাচ্ছ, আমি মেডিক্যাল কলেজে ভরতি হয়ে যাই? আমি কি একা থাকব, বরোদায়? দু বছর? ছুটি পাব না, তার পরই ফ্রন্ট।কিন্তু আমি তাহলে কী করে পড়ব? আরে বরোদায় কি আর কলেজ নেই? ভরতি হয়ে যাবে। ডাক্তারি? সম্ভব হবে কী করে? চোখের আলো দপ করে নিবে গেল।
সপ্তদশী অষ্টাদশীদের কুমারী শরীর নতুন জাগে। ঠিক ফোঁটার পূর্ব মুহূর্তের কুঁড়ির মতো। সোহাগে, অভ্যস্ত, শিক্ষিত, নিপুণ হাতের যন্ত্রে সেই দীপশিখা জ্বালাতে কতক্ষণ। বলল, বলো তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে? অস্পষ্ট অব্যক্ত কণ্ঠের গোঙানি আমি যে কী করি? কী করি? চার পাঁচটা তো বছর… চার, পাঁচ বছর নাহ অতসী তুমি আমায় একটুও… পেছন থেকে মুখের ওপর হাত চাপা।
বরোদা। মিলিটারির জিপে করে অতসী কলেজ যাচ্ছে। ইতিহাস পড়ছে। টুকটাক শিখে নিচ্ছে, বাংলো সাজাবার কায়দা, এনটারটেইন করার কায়দা, অফিসার্স ক্লাব, উইমেনস ক্লাবের পার্টি। হ্যাললো মিসেস চ্যাটার্জি, য়ু আর সো চা র্মিং, লেটস হ্যাভ এ ডানস। দূর থেকে সকৌতুকে দেখছেন কর্নেল। উদ্ধার করবার জন্য এগিয়ে যাচ্ছেন না। ওর নাকের ওপর এখন নিশ্চয় চিরঞ্জীব সুদের হালকা হুইস্কি আর কড়া তামাক মিশ্রিত নিশ্বাস। খুব অনিচ্ছুকভাবে পা ফেলছে অতসী। তাঁর সঙ্গিনী মিসেস তলোয়ারকর অবশ্য খুব স্মার্ট। শি ইজ এনজয়িং হারসেলফ। তাঁর নিশ্বাসের গন্ধ মাদাম তলোয়ারকরের ভালো লাগছে। তীব্র পুরুষালি গন্ধ।
গ্র্যাজুয়েশন হতে না হতেই গোল্ডি এসে গেল। সোনালি রঙের বাচ্চা। তাই চম্পক। সে মা যে নামেই ডাকুক না, বাবার আদরের নাম গোল্ডি। আহ কী বিশ্রী একটা কুকুরের মতো নামে ডাকো। কিসসুই জানো না, অতসী, আমি ঠিক একেবারে সঠিক নামে ডাকছি। গোল্ডি সাইকেল চড়ছে, গোল্ডি এয়ার গান চালাচ্ছে, গোল্ডি মারপিট করছে, গোল্ডির মা তার নানান স্বপ্নের কথা বলে চলেছে, রুপকথার মাধ্যমে, উপকথার মাধ্যমে। সোনালি রঙের গোল্ডি বলে, এই ট্র্যাশ গল্পগুলো তুমি কোথায় পেলে মাম্মি। গোস্টস? হাঁড়ি উপুড় করলেই মিষ্টি ঝরবে? মারমেইড, এ সমস্ত আজগুবি—কেন? তোর জিরো জিরো সেভেন, টিনটিন এসব আজগুবি নয়? আজগুবি কেন হবে? ডিফিকাল্ট। কিন্তু অসম্ভব নয়। বাবা ছেলে একসঙ্গে বলে ওঠে। কর্নেল চ্যাটার্জি বিজয়ীর হাসি হেসে বলেন, গোল্ডি ইজ হিজ ফাদার্স বয়, নট হিজ মাদার্স বেবি। গোল্ডি চলে গেল দেরাদুন। চোখ ভরতি জল, অতসী বলল, আমি কী করব, বলে দাও—সোশ্যাল সার্ভিস করো, মিসেস তলোয়রকর যেমন করেন। ধুত ওকে সোশ্যাল সার্ভিস বলে? আমাকে একটা মেয়ে দাও। মেয়ে কি ইচ্ছে করলেই দেওয়া যায়। অনেক কিছু ইচ্ছে করলেই কেড়ে নেওয়া যায়, কিন্তু হাজার চেষ্টা করলেও কিছু কিছু জিনিস দেওয়া যায় না। কর্নেলও দিতে পারলেন না। দুবার নষ্ট হয়ে গেল। শেষেরটা আকার পেয়ে গিয়েছিল একটা। ফরসা, গার্লচাইল্ড। অতসীর সে কী বুক ফাটা কান্না। সেই একবারই। তারপর অতসী শুকোতে থাকল। অতসী ছায়াময়ী হতে থাকল। মিলিটারি থেকে রিটায়ারমেন্ট নিয়ে যখন তিনি এই শহরে, উঁচুর দিকে ওঠার কাজে ব্যস্ত, তখন অতসী বালিগঞ্জ প্লেসের বিশাল বাড়িতে প্রেতিনীর মতো প্রায় কায়াহীন শূন্য চোখে ঘুরে বেড়ায়। রাজ্যের কুকুর আর বেড়াল জড়ো করেছে, রাস্তার ভিখারি বাচ্চা ডেকে ডেকে খাওয়ায়। বিশেষত মেয়ে দেখলেই। অতএব রীমা রীতার দরকার হল। গোল্ডি ছুটিতে এসে বলে, মা, কুকুর পুষবে তত ভালো কুকুর পোষো, পেডিগ্রি দেখে, কোত্থেকে এই খেকি-নেড়িগুলো জড়ো করেছ? শান্ত, কিন্তু কেমন একরকম দৃঢ় চোখে চেয়ে অতসী বলে, আমি যদি থাকি ওরাও থাকবে। গোল্ডি গার্ল ফ্রেন্ডকে হিরো হন্ডার পেছনে বসিয়ে হু হু করে ছুটে চলে যায়। মাঝরাত্তিরে সামান্য মাদকের গন্ধ মুখে নিয়ে কর্নেল বাড়ি ফেরেন। অতসী, ক্ষীণা, অস্বাভাবিক সাদা বেতসী শোবার ঘরের দরজা খুলে কেমন একরকম চোখে তাকায়, তারপর সযত্নে কর্নেলের জামাকাপড় খুলে বাথরুমের বালতিতে ফেলে এসে, নাইট সুট পরিয়ে দেয়। শুইয়ে দেয়। দরজাটা বন্ধ করবার শব্দ পান কর্নেল। তারপর ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে উঠে বুঝতে পারেন পাশটা সারা রাত খালিই ছিল।
