কফিতে চুমুক দিল ব্যাবিংটন। কুহুর বর বলল, মি. ব্যাবিংটন, শেষ পর্যন্ত আমাদের চাকরানির প্রেমের গল্প শোনাচ্ছেন?
বি. সেনের মুখের ওপরও এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ব্যাবিংটনের মুখটা থমথম করছে, বলল, ওহ, তার হাতের রান্না খেয়ে রোজ তারিফ করতে পার, তার পাতা বিছানার শুয়ে স্বপ্ন দেখতে পার, আর তার যে একটা প্রাইভেট লাইফ আছে, সেটাও ইন্টারেস্টিং হতে পারে, তা মানতে চাও না! বেশ আমি আর বলছি না।
প্লুটো গরগর করে দুবার ল্যাজ ওলটপালট করল।
কুহু তিরস্কারের দৃষ্টিতে গোবিন্দর দিকে তাকিয়ে বলল, না না, মি. ব্যাবিংটন বলুন, প্লিজ, ও না শোনে, না শুনুক, আমাদের খুব ভালো লাগছে।
ব্যাবিংটন আর এক চুমুক দিল কফিতে। পট থেকে আরও একটু ঢালল। আমার কর্তা ঘোষ সাহেব বলল, আরে, বলোই না ব্যাবিংটন। আমরা সবাই এখন মেজাজে আছি। এমন করে কেউ দুম করে সুইচ অফ করে?
ব্যাবিংটনের বলবার ইচ্ছে মোলো আনা। আমার ভেতরের রাগ আর জ্বালা এখনও থামেনি। অর্ধেক মন দিয়ে শুনছি। আর অর্ধেক মন দিয়ে ভাবছি লোকটা কে? কী করে এর শোধ নেওয়া যায়। ওদিকে ব্যাবিংটন বলে চলেছে।
যোসেফের সব ভালো। রোজগার ভালো করত। ফিটফাট বাবু থাকত সবসময়ে। পাপাম্মাকে ভালোও বাসত খুব। কিন্তু এক দোষে সব গুণ বরবাদ। ভয়ানক মদ খেত। আর মাতাল হয়ে গেলে তার আর জ্ঞান থাকত না। বউকে মেরে ধরে একশা করে দিত। সন্দেহ বাতিকও ছিল প্রচণ্ড। ওদের পাড়ায় পাপাম্মার মতো মেয়ে তো আর ছিল না। স্মার্ট, শিক্ষিত, রুচি বলে একটা জিনিস আছে, কেতাদুরস্ত। ব্যাস, অমুকের সঙ্গে কথা বলেছিলি কেন? অমুকের সঙ্গে বাজার গেলি কেন? মার, প্রচণ্ড মার।
চোখ মুছতে মুছতে মেয়েটা কাজ করতে এলে বলতাম, দূর, মদ খেয়ে নিজের পয়সাগুলোও উড়োচ্ছে, তোরগুলোও উড়োচ্ছে। রোজ ঠ্যাঙাচ্ছে। দে ওকে ছেড়ে, না হয় অন্য কাউকে বিয়ে কর।
ও বলত, ভাবি তো সায়েব, কিন্তু যোসেফ তাহলে পাগল হয়ে যাবে, নেশা কেটে গেলে অন্য মানুষ একেবারে। পায়ে ধরে কান্নাকাটি করবে, এই দ্যাখো কেমন নাকছাবি গড়িয়ে দিয়েছে। আর অন্য কাউকে বিয়ে! যোসেফ বেঁচে থাকতে? যোসেফকে ছেড়ে? যোসেফ তাকে খুনই করে ফেলবে।
বি, সেন একটু হেসে বললেন, যাক, এতক্ষণের লভের মোটিফটা স্পষ্ট হচ্ছে।
ব্যাবিংটন তখন গল্পের ঘোরে। সে অত লক্ষই করল না। সে বলে চলল।
তার পর একদিন মেয়েটা আমার কাছে এসে একেবারে আছড়ে পড়ল। সারা পিঠে দাগড়া দাগড়া লাল দাগ। বেত না লাঠি কী দিয়ে নিমর্মভাবে পিটিয়েছে। সর্বাঙ্গে কালশিটে, ফুলো, মাথা ফেটে রক্ত পড়ছে, চোখমুখ ফুলে গেছে, আমি বললাম, এ কী? এ যে তোকে খুন করে ফেলতে বাকি রেখেছে। আমি এখুনি যাচ্ছি থানায়, ডায়েরি করতে। তো মেয়েটা বললে, থানায় যেও না সাহেব, ও ওর যা খুশি করুক, জাহান্নামে যাক, আমি আর ওর কাছে ফিরছি না। বলে আউটহাউজে ওর পুরনো জায়গায় গিয়ে শুয়ে রইল। ডাক্তার ডাকলাম। কপালে স্টিচ হল, মাথায় ব্যান্ডেজ হল। ওষুধ ইঞ্জেকশান।
এটা সকালের কথা, দুপুরবেলায় যোসেফ এল। ত্যান্ডাইম্যান্ডাই নেই। ভয়ে একেবারে এতটুকু হয়ে গেছে, আমি বললাম, গেট আউট, আভভি নিকালো হিয়াসে। পায়ে পড়ে গেল। এমন আর কখনও হবে না সাহেব, মা মেরির দিব্যি, যিশুর দিব্যি, আমি আর মদ ছোঁব না। মাতাল হলেই আমার ভেতর থেকে শয়তান বেরিয়ে আসে। কিছুতেই যাবে না। ছিনে জোঁক একেবারে। সকালে আসছে, দুপুরে আসছে, সন্ধেয় আসছে—একবার, একটিবার ওর সঙ্গে দেখা করিয়ে দাও সাহেব। কত আর হাঙ্গামা সইব। একদিন বললাম, ঠিক আছে যাও। কিন্তু কোনো ঝামেলা করবে না। নিক বাবা, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নিক।
আউটহাউজের জানলা খোলা। আমার অফিস থেকে দেখা যায়। দেখতে পাচ্ছি–পাপাম্মা শুয়ে রয়েছে। কপালে ব্যান্ডেজ, মুখের নানা জায়গায় স্টিকিং প্লাস্টার আটকানো। যোসেফ ঘরে ঢুকে আস্তে আস্তে গিয়ে কপালে হাত রাখল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠে বসল মেয়েটা। ওর হাতটা ছুড়ে ফেলে দিল। খাট ছেড়ে ঘরের কোণে চলে গেল। কী বলছে শুনতে তো পাচ্ছি না। কিন্তু ভঙ্গি দেখে বুঝতে পারছি বেরিয়ে যেতে বলছে। আরও কদিন এল। খিল এঁটে পড়ে রইল মেয়েটা। দরজাই খুলল না। ভালো হয়ে উঠে একদিন রান্নাঘরে কাজ করছিল দূর থেকে যোসেফকে আসতে দেখেই রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। ভেতর থেকে শাসাতে লাগল, যোসেফ এক্ষুনি চলে না গেলে পুড়ে মরবে। সে এক কেলেঙ্কারি ব্যাপার।
এর কদিন পরে শুনলাম যোসেফ বিষাক্ত মদ খেয়ে মরে গেছে। এ রকম এখানে মাঝে মধ্যে হয়। মেছোগুলো প্রচণ্ড টানে, যত সস্তা পাবে, তত টানবে। নানারকম বিষক্রিয়া হয় তাতে। একটু ধরপাকড় হয়। আবার যে কে সেই। আরও কয়েকটা লোকও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, কিন্তু মারা গেল একা যোসেফ। লোকটা কি আত্মহত্যা করল? না কি ব্যাপারটা কাকতালীয়? ঠিক বুঝলাম না। যা জ্বালাচ্ছিল, মনে মনে ভাবলাম আপদ গেছে। পাপাম্মারও কোনো ভাবান্তর নেই। মুখ টিপে আছে একেবারে। চোখে জল-টল কিছুই দেখলাম না।
সেই সময়ে প্লুটো কিছুদিন হল আমার কাছে এসেছে। নেহাত ছেলেমানুষটি নয়। ছিল এখানকারই ডি সুজা সাহেবের কুকুর। আমায় ভলোই চিনত। ডিসুজা সব বেচেবুচে চলে গেল অস্ট্রেলিয়া, কুকুরটাকে আমার কাছে দিয়ে গেল। ক বছরই বা বাঁচবে আর, কোথায় ফেলব, একে একটু যত্ন কোরো ব্যাবিংটন। সঙ্গে, ওই যে ড্রেসারটা দেখছ ওটাও উপহার দিয়ে গেল। তা তো দিল। প্লুটোকে নিয়ে পড়লাম মহা মুশকিলে। আমাকে চেনে, কোনো অসুবিধে করে না, কিন্তু কদিন পর থেকেই নিজের মনিবকে দেখতে না পেয়ে ভীষণ মনমরা হয়ে গেল। যোসেফ যখন হাঙ্গামা করছে সে সময়টা আমি প্লুটোকে নিয়ে অস্থির। খেতে দিলে খায় না। জল পর্যন্ত খুব তেষ্টা না পেলে খাবে না। বাইরের চাতালে গিয়ে মুখ উঁচু করে করুণ সুরে কাঁদে। ক্রমশই শীর্ণ হয়ে পড়ছে। কমজোরি হয়ে পড়ছে। থাবায় মুখ গুঁজে শুয়ে থাকে আর শরীরটা থর থর করে কাঁপে। মাছি ঘোরে আশেপাশে। বুঝলাম একে বাঁচাতে পারব না। যে কোনো মুহূর্তে মরে যাবে।
