অতসী-ই বেতসী-ই কর্নেল চ্যাটার্জি ডাকছেন। নিঃশব্দে চৌকাঠের ওপর এসে দাঁড়িয়েছে অতসী। টাইয়ের নটটা নিজে নিজেই বাঁধতে বাঁধতে আয়নার মধ্যে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে মুখে নির্মল হাসি নিয়ে কর্নেল বলছেন, মদ্য তো আমি আগেও পান করেছি, তখন তর্ক-বিতর্ক করতে, তোমার সঙ্গে যুক্তি-তর্কে আমি কখনোই পারতাম না, আফটার অল ইউ ওয়্যার দা ব্রাইটেস্ট স্টুডেন্ট ইয়োর স্কুল হ্যাড সো ফার প্রোডিউসড। কিন্তু এত রাগ তো করতে না ক
আয়নার মধ্যে দিয়ে অতসী চেয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না।
কী হল? কিছু বলো? দাও-দাও, টাইটা ঠিকঠাক করে বসিয়ে দাও তো! আফটার শেভের বোতলটাহাতড়াচ্ছেন কর্নেল। মুখ তুলতে তুলতে বলছেন, কই দিলে না?
কাকে বলেছেন? আয়নার মধ্যে প্রতিবিম্ব অদৃশ্য হয়ে গেছে।
অতসী! অতসী! রোববারের মরা মরা দুপুর। অতসী চৌকাঠে।
চলো আজ তোমার বাবাকে দেখে আসি। চট করে তৈরি হয়ে নাও। সাবিরকে গাড়ি বার করতে বলে দিয়েছি। অতসী চৌকাঠে এখনও দাঁড়িয়ে।
কী হল? যাও!
আমি গতকালই ঘুরে এসেছি।
সে কী? বলনি তো! সাবির বলেনি তো!
সাবিরকে নিইনি।
সে কী? তোমার এই শরীর, কীভাবে গেলে। ট্যাক্সিতে?
বাসে।
সে কী? কেন?
বৃদ্ধাবাসে গাড়ি নিয়ে ঢুকতে লজ্জা হয়—অতসী আর দাঁড়ায়নি।
বাবা যখন অথর্বপ্রায়, শাশুড়ি মৃত, এত বড়ো বাড়িতে কর্নেল, তাঁর পত্নী এবং ভৃত্যকুল ছাড়া আর কেউ নেই, সে সময়ে কর্নেল-পত্নী বাবাকে এখানে নিজের কাছে এনে রাখতে চেয়েছিলেন। কর্নেল হেসে বলেছিলেন, এই জন্য তোমার বুদ্ধির তারিফ করতে পারি না অতসী, সংসারে থার্ড পার্সন কখনও আনবে না। বাইরে, অন্য বাড়িতে রেখে তুমি বাবার যত খুশি সেবাযত্ন কর না! টাকার অভাব হবে না।
কাচের মতো চোখে চেয়ে অতসী বলেছে, আমার তো কোনো টাকা নেই ক…বাবার একমাত্র আমিই আছি…
তোমার টাকা নেই! তোমার টা…নাহ অতসী, আই অ্যাম ড্যামড।
শহরতলির কোনো বৃদ্ধাবাসে জায়গা হয়েছে ভূগোল-শিক্ষক মিস্টার অমলেশ মুখার্জির। তাঁর নিজের সংগতিমতো।
এ সপ্তাহে দেখে গেলেন। পরের সপ্তাহে প্রস্তুত হয়ে আসবেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে, ডানায় হাওয়া কাটার একটা মোহময় সু উ শ শ শ শব্দ শুনতে শুনতে ভাবলেন কর্নেল। অনেক অনেকদিন শিকার হয়নি, কোনো লক্ষ্যভেদ হয়নি। বন্দুকগুলোয় মরচে ধরছে। সাফ করতে হবে ভালো করে। নাকি তির ধনুক? আর্চারি? এই বিশেষ খেলাটিতে তাঁর বড্ড সুনাম ছিল এক সময়ে। সব সময়ে এক নম্বর।
ফেরবার সময়ে হাইওয়েতে পড়ে মাথায় এল কথাটা। দুইয়েরই পরীক্ষা হয়ে যাক। তিরন্দাজ এস. পি. চ্যাটার্জি আর বন্দুকবাজ এস. পি. চ্যাটার্জি। সাবিরকে বলতে হবে ওর বউকে নিয়ে আসবে। হাঁসের মাংস পাকায় চমৎকার! একবার খাইয়েছিল। অবশ্য খাওয়াটা জরুরি নয়, জরুরি হল নিশানার পরীক্ষা। গোন্ডিটাও খুব ভালো করছে। ডিফেন্স অ্যাকাডেমিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ একদম ঠিকঠাক লেগে গেছে সব। যেখানে যা লাগবার। গোল্ডিকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হবে না।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে, মরা বিকেলের আলোয় ছাদে রিভলভিং চেয়ার নিয়ে বসলেন কর্নেল চ্যাটার্জি। পাশে তাঁর পরিষ্কৃত পাখি মারা বন্দুক, আর গোল্ডেন রিট্রিভার। সাড়ে চার বছর বয়েসের দুর্দান্ত আর একটি গোল্ডি। বাচ্চাটাকে দেখে প্রথমেই তাঁর অতসীর কথা মনে পড়েছিল। কী একটা কুকুরের মতো নামে ডাকো ছেলেটাকে ক আহা, একেও গোল্ডি বলতেই ইচ্ছে করে তাঁর। কিন্তু ছেলে বাড়ি ফিরে বাবার কাণ্ড দেখে কিছু মনে করতে পারে। যতই যুক্তিনিষ্ঠ, যতই প্র্যাকটিক্যাল হোক! কর্নেল চ্যাটার্জি একে স্কাড বলে ডাকেন, যদিও মনে মনে বলে ফেলেন, গোল্ড, গোল্ডি। ওই চলে গেল প্রথম সারি। ওরা গিয়ে বসবে ঝিলের ধারে, গাছের ওপর বাসা বাঁধবে, ছোটো ছোটো টিলা সাদা করে বসে থাকবে। বন্দুকটা হাতে তুলে নিলেন কর্নেল—ডোন্ট কিল এ সিটিং বার্ড। পাখিগুলো অর্ধবৃত্তাকারে উড়ে যাচ্ছে। তাদের কাজল পরা চোখের মতো ডানায় এখন নীচের দিকে টান। একটা…দুটো…তিনটে…চারটে…দলছুট… চতুর্থটা সামান্য দলছুট। তাতেই নিশানার সুবিধে হয়ে গেল। বুমমমম…ঘুরতে ঘুরতে লাট খেতে খেতে পড়ছে। যতই নীচে নামছে গতিবেগ বাড়ছে। একদম অব্যর্থ লক্ষ্য। কোথায় লেগেছে গুলিটা তিনি এখনও জানেন না। লক্ষ্য ছিল পেটটার ওপর। ওই জায়গাটাই সবচেয়ে নধর তো! স্কাড ছুটছে, ছুটুক। তিনি তির-ধনুক তুলে নিয়ে পেছন পেছন ছুটেছেন। পরনে শর্টস, হাফ-হাতা সোয়েট শার্ট, পায়ে হ্যান্টিং শ্য। ঝিলের কাছটা কাদা জলা। ওখানে এখন পাখিদের মেলা বসে গেছে। ওরা বোধ হয় বুঝতেই পারেনি ওদের একজন সঙ্গী কম পড়ে গেছে। এখন ঝিলের পানা, শ্যাওলা, গেঁড়ি, গুগলি, কুচো মাছ খেতে ভারি ব্যস্ত। কাদার মধ্যে ক্লাক ক্লাক করছে মেলাই।
কিন্তু এখানেও তিনি বসা পাখি মারবেন না। সেই যে শরীরটাকে লম্বা করে দিয়ে অসম্ভব সুন্দরভাবে ডানা ঝাপটায়। সেই সময়ে, সেই সময়ে ছুটে যাবে অর্জুনের তির। একটা বিশাল তেঁতুল গাছের পাশে দাঁড়িয়ে শরসন্ধান করলেন কর্নেল, উঠছে, একটা পাখি উঠছে, টানছেন, তিনি ছিলা টানছেন, হঠাৎ কনুইয়ে টান পড়ল, চমকে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন লুঙ্গির মতো করে ধুতি পরা মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক।
