কলকাতা নামক বিকট শহরটির থেকে অন্তত একশো কিলোমিটার দূরে এই নির্জন বনবাংলা বানিয়েছেন তিনি। মাসের দুটো সপ্তাহান্ত অন্তত কাটিয়ে যান। বাংলার গ্রাম যেরকম হয় তার চেয়ে একটুও কম বা বেশি ভালো না জায়গাটা। কিন্তু সবরকম ময়লা, আবর্জনা, অগোছালোপনা, দৈন্য ঢেকে যায় সবুজে। শীতের ক-টা দিন ধরণী মলিন, কিন্তু আকাশ অথই নীল। যেন প্রশান্ত মহাসাগর। রোদ যেন কাঁচা হলুদ বাটা। বাটি উপুড় সেই নীল চাঁদোয়ার দিকে তাকিয়ে থাকো, দেখবে খুশিয়াল মেঘদের পশ্চিম-মেঘ পর্ব। আর দেখবে পারাবতের খেলা। বিকেল বেলার ছাদে দিনশেষের রাঙা মুকুল আকাশ দেখতে এলে আরও দেখবে টানা কুন্দফুলের একটি মালা সমানভাবে দুলতে দুলতে চলে যাচ্ছে। যাযাবর হাঁস-বকেদের দল—বকের পাঁতি। কর্নেলের বনবাংলোর থেকে সোয়া কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে একটা বিরাট ঝিল। এলোমেলো তার তটরেখা। কোথাও বাঁধানো পাড় নেই। কচুরিপানার দল কখনও কখনও ভেসে আসে। আবার ভেসে চলে যায়। ধোপায় কাপড় কাচে, জেলেতে মাছ ধরে, কিছু কিছু লোক চান করে, কিন্তু গাগরিভরনে কাউকে যেতে দেখা যায় না। দূরবিন চোখে নিয়ে কর্নেল দেখেছেন অনেক সময়ে কচুরিপানার দামের পাশ কাটিয়ে তরতর করে পানসি চলেছে। কোমর জলে নেমে খ্যাপলা জাল ফেলে প্রচুব কুচো মাছ তুলছে অল্পবয়সি জেলের ছেলে, কুচকুচে হাতে জ্যান্ত রুপোর কুচিগুলো তুলে পরখ করছে। তারপর সবসুদ্ধ কাঁধে ফেলে চলে যাচ্ছে খুশকদমে। শহরে কর্মজীবনের এবং জীবনযাত্রার একটা ধনুকের ছিলার মতো টানটান ভাব আছে। সবসময়ে শরীরে স্নায়ুতন্ত্রী চড়া সুরে বাধা থাকে। যাকে বলে টেনশন। গেল গেল ভাব। গাড়ি চালাতে চালাতে সামনে বাবু, দিন না এসে গেল। ঘ্যাঁচ ব্রেক, সেই সঙ্গে দরদর ঘাম, অরেকটু হলেই চলে গিয়েছিল লোকটা চাকার তলায়, গাড়ির চালক জনগণের হাতে, গাড়ি পুলিশের হেপাজতে। ট্যাঁ ট্যাঁ ফোন —শিগগিরই চলে এসো, মিঠু, হ্যাঁ মিঠুর…বোধহয় গ্যালপিং হেপাটাইটিস। চেষ্টার ত্রুটি হবে না, নাঃ তোমার তো ডক্টর দাশগুপ্তর সঙ্গে খুব জানাশোনা। আরে বাবা পেলে তো! সব সময়েই ডাক্তাররা আজকাল কনফারেন্সে বিদেশে… দেখছি…। বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ, মিঠু…মিঠু বড়দার একমাত্র নাতনি, ঝুলঝুলে চুল, তুলতুলে মুখ, গ্যালপিং…হে…পা টাইটিস! হ্যালো চ্যাটার্জি কে? হিতৈষী। কংগ্রাচুলেশনস। হোয়াট ফর? ফর রিমেইনিং, হোয়্যার ইউ ওয়্যার। শিট! ফোনটাকে এবার শোবার ঘর থেকে দূর করে দেবেন।
দুধে গন্ধ কেন রে? এই গোবর্ধন!
কৌটোর দুধ সাহেব। বাজারে দুধ নেই।
কেন? গোরুমোষরাও স্ট্রাইক করেছে নাকি?
খাটাল হঠাও আন্দোলন হচ্ছে না সাহেব! গোয়ালারা তাই…
…দমাদ্দম আওয়াজ কীসের, শেষ রাত্তিরে? জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন পাশের ছ তলাটার ওপর থেকে ভাঙা শুরু হয়েছে। ডেমলিশন অর্ডার হয়ে গিয়েছিল, অনেকদিন। ফ্ল-এ ঠিক যেদিন তাঁর সারারাত মাথায় বোমা পড়েছে আর শেল ফেলেছে, সেই রাতের পর ভোরে প্রথম ঘুমঘোরের সময়টাই ডেমলিশন অর্ডার কার্যকরী করা শুরু হয়ে গেল। এরই নাম শহুরে টেনশন। তাঁদের বালিগঞ্জ প্লেসের বাড়ির হাতা বেশ খানিকটা। তারপর গাড়িবারান্দা। ভেতরের ঘরগুলো উঁচু উঁচু বড়ো বড়ো, তবু সে সমস্ত পেরিয়ে, দীর্ঘদিনের অপরিষ্কৃত আবর্জনাস্থূপের গন্ধ, মিছিলের স্লোগান, রাজনৈতিক বক্তৃতা, পুজোটুজোর হইহল্লা সবই প্রবেশ করে। তাই এই নির্জন বনবাংলা। শরীর-মন শিথিল, চিন্তাভারমুক্ত, শহুরে ক্লেদ-বর্জিত থাকে কিছুক্ষণ। অতসীরও খুব পছন্দ হয়েছিল বাংলোটা। বিশেষত এই ঝিলের জন্য।
আরও একটা শরীর-মন ঠান্ডা করার, চাঙ্গা করার জায়গা আছে তাঁর। সল্টলেকে। রীমা তরফদারের বাড়ি। রীমা আর রীতা দুই বোন একসঙ্গে একা থাকে। তাদের বাড়ি কর্নেল চ্যাটার্জি চাঙ্গা-ঠান্ডা হতে যান মাঝে মাঝে। কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। হঠাৎ একটা ফোন করে দেন আগে থেকে। না হলে ওরা অপ্রস্তুতে পড়তে পারে। অন্য কেউ যদি চাঙ্গা হতে এসে থাকে! রীমা রীতা কর্নেলের অনেক দিনের অভ্যাস। যেহেতু মেজাজসাপেক্ষ এই দেখাশোনা, তাই রোমাঞ্চটা এতদিন পরেও চলে যায়নি। কবে রীতা আর কবে রীমা এটাও একটা মেজাজ অনুযায়ী শেষ মুহূর্তের নির্বাচনের ব্যাপার। সেখানেও তাই রোমাঞ্চ। এক পাশে রীমা, দোহারা সুন্দরী, সপ্রতিভ, বাকপটু, কিন্তু যাকে বলে গ্রেসফুল, অন্যদিকে রীতা, অনেক অল্পবয়স্ক, উচ্ছল, অশ্লীল, মাদক, সুন্দরী নয়, কিন্তু উত্তেজক। ওখানে ঝিল নেই, আছে মরশুমি ফুলের কেয়ারি-করা বাগান, সুইমিং পুলে স্ট্রিপটিজ।
আকাশে ঝটপট ডানার শব্দে চমকে মুখ তুলে তাকালেন কর্নেল চ্যাটার্জি। বকের পাঁতি। খুব নীচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। এখন আর কুন্দফুলের মালা নয়। গলার লম্বা, পেটের ফোলা, ডানার ঢেউখেলানো চওড়া—সবই দেখা যাচ্ছে। অস্পষ্ট ক্লাক ক্লাক ডাক অবধি শোনা যাচ্ছে। কর্নেল অবাক হয়ে দেখলেন প্রথম মালার পেছনে আরও মালা আসছে, আরও আরও, ছেড়া মালা, গোটা মালা। তারপর অদূরে ঝিলের চারপাশটায় সাদা সাদা ফোঁটা পড়তে শুরু করল। ঝিলের একধারটা একেবারে সাদা হয়ে গেছে। বকগুলো কোন সুদূর থেকে এসে তাঁর বনবাংলোর সংলগ্ন ঝিলের চারদিকে নেমে পড়েছে। আশ্চর্য তো! তিন বছরের ওপর এ বাড়ি তৈরি হয়ে গেছে, এ দৃশ্য তিনি এখনও দেখেননি। এই বছর এই প্রথম এরা এখানে এল, না কী? বাইনোকুলার চোখে লাগালেন কর্নেল। ঝিলের ওপরে এখনও বকের দল এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েনি। এখনও বেশ প্যারেডের ভঙ্গিতে আছে, কেউ কেউ অতি মনোহর ভঙ্গিতে শরীর লম্বা করে ডানা ঝাড়ছে। রোটারি ক্লাব বছরে একবার করে আন্তঃস্কুল পি টি প্রতিযোগিতা করে। মেম্বার হিসেবে এগুলো তাঁকে দেখতে হয়, দেখতে খুব ভালোও লাগে। সাদা গেঞ্জি আর মেরুন শর্টস পরে ছেলেরা মাটিতে সহস্রদল পদ্ম হয়ে যাচ্ছে। আবার নতুন ফর্মেশন। ভারতবর্ষের মানচিত্র। মেয়েরা বেঁটে বেঁটে ডিভাইডেড স্কার্ট আর আলগা ব্লাউজ পরে পিয়ানোর সুরের তালে তালে লাল বলটা এক জনের থেকে আরেক জনের কাছে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে পাঠিয়ে দিচ্ছে। পায়ে নাচের ছন্দ। হাত আর মাথা একদিকে বেঁকিয়ে পাঠাচ্ছে বলগুলো, মাঝে মাঝে একেকটি মেয়ে লাফিয়ে ধরছে বল, ব্লাউজের হাতা উড়ছে পাখনার মতো, অবিকল ওই বক না হাঁসগুলোর মতো। মাথার ওপরে আবার আওয়াজ ক্লাক ক্লাক। চোখ তুলে তাকালেন কর্নেল। ইউনিফর্ম-পরা একদল স্কুলের মেয়ের মতো উড়ে যাচ্ছে বলাকা। ছাই-সাদা ইউনিফর্ম।
